kalerkantho


নগরের দুঃখ শ্যামাসুন্দরী

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

১২ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



নগরের দুঃখ শ্যামাসুন্দরী

রংপুরের শ্যামাসুন্দরী খাল এখন ভাগাড়। ছবি : কালের কণ্ঠ

রংপুর নগরের পয়োনিষ্কাশন সমস্যা নিরসন, মশার উৎপাত ও ম্যালেরিয়া রোগ থেকে মুক্তি পেতে খনন করা হয়েছিল শ্যামাসুন্দরী খাল। প্রথম চেয়ারম্যান ও ডিমলার জমিদার রাজা জানকি বল্লভ সেন ১৮৯০ সালে তাঁর মা চৌধুরানী শ্যামাসুন্দরী দেবীর নামে এ খাল খনন করেছিলেন।

নগরের বুক চিরে ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এ খাল ছিল নগরবাসীর জন্য আশীর্বাদ। কিন্তু জনসচেতনার অভাব ও সংস্কার না হওয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে সেই শ্যামাসুন্দরী খাল।

ভাগাড়ে পরিণত হওয়া এ খাল এখন মশা-মাছির প্রজনন খামারে পরিণত হয়েছে। এতে যেমন রোগ-জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে, তেমনি নোংরা পানির দুর্গন্ধে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য। নগরবাসীর অভিযোগ, গেল পাঁচ বছরে খালের উন্নয়ন ও সংস্কারে রংপুর সিটি করপোরেশন তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। দখল হওয়া জমি উদ্ধারেও নেই কোনো পদক্ষেপ। এর আগের পৌরসভা এবং ২০১২ সালে প্রথম রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সব প্রার্থীরই প্রতিশ্রুতি ছিল নগরের পয়োনিষ্কাশন সমস্যা দূর করতে শ্যামাসুন্দরী খাল সংস্কার করবেন তাঁরা। কিন্তু নির্বাচনের পাঁচ বছর প্রায় শেষ হলেও উন্নয়নের ন্যূনতম ছোঁয়া লাগেনি খালটিতে।

শ্যামাসুন্দরী খাল নগরের কেল্লাবন্দ এলাকায় ঘাঘট নদীতে শুরু হয়েছে। এরপর ধাপ পাশারীপাড়া, কেরানীপাড়া, মুন্সিপাড়া, ইঞ্জিনিয়ারপাড়া, গোমস্তাপাড়া, সেনপাড়া, মুলাটোল, তেঁতুলতলা, নূরপুর, বৈরাগীপাড়া হয়ে মাহিগঞ্জের মরা ঘাঘটে গিয়ে পড়েছে খালটি। সংস্কার না করায় খালটি নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে। দুই পাড় অবৈধভাবে দখল হয়ে যাওয়ায় সংকীর্ণ হয়ে গেছে খালটি। সামান্য বৃষ্টিতেই এখন গোটা শহরে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা।

২০০৭ সালে তৎকালীন পৌরসভা খালটি সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও কাজ শেষ করতে পারেনি। এর পরও রয়েছে খাল সংস্কারে অনিয়ম-দুর্নীতিসহ লুটপাটের অভিযোগ।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, খালটির  কোথাও কোনো উন্নয়ন বা সংস্কার হয়নি। বরং খালটির আশপাশ অনেকেই দখল করে ফেলায় সরু হয়ে গেছে। আবার কোথাও কোথাও ভেঙে পড়েছে খালটির দুই পাড়ের চলাচলের রাস্তা। খালের কালো পানিতে ভাসমান আবর্জনার স্তূপে মশা-মাছির বিস্তার ঘটছে। আর দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। দিনের বেলায়ও খালের দুই পাশে আড্ডা জমায় বখাটেরা। কেউ  কেউ মেতে থাকে জুয়ার আসরে। খালপাড়ের রাস্তায় রাতের বেলায় সুযোগের অপেক্ষায় থাকে মাদকাসক্তদের পাশাপাশি ছিনতাইকারীরাও।

নগরীর শাপলা চত্বর এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফ, ভ্যানচালক সোহেল রানা, কলেজছাত্র মশিউর রহমানসহ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে খাল নিয়ে কথা হয়। তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই খালের আজও কোনো উন্নয়ন হয়নি। রংপুরের নেতারা শ্যামাসুন্দরীকে নিয়ে রাজনীতি করেন দাবি করে তাঁরা বলেন, নির্বাচনের আগে সবাই আসে শ্যামাসুন্দরী খাল নিয়ে কথা বলতে, ভোট চাইতে। কিন্তু তারপর আর শ্যামাসুন্দরীর দিকে ফিরেও তাকান না তাঁরা। সে কারণে প্রায় ১২৭ বছর আগে খনন করা এই খাল এখন নগরবাসীর বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় এই শ্যামাসুন্দরী খালে নাব্যতা ছিল, যার মাধ্যমে পয়োনিষ্কাশন হতো। শহরের ময়লা-আবর্জনা ধুয়েমুছে পরিষ্কার হয়ে যেত। কিন্তু আজ তা পরিণত হয়েছে ভাগাড় তথা মশা-মাছির খামারে। খালের এ দুর্দশা দেখার মানুষ নেই।

রংপুর শহরের মধ্যখানে ইঞ্জিনিয়ারপাড়া হয়ে বেতপট্টি এলাকার ওপর দিয়ে লিচুবাগান হয়ে বয়ে গেছে শ্যামাসুন্দরী খাল। বেতপট্টি সেতুর উত্তর পাশে খালের দুই পাড় দখল করে বসতি গড়েছে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। ফলে ওই এলাকায় খাল ভরাট হয়ে প্রবাহ থেমে গেছে। বৃষ্টি হলে খাল উপচে নোংরা বিষাক্ত পানি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।

স্বর্ণ ব্যবসায়ী হামিদুর রহমান, ভোলা মিয়াসহ বেতপট্টি বাজারের ব্যবসায়ীরা বলেন, শ্যামাসুন্দরীর পচা পানির দুর্গন্ধে তাঁরা অতিষ্ঠ। খালের সংস্কারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে রংপুর শহরের উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়।

হাজীপাড়া এলাকার  চাঁদ মিয়া বলেন, ‘একসময় শ্যামাসুন্দরী খালে মাছে ভরা ছিল। আর এখন মাছ তো দূরের কথা, একটা ব্যাঙও খুঁজে পাওয়ার উপায় নেই। ’ তিনি অবিলম্বে শ্যামাসুন্দরী খালটির সংস্কার করে আগের রূপে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।

রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল শাখা সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালে তৎকালীন পৌরসভার অধীনে এক কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে খালটির সংস্কারকাজ শুরু হয়। এতে খাল পুনঃখনন, প্রতিরক্ষা দেয়াল তৈরি, জজকোর্ট ও কেরামতিয়া জামে মসজিদের কাছে পার্ক স্থাপন এই প্রকল্পে ছিল। প্রকল্পের কাজ চলাকালে স্বেচ্ছায় খাল পুনঃখননসহ আর্থিক সহায়তা করে আরডিআরএস, কেয়ারসহ বেসরকারি কয়েকটি উন্নয়ন সংস্থা। এসব প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে কেরামতিয়া মসজিদসংলগ্ন খালের এক কিলোমিটার জায়গা পুনঃখনন ও পার্কের ফুটপাতের বেইসমেন্ট নির্মাণ করা হয়। এতে ব্যয় হয় প্রায় ১৫ লাখ টাকা। এরপর ২০১১ সালের প্রথম দিকে দ্বিতীয় দফায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হয় খালের সংস্কারকাজ। আংশিক বাস্তবায়নের পর রংপুর পৌরসভা সিটি করপোরেশনে রূপান্তর হয়। এরপর খালটির কাজ সিটি করপোরেশন থেকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর থেমে যায় খাল সংস্কারের কাজ। সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র সরফুদ্দিন আহম্মেদ ঝন্টু সে সময় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, সংস্কারের নামে টাকা হরিলুট করা হয়েছে। এ ছাড়া খালের প্রশস্ততা ১৫ ফুট রেখে সংস্কারকাজ শুরু করায় দুই পাশের ৩০ থেকে ৪০ ফুট অবৈধ দখলে চলে গেছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), রংপুরের সভাপতি মো. আকবর হোসেন বলেন, ‘শ্যামাসুন্দরী খালটিকে উন্নত ও সংস্কার করার মূল দায়িত্ব বর্তমান মেয়রের। এটা তাঁর প্রতিশ্রুতিও ছিল। ’

নগর পরিকল্পনাবিদ নজরুল ইসলাম বলছেন, ‘খালটি রক্ষার জন্য জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। নয়তো নগরের পয়োনিষ্কাশন সমস্যা দূর করা দুষ্কর হবে না। ’

খালটির উন্নয়নে নানা সমস্যার কথা স্বীকার করলেও এর সংস্কারে নতুনভাবে পরিকল্পনা নেওয়ার কথা জানান রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু। তিনি বলেন, ‘শ্যামাসুন্দরী খাল নিয়ে নতুনভাবে আবার সাড়ে ৬০০ কোটি টাকার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০১৭-১৮ সালের উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে খালের ওপর ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্পটি আছে। ’


মন্তব্য