kalerkantho


‘দাঁত বেরিয়ে আছে রাস্তার’

হায়দার আলী   

১২ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



‘দাঁত বেরিয়ে আছে রাস্তার’

মিরপুরের বেশিরভাগ এলাকার রাস্তাঘাটের এই অবস্থা। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘আমাগো এলাকার রাস্তার এমনই দশা, ঘর থেকে বের হইলেই মনটা খারাপ হয়ে যায়। এমন ভয়ংকর রাস্তা যেন দাঁত বের করে আছে।

এই কষ্টের জীবন থেকে কবে মুক্তি পাব?’

গত মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর মিরপুরের দুয়ারীপাড়া এলাকার রাস্তার অবস্থা সরেজমিনে দেখতে গেলে স্থানীয় বাসিন্দা এনামুল হক এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আবার মিরপুর ই-ব্লকের ৯ নম্বর রোডের মাথায় বাবু মাঝির চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন এফ-ব্লকের বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম সেলিম। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি এ প্রতিবেদককে দোকান থেকে ১০ গজ সামনে নিয়ে বিশাল এক গর্ত দেখিয়ে বলেন, ‘মিরপুরের বেশির ভাগ এলাকার রাস্তাঘাটের এই অবস্থা। যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, কিন্তু কর্তৃপক্ষের কোনো নজর নেই। ’ মামা-ভাগ্নে গ্লাস হাউসের সামনের রাস্তায় ওই বিশাল গর্তের বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান আকন্দ বলেন, ‘গ্যাস-পানির কষ্টের চেয়েও আমাদের এলাকার বড় সমস্যা ভাঙাচোরা রাস্তা। এটা থেকে মুক্তি পেলেই আমরা বাঁচি। ’ ভুক্তভোগী এ রকম অর্ধশত স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে সবার কাছ থেকে প্রায় একই রকম প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে।

ওই দিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মিরপুর-১, ২, ৩, ৪, ৫ ও ৬ নম্বর, উত্তর বিশিল, দুয়ারীপাড়া, গুদারাঘাট, চিড়িয়াখানার ঢালসহ আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি এলাকার রাস্তাই ছোট-বড় গর্ত ও খানাখন্দে ভরা। কিছু স্থানে এমন গর্ত হয়েছে যে যানবাহন চলাচল দুরূহ হয়ে পড়েছে।

কোথাও কোথাও তো মানুষের হেঁটে চলাই দায়।

এমন রাস্তায় চলাচল নিয়ে মিরপুর সি-ব্লকের রিকশাচালক ওবায়দুর রহমান বলেন, ‘খুবই কষ্ট হয়। অনেক রাস্তায় পিচ ঢালাইয়ের কোনো চিহ্নই নেই। ’

মিরপুর ই-ব্লকে পরিবার নিয়ে থাকেন রিকশাচালক মোবারক খান। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘৩২ বছর ধরে মিরপুরসহ আশপাশে রিকশা চালাই। এমন ভাঙাচোরা রাস্তা এর আগে কখনো দেখিনি। ’

মিরপুরের উত্তর বিশিল এলাকার রাস্তার অবস্থা আরো ভয়ংকর। এটি শহীদ বুদ্ধিজীবী সড়কে গিয়ে ঠেকেছে। উত্তর বিশিলের আমেনা ফার্মেসিতে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা আজগর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর ধরেই আমাদের এলাকার রাস্তাঘাটের অবস্থা খুবই নাজুক। ’

এই মহল্লার সালমান এন্টারপ্রাইজের সামনে রাস্তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন হানিফ পরিবহনের গাড়ির চালক হাসান জাহিদ। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি হলে এই রাস্তায় চলাচল করা দায়। ভোটের সময় মিষ্টি কথা বলে ভোট নিলেও এখন সেই সব নেতার দেখা পাওয়া যায় না। ’

উত্তর বিশিলের সড়কের মতো ভয়াবহ অবস্থা গুদারাঘাট, কবরস্থান, চরবাড়ি, নবাবেরবাগসহ আশপাশের এলাকার রাস্তারও। নবাবেরবাগ এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী রুহুল আমিন বলেন, ‘অন্য এলাকার বেশির ভাগ মানুষ অফিস কিংবা কর্মস্থল থেকে নিজের এলাকায় এলে মনটা ভালো হয়ে যায়, কিন্তু আমাদের এলাকায় এলে উল্টো মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। সব কিছুই অসহ্য লাগে রাস্তার কারণে। ’

চটবাড়ি এলাকার বাসিন্দা মিরাজ হোসেন বলেন, ‘রাস্তায় চলাই এখন কষ্টের। বৃষ্টি হলেই কাদা-পানিতে একাকার। ’

কোনো কোনো এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক রাস্তায় স্থানীয়রা টাকা তুলে ইট-সুরকি-বালু দিয়ে কোনো মতে মেরামতের কাজ করছে। তবে ময়লা পানি নিষ্কাশনের ড্রেনগুলো ময়লা-আবর্জনায় বন্ধ হয়ে আছে।

শিয়ালবাড়ি মোড়ে ওই দিন রিকশা উল্টে পড়ে গিয়ে আহত হন রাইনখোলা এলাকার বাসিন্দা সোলেমান মৃধা। তিনি বলেন, ‘শরীরটা খারাপ লাগছিল বলে রিকশা নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভাঙা রাস্তায় রিকশা উল্টে মরার অবস্থা হয়েছিল। অল্পের জন্য বেঁচে গেছি। হাত ও ডান পা কিছুটা কেটে গেছে। ’

আর চিড়িয়াখানা ঢালে প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। রাস্তার বেশ কয়েক জয়গায় গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় ঝুঁকি নিয়েই চলতে হচ্ছে তাদের।

রাস্তার এই অবস্থার কারণ জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কাজী টিপু সুলতান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাস্তার উন্নয়নকাজ করার পরও অনেক রাস্তা অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে ভেঙে গেছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ায় রাজধানীর অন্য সব এলাকার মতো আমার ওয়ার্ডেও রাস্তার অবস্থা খারাপ। তবে সব রাস্তার উন্নয়নেই দরপত্র হয়েছে, উন্নয়নকাজ চলছে। আশা করছি কয়েক মাসের মধ্যেই মানুষের ভোগান্তি দূর করতে পারব। ’


মন্তব্য