kalerkantho


আ. লীগে মনোনয়ন ‘লড়াই’ নতুন মুখ আছে বিএনপিতে

ফরিদুল করিম, নওগাঁ   

২৪ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



আ. লীগে মনোনয়ন ‘লড়াই’ নতুন মুখ আছে বিএনপিতে

নওগাঁ-৩ (বদলগাছী-মহাদেবপুর) আসনটি জাতীয় সংসদের ৪৮ নম্বর নির্বাচনী এলাকা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আসনটির দুই উপজেলায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের পদচারণ শুরু হয়ে গেছে।

ফলে তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের রাজনীতিবিষয়ক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন সম্ভাব্য প্রার্থীরা।

মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন বর্তমান সংসদ সদস্য মো. ছলিম উদ্দীন তরফদার (সেলিম) ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. আকরাম হোসেন চৌধুরী। দুজনই দলীয় প্রার্থী হওয়ার শক্ত দাবিদার বলে মনে করছে দলটির নেতাকর্মীরা।

অন্যদিকে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে আসনটি পুনরুদ্ধারের জন্য মরিয়া হয়ে কাজ করবে এটাই স্বাভাবিক। সে ক্ষেত্রে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবেক সংসদ সদস্য আখতার হামিদ সিদ্দিকী (নান্নু) প্রার্থী হতে পারেন বলে দলে জোর আলোচনা রয়েছে। তবে দলীয় মনোনয়নের প্রত্যাশায় কাজ করছেন নওগাঁ জেলা বিএনপির সদস্য রবিউল আলম বুলেট ও দলের বদলগাছী উপজেলা শাখার সভাপতি ফজলে হুদা আকন্দ বাবুলও।

অন্যদিকে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও নওগাঁ জেলা শাখার সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ-ইনু) নেতা মুক্তিযোদ্ধা ওয়াজেদ আলী, জামায়াতের আবুল কালাম আজাদ নির্বাচন করতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে।

ইতিমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীরা এলাকায় সভা, সমাবেশ, গণসংযোগ করে এবং পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন টানিয়ে প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে নিজেদের আগ্রহের বিষয়টি জানান দিতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ ফেসবুক-টুইটারের পাশাপাশি মতবিনিময় সভা করে নির্বাচন করার আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

সেই সঙ্গে তাঁরা নানা প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করছেন। এমন অবস্থায় মাঠপর্যায়ে যেমন নেতাকর্মীদের কদর বাড়ছে, তেমনি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তৎপরতাও বেড়েছে। জানা গেছে, নওগাঁ-৩ আসনের সর্বশেষ ভোটার তালিকা অনুযায়ী মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৭৮ হাজর ১৮। হালনাগাদ করার পর এ সংখ্যা আরো বাড়বে বলে নির্বাচন অফিস থেকে জানানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ : দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আগাম প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। দলের ওপর মহল থেকে নির্দেশনা পেয়ে নির্বাচনী মাঠ গোছানো শুরু করেছে দলটি। ইতিমধ্যে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ থেকে শুরু করে দলীয় বিভিন্ন কার্যক্রমে নির্বাচনকে ঘিরে চলছে আলোচনা।

দলটির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা জানান, তাঁরা এখন সরকারের সাফল্যের চিত্র তুলে ধরছেন জনগণের কাছে। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আগামী নির্বাচনের জন্য প্রার্থী ঠিক করবে। যাঁকে যোগ্য মনে হবে তাঁকেই মনোনয়ন দেবে।

তবে এখন পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দলটির মনোনয়ন আলোচনা দুজনকে ঘিরেই চলছে। তাঁরা হলেন বর্তমান সংসদ সদস্য ছলিম উদ্দীন তরফদার ও সাবেক সংসদ সদস্য বর্তমানে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) চেয়ারম্যান ড. আকরাম হোসেন চৌধুরী।

বর্তমান সংসদ সদস্য ছলিম উদ্দীন দশম সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী আকরাম হোসেনকে ৩০ হাজার ভোটে হরিয়ে দেন। নির্বাচিত হওয়ার প্রায় সাড়ে তিন বছর পর গত ৭ মে আওয়ামী লীগ ছলিম উদ্দীনকে দলীয় সংসদ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর আগে নবম সংসদ নির্বাচনে আকরাম হোসেন বিএনপির প্রার্থী আখতার হামিদ সিদ্দিকীকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য হন।

আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীই মনে করে, দলের প্রার্থী মনোনয়ন কমিটিতে দু-একজন তৃণমূল নেতাকর্মীকে রাখলে প্রকৃত চিত্র কমিটি ভালো জানতে পারবে। এতে ভোটের ফলাফলটা আগাম কিছুটা হলেও জানা যাবে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বদলগাছী ও মহাদেবপুর উপজেলায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সুপ্ত দুটি ভাগ আছে বর্তমান ও সাবেক সংসদ সদস্যকে কেন্দ্র করে। স্থানীয় সভা-সমাবেশগুলোতে সেটা পরিলক্ষিত হয়।

নওগাঁ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ড. আকরাম হোসেন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতি করতে চাই। এর পেছনে যে শ্রম দিতে হয় তা আমি দিয়ে থাকি। আমি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী। আমি  দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমিই মনোনয়ন পাব। নেত্রী যেভাবে কাজ করতে বলবেন সেভাবেই কাজ করব। আগেও তাই করেছি। বর্তমানে বিএমডিএর চেয়ারম্যানের দায়িত্বভার নেত্রীই আমাকে দিয়েছেন। নেত্রী যাঁকেই মনোনয়ন দিবেন আমি তাঁর জন্যই কাজ করব। ’

দলীয় সূত্রে জানা যায়, মহাদেবপুর উপজেলার চেরাগপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন বর্তমান সংসদ সদস্য ছলিম উদ্দীন তরফদার। তিনি ছিলেন ওই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। দশম সংসদ নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে প্রার্থী হওয়ায় তাঁকে

বহিষ্কার করা হয়েছিল। অবশ্য পরে তাঁকে সদস্য পদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সংসদ সদস্য ছলিম উদ্দীন তরফদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়েই আমি আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য হিসেবে স্বীকৃত। আগামী নির্বাচনে আমি মনোনয়নপ্রত্যাশী। আশা করি নেত্রী আমাকেই মনোনয়ন দিবেন। জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে বদলগাছী-মহাদেবপুর উপজেলায় অনেক উন্নয়ন কাজ হয়েছে। অনেক কাজ চলমান রয়েছে। ’

বিএনপি : নওগাঁ-৩ আসনটি বিএনপির দখলে ছিল ২০০৮ সাল পর্যন্ত। এর পর আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে আসে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বদলগাছী-মহাদেবপুর দুই উপজেলায়ই বিএনপিতে কোন্দল আছে। ফলে দল গোছানো আর হয়ে উঠছে না। ৩১ সদস্যের জেলা কমিটি দিয়ে দলটির সাংগঠনিক কাজ চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এতে উপজেলাগুলোয় দলের ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়েছে বলে দাবি করেছে একাধিক  নেতাকর্মী। বর্তমানে উপজেলা কমিটিগুলোর অবস্থা এলোমেলো।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক ডেপুটি স্পিকার আখতার হামিদ সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কবি জসীমউদ্দীন হল ডিবেটিং ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও বদলগাছী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফজলে হুদা আকন্দ বাবুল ও নওগাঁ জেলা বিএনপির সদস্য রবিউল আলম বুলেট।

আখতার হামিদ সিদ্দিকী সংসদ সদস্য থাকাকালে তাঁর নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছিলেন। সেই সব উন্নয়ন বিশেষ করে মহাদেবপুর উপজেলায় তা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল। মহাদেবপুর উপজেলা সদরে সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ করে তিনি বেশ প্রশংসিত হয়েছিলেন। তাঁর সমর্থকদের দাবি, এলাকায় তাঁর সময়কালের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সুফল এখনো মানুষ পাচ্ছে।

আখতার হামিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি মনোনয়নপ্রত্যাশী। আমার সময়ের উন্নয়নের কথাই এখনো বলতে হবে। আমি মনোনয়ন পেলে এবং ফ্রি ফেয়ার নির্বাচন হলে অনায়াসে জয়লাভ করব। ’

দলের সাংগঠনিক অবস্থার কথা জানতে চাইলে সাবেক এ সংসদ সদস্য বলেন, ‘দুই উপজেলায় সাংগঠনিক অবস্থা ভালো। যেটুকু সমস্যা আছে মনোনীত হলে এর কিছুই থাকবে না। সব ঠিক হয়ে যাবে। ’

এদিকে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিএনপির অনেক নতুন মুখ মনোনয়নপ্রত্যাশী। তাঁরা ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেট টানিয়ে এবং সভা-সমাবেশ ও সামাজিক কাজের মাধ্যমে তাঁদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন। নওগাঁ জেলা বিএনপির সদস্য রবিউল আলম বুলেট তাঁদের মধ্যে একজন। তিনি ব্যবসা করেন।

রবিউল আলম দাবি করেন, অপেক্ষাকৃত কম বয়সীদের প্রার্থী হিসেবে ভোটাররা এখন পছন্দ করেন। কেননা তাঁরা চিন্তা-চেতনায় অনেক আধুনিক ও পরিশ্রমী হয়। তিনি আরো বলেন, ‘এলাকাবাসী একজন ক্লিন ইমেজের প্রার্থী প্রত্যাশা করেন। আমি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় ছাত্র রজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলাম। আখতার হামিদ সিদ্দিকীর নির্বাচন করার মতো শারীরিক অবস্থা নেই। ফলে কেন্দ্রীয় নেতারা বিকল্প চিন্তা করছেন। ’

এ আসনে তিনি বিএনপির মনোনয়ন চান জানিয়ে রবিউল বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসীর পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছি। গত বন্যায় আমি ব্যক্তিগতভাবে বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছি। মনোনয়ন পেলে নির্বাচিত হব, এ বিষয়ে আমি শত ভাগ নিশ্চিত। ’


মন্তব্য