kalerkantho


সময়মতো খোলে না বহির্বিভাগ

শাহ ফখরুজ্জামান, হবিগঞ্জ   

১২ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



সময়মতো খোলে না বহির্বিভাগ

সকাল ৮টা। হবিগঞ্জ আধুনিক জেলা সদর হাসপাতাল।

বহির্বিভাগে তখনো কেউ আসেনি। গত মঙ্গলবার সকালে সরেজমিন হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেল, ৯টার আগে কোনো কাজকর্ম শুরু হয় না বহির্বিভাগে।

এরপর কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায় নানা অনিয়ম ও রোগীদের দুর্ভোগের চিত্র দেখা গেছে।

সকাল ৯টা। বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টার খুলে একটি খাতা নিয়ে আবারও বেরিয়ে যান কাউন্টারের কর্মচারী বাবুল আহমেদ। ৯টা ৫ মিনিটে বহির্বিভাগের চিকিৎসক ডা. মাহবুবুর রহমান এসে দেখেন তাঁর কক্ষে তালা। তিনি তখন পায়চারী করতে থাকেন। একপর্যায়ে প্যাথলজি কক্ষে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। ৯টা ১৫ মিনিট।

আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও রেডিওলজি বিভাগ খোলা হয়।

৯টা ২০ মিনিট। হাসপাতালের বাবুর্চি জহুর আলী এসে বহির্বিভাগের চিকিৎসকদের কক্ষ খুলে দেন।

দেরির কারণ জানতে চাইলে জহুর বলেন, এ কাজ করেন শেখ জাহির নামের একজন কর্মচারী। তাঁর অনুরোধেই তিনি এসে বহির্বিভাগের চিকিৎসকের কক্ষের তালা খুলে দিয়েছেন।

এরই মধ্যে আসেন ডা. মৌসুমী ভদ্র। তিনি বলেন, কর্মচারীরা সময়মতো কার্যালয় কক্ষ খুলে দেন না। সে জন্যই তাঁরা একটু দেরিতে আসেন।

তবে পাল্টা অভিযোগ করেন অফিস সহায়ক শেখ জাহির। তিনি বলেন, তাঁরা সময়মতোই কার্যালয় কক্ষ খোলেন। চিকিৎসকরাই আসেন দেরিতে।

সকাল ৯টা ২৬ মিনিটে ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস, সাড়ে ৯টায় ডা. এস কে ঘোষ, ৯টা ৫০ মিনিটে ডা. সাজ্জাতুল মামুন, ডা. কায়ছার আহমেদ, ডা. হালিমা নাজনীন ও ডা. আশরাফ উদ্দিন হাসপাতালে আসেন। একই সময়ে আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. বজলুর রহমান আসেন তাঁর জরুরি বিভাগের কক্ষে। এর কিছুক্ষণ পর ডা. গৌতম বরণ মিস্ত্রি, ডা. মুজিবুর রহমান ও ডা. সোলায়মান আসেন হাসপাতালে। সবার পরে আসেন ডা. সুস্মিতা সাহা, সকাল ১১টা ৯ মিনিটে।

ডা. এস কে ঘোষ এসেই গাইনি ওয়ার্ডে রোগী দেখেন। ডা. সোলায়মান ১০টায় পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে, একই সময়ে ডা. গৌতম বরণ মিস্ত্রি পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডে, সাড়ে ১০টায় মহিলা মেডিসিন ও সার্জারি ওয়ার্ডে ডা. মুজিবুর রহমান, পৌনে ১১টার দিকে শিশু ওয়ার্ডে যান ডা. আশরাফ উদ্দিন ও ডা. কায়ছার আহমেদ।

হাসপাতাল ভবনের দোতলায় বসেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তাঁরা সকালে এলেও দুপুর ১২টার পর নিজেদের কক্ষে আসেন।

সকাল ৮টায় হবিগঞ্জ শহরতলির বহুলা গ্রামের হাফছা খাতুন তাঁর শিশুসন্তানসহ হাসপাতালে আসেন। দুপুর সাড়ে ১২টায় শেষ হয় তাঁর চিকিৎসক দেখানোর কাজ। তিনি বলেন, চিকিৎসকরা সকাল থেকে রোগী দেখলে ভোগান্তি আরো কম হতো।

বহির্বিভাগের চিকিৎসক ডা. মৌসুমী ভদ্র বলেন, প্রতিদিন ৩০০-৪০০ রোগী দেখতে হয় গাইনি বিভাগে। তিনি সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ১৫০ জন রোগী দেখেছেন। একই কক্ষে ডা. সুস্মিতা সাহাও রোগী দেখেন। এখানে চিকিৎসা নিতে আসা হবিগঞ্জ শহরের নাতিরাবাদ এলাকার আলেয়া খাতুন বলেন, তিন ঘণ্টা সারিতে দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে চিকিৎসক দেখাতে পেরেছেন তিনি।

একা একা শিশু রোগী দেখতে হিমশিম খাচ্ছিলেন ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস। তাঁর কক্ষের সামনে ছিল রোগীর লম্বা সারি। জানা গেল, প্রতিদিন ২০০-৩০০ শিশু রোগী চিকিৎসা নিতে আসে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রথীন্দ্র চন্দ্র দেব সকাল সাড়ে ৮টায় তাঁর কার্যালয়ে আসেন। তাঁর কক্ষটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় সব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকই এখানে এসে কিছুক্ষণ বসেন। মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে এসে প্রায় এক ঘণ্টা ওই কক্ষে ছিলেন ডা. কায়ছার আহমেদ, ডা. হালিমা নাজনীন ও ডা. আশরাফ উদ্দিন। এরপর তাঁরা সবাই চলে যান। তবে ডা. কায়ছার আহমেদ আবার আসেন। ওই সময় তাঁর পেছন পেছন আসছিলেন বাহুবল উপজেলার ইসলামাবাদ গ্রামের আকলিমা। কোলে তাঁর অসুস্থ শিশু মুহাদ্দিছ। ডা. কায়ছার তত্ত্বাবধায়কের কক্ষে যতক্ষণ ছিলেন ততক্ষণ বাইরে অপেক্ষায় ছিলেন আকলিমা। দুপুর সোয়া ১২টার পর তিনি কক্ষে গিয়ে বসলে আকলিমা সেখানে যান।

এর আগে সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল ৮টা ১০ মিনিটে খোলা হয় প্যাথলজি বিভাগ। প্যাথলজিস্ট ইমতিয়াজ তুহিন ও রিপন এসে যন্ত্রপাতি নিয়ে বসেন। রোগীরা আসছেন নমুনা দিতে।

সকাল ৮টা ২১ মিনিটে দোতলার কার্যালয় কক্ষে ডিজিটাল হাজিরার ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিনে দেখা যায়, সময় তখন ৮টা ১১ মিনিট।

হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কর্ম সময় সাড়ে ছয় ঘণ্টা। কিন্তু তাঁরা দু-তিন ঘণ্টার বেশি থাকেন না হাসপাতালে। প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিয়ে তাঁদের বেশি ব্যস্ততা। সকালে যেমন তাঁরা আসেন দেরিতে, তেমনি চলেও যান নির্ধারিত সময়ের আগে।

দুপুরে কথা হয় হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রথীন্দ্র চন্দ্র দেবের সঙ্গে। তিনি জানান, সকাল ৮টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত চিকিৎসকের দায়িত্ব পালনের নির্ধারিত সময়। কিন্তু রোগী আসতে দেরি হয় বলে সকাল ৯টা থেকে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়। চিকিৎসকরা সকালে এসে অন্য কাজ করেন। তবে মঙ্গলবার চিকিৎসকদের আসতে দেরি হওয়ার বিশেষ কোনো কারণ থাকতে পারে বলে জানান তিনি।

উপস্থিতির ডিজিটাল পদ্ধতি ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিনে সময় কমিয়ে রাখার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। অনেকেই ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেন। আবার অনেকেই দেন না। মঙ্গলবার ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিনে হাজিরার তথ্য জানতে চাইলে ডা. রথীন্দ্র চন্দ্র দেব বলেন, হাসপাতালে এ তথ্য জানা যায় না। তথ্য জানা যায় মহাপরিচালক (ডিজি) কার্যালয়ে। মাঝেমধ্যে সেখান থেকে হাজিরাসংক্রান্ত তথ্য হবিগঞ্জ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

নিজের কক্ষে না বসে চিকিৎসকরা এসে তাঁর কক্ষে বসে থাকার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ডা. রথীন্দ্র চন্দ্র বলেন, ‘এটি এক ধরনের ফর্মালিটি। ডাক্তাররা এসেই আমার সঙ্গে দেখা করেন। আবার ওয়ার্ডে ভিজিটের পর একটু ক্লান্ত হয়ে আমার রুমে আসেন। কারণ এই রুমে এসি থাকায় তাঁরা একটু রেস্ট নিতে পারেন। ’

হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, শয্যা না পেয়ে অনেক রোগী মেঝে ও বারান্দায় রয়েছে। শিশুদের হাতে ক্যানুলা করা। ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, নেবুলাইজেশন, ক্যানুলা আর গ্যাস দিতে অভিভাবকদের প্রচণ্ড ভিড়।

শিশু ওয়ার্ডের বাইরে কথা হয় চুনারুঘাট উপজেলার পীরেরগাঁও গ্রামের আব্দুল খালেকের সঙ্গে। তাঁর ছেলে ইয়ামিনকে নিয়ে সোমবার সন্ধ্যায় হাসপাতালে এসেছেন। মঙ্গলবার সকালে এত বেলা হয়ে গেলেও কোনো চিকিৎসক তাঁর সন্তানকে দেখেননি। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তিনি সিলেটে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

সকাল ৮টায় এসে যখন জরুরি বিভাগে ঢুঁ মারেন এই প্রতিবেদক তখন সেখানে পেটের ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন হবিগঞ্জ শহরতলির আনন্দপুর গ্রামের যুবক রাজন। এ সময় কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. দীপংকর ছিলেন শিশু ওয়ার্ডে। এরই মধ্যে রাজনের ভাই আব্দুর রউফকে এক দালাল এসে জিজ্ঞেস করে টাকা-পয়সা এনেছেন কি না। ওই দালাল তাঁকে বলছিল, ‘রোগীর অবস্থা তো খারাপ। এখানে ডাক্তার আসবে না। ’ এ কথা শুনেই আব্দুর রউফ চেঁচামেচি শুরু করেন। তখন দালালও সরে পড়ে। এ নিয়ে জরুরি বিভাগের সামনে সৃষ্টি হয় জটলা। পরে ডা. দীপংকর এসে রাজনকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। তিনি জানান, এত সকালে দালাল আসে না। তবে দুপুরে দালালদের কিছু উৎপাত থাকে।

হাসপাতালে এমন সব সমস্যার কথা স্বীকার করে তত্ত্বাবধায়ক বলেন, এখানে প্রচুর রোগী আসে বিভিন্ন এলাকা থেকে। ১০০ শয্যার হাসপাতালে রোগী থাকে অনেক বেশি। রোগী বেশি হলে দর্শনার্থীও বেশি থাকে। এতে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে কষ্ট হয়। তিনি বলেন, ‘সীমিত জনবল দিয়ে সঠিক সেবা প্রদান করতে আমাদের অনেক সময় হিমশিম খেতে হয়। তবু আমরা সঠিকভাবে সেবা দিতে আন্তরিকভাবে কাজ করছি। ’


মন্তব্য