kalerkantho


আড়াইটা পর্যন্ত স্বস্তি এর পরই বিপত্তি

আবদুল হামিদ মাহবুব মৌলভীবাজার   

১৪ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



আড়াইটা পর্যন্ত স্বস্তি এর পরই বিপত্তি

গতকাল সোমবার সকাল ৮টা। ঠিক সময়েই মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতালের সব বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে।

প্রথম দিকে রোগীর খুব একটা ভিড় না থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য দিনের মতোই ভিড় বাড়তে থাকে।

সকালেই দেখা গেল, গত শনিবার টয়লেটের ময়লার ট্যাংক ফেটে হাসপাতালের আঙিনায় যে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়েছিল সেসব পরিষ্কার করে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

হাসপাতালের আউটডোরে ডিউটি করেন অফিস সহায়ক আছমা বেগম। তিনি বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক প্রতিদিন সকাল ৮টা ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে আউটডোর ঘুরে দেখেন— সব রুম খোলা হয়েছে কি না। কোন কোন ডাক্তার আসতে দেরি করেছেন। আবার সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে ক্লিনার সর্দার থেকে শুরু করে সব বিভাগের প্রধানদের নিয়ে সব ওয়ার্ড ভিজিট করেন। ’

১১টা ৫৫ মিনিট। সব ওয়ার্ড ঘুরে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. পার্থ সারথি দত্ত কাননগো নিজের কক্ষে ফিরেছেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন এই ঝটিকা পরিদর্শনের কারণে হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আগের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে।

তবে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হওয়ার মতো অবস্থা এখনো তৈরি করা যায়নি। তিনি বলেন, এক বছর আগে তিনি যখন যোগ দেন তখন হাসপাতালের অবস্থা দেখে নিজেরই লজ্জা লাগত। তাঁর ভাষ্য, ‘আমি হাসপাতালে চিকিৎসার পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করছি। সবার সহযোগিতা লাগবে। ’

এরপর কথা হয় পুরুষ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন সফিক মিয়ার সঙ্গে। তিনি জানান, বুকে ব্যথা নিয়ে ভর্তি হয়েছেন। প্রথমে একজন ‘অল্প বয়সী’ চিকিৎসক তাঁকে দেখে যান। ঘণ্টা দুই পরে একজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক তাঁকে দেখেন। নার্সরা জানিয়েছেন, কয়েকটি পরীক্ষা দেওয়া হয়েছে। আজ (সোমবার) হাসপাতালেই পরীক্ষাগুলো করা হবে।

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মো. শাহজাহান কবীর চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে যে প্যাথলজি ল্যাব, সেটা বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালের চেয়ে কোনো অংশে কম না। সব ধরনের টেস্ট এখানে হয়। সব অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে টেস্টগুলো করা হয়। ল্যাবের কর্মীরাও প্রশিক্ষিত। ’ তিনি বলেন, বাইরে যেসব টেস্টে তিন হাজার টাকা খরচ হয়, হাসপাতালের ল্যাবে সেগুলো এক হাজার টাকার মধ্যে রোগীরা করতে পারছে। টেস্টের মূল্য তালিকা বড় ডিজিটাল বোর্ডে টাঙানো আছে।

হাসপাতালে সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত রোগীরা পর্যাপ্ত চিকিৎসা পায়। বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগে চাইলেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পাওয়া যায়। বিপত্তি ঘটে আড়াইটার পর থেকে। তখন নার্স ও ব্রাদাররা ছাড়া সেবা দেওয়ার কেউ থাকে না।

ভর্তি থাকা কোনো রোগীর জটিলতা দেখা দিলে আড়াইটার পর চিকিৎসক পেতে দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হয়। তখন কেবল জরুরি বিভাগে একজন মেডিক্যাল অফিসার কর্মরত থাকেন। তাঁকে ডাকলে জরুরি বিভাগ সামলে আসতে আসতে অনেক দেরি হয়ে যায়।

এ বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. পার্থ সারথি দত্ত কাননগো বলেন, ‘আমাদের ওয়ার্ডগুলোতে সার্বক্ষণিক চিকিৎসকের কোনো পদ নেই। আমরা জরুরি বিভাগের চিকিৎসকের পাশাপাশি ইনডোরে জরুরি সেবা দেওয়ার জন্য আরো একজন চিকিৎসক নিয়োজিত রাখি। কিন্তু ২৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিনই ভর্তি রোগী থাকে প্রায় তিন শর মতো। একজন চিকিৎসকের পক্ষে এত রোগীকে ঠিকঠাক মতো সেবা দেওয়া অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। ’

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আরো বলেন, ‘ইনডোরের বেশি জটিল রোগীদের জন্য আমরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অনকল সার্ভিসের ব্যবস্থা চালু রেখেছি। মোবাইল ফোনে কল পেলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক তাঁর বিভাগের রোগীকে এসে দেখা বাধ্যতামূলক। ’

ডা. পার্থ সারথি দত্ত কাননগো বলেন, ‘পদ সৃষ্টি করে আমাদের প্রতি ওয়ার্ডে যদি ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসক রাখার মতো পর্যাপ্ত চিকিৎসক দেওয়া হয়, তবে বড় বড় বেসরকারি হাসপাতাল থেকে অনেক বেশি ভালো চিকিৎসা আমরাই দিতে পারব। ’

হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সীতাংশু শেখর আচার্য জানান, হাসপাতালের অনেক পদ শূন্য। চিকিৎসক থাকার কথা ৫৩ জন, আছেন ৩৫ জন। চিকিৎসকের ১৮টি পদ শূন্য। নার্সের ১১৪টি পদের বিপরীতে আছেন ৭৯ জন। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের মোট পদ ৩৮টি। আছেন ২৯ জন। চতুর্থ শ্রেণির পদ হচ্ছে ২২টি। আছেন ১৭ জন। শূন্য পদ পূরণের জন্য প্রতি মাসেই মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বরাবরে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু ফল পাওয়া যাচ্ছে না। সর্বশেষ গত ৯ অক্টোবর চিঠি পাঠানো হয়েছে।

গতকাল হাসপাতালের সব কটি ভবন ও ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়; হাসপাতালের নতুন চারতলা ভবনে লিফট আছে। নতুন ভবনে র‌্যাম্প না থাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটে মুমূর্ষু রোগী ওপরে ওঠাতে সমস্যায় পড়তে হয়। নতুন ভবনের পাঁচতলা ফাউন্ডেশন আছে। পঞ্চম তলা করা হলে আরো অধিকসংখ্যক রোগীর চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

হাসপাতালের পুরনো ভবনটি ১৯৮৪ সালের আগে নির্মিত। এ ভবনের স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে। প্রায়ই সেপটিক ট্যাংক উপচে পুরনো ভবনের জরুরি বিভাগ, সার্জারি বিভাগ ও শিশু অন্তর্বিভাগের শৌচাগার ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

নতুন ও পুরনো ভবনের প্রায় সব ছাদ থেকে টয়লেটের পানি চুইয়ে পড়ে আশপাশের কাজের পরিবেশের ক্ষতি করছে। পুরনো ভবনের জরুরি বিভাগ, রান্নাঘর, পুরুষ ও মহিলা সার্জারি অন্তর্বিভাগসহ বিভিন্ন স্থানে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ার কারণে কক্ষগুলোর অবস্থা শোচনীয়।

এ ছাড়া নতুন ভবনে চালু করা অপারেশন থিয়েটার, ডায়ালিসিস ইউনিট, প্যাথলজি বিভাগ, গাইনি, অন্তর্বিভাগসহ ভবনের বেশির ভাগ স্থানে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে পরিবেশ হয়ে পড়েছে অস্বাস্থ্যকর ও অপরিচ্ছন্ন। এতে করে রোগীর সেবা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়।

১৯৮৪ সালে ৫০ শয্যার হাসপাতাল চালু হওয়ার সময় রন্ধনশালা নির্মিত হয়। বর্তমানে এর অবস্থা নাজুক। রন্ধনশালার ভবনটি নিচের দিকে দেবে যাচ্ছে। যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ ছাড়া ৫০ শয্যার জন্য করা রন্ধনশালাটি বর্তমানে ২৫০ শয্যার হাসপাতালের জন্য আর উপযোগী নয়।

রন্ধনশালার প্রধান আবদুল ছাত্তার জানান, ‘রান্নাঘরে মাত্র একটি ট্যাপের মাধ্যমে পানি পাই। ঠিকমতো পানি সরবরাহ নেই। দুটি মাত্র গ্যাসের চুলা। ছাদ থেকে প্রায়ই প্লাস্টার খসে পড়ে। খুব কষ্ট করে আমাদের কাজ করতে হয়। ’

হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার যে জায়গাটি নির্ধারিত তা খুবই ছোট। হাসপাতালের অন্তর্বিভাগ ও বহির্বিভাগ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার পর যে ময়লাগুলো বের হয় তা হাসপাতালের পেছনে ১০০ শয্যার জন্য নির্মিত ছোট ডাস্টবিনে ফেলতে হয়। ফলে দেখা যায়, হাসপাতালের দুই-তিন দিনের ময়লায় ডাস্টবিনটি ভরে গিয়ে উপচে পড়ে। মৌলভীবাজার পৌর কর্তৃপক্ষ কদিন পর পর সেটি পরিষ্কার করে দেয়।

হাসপাতালে বর্তমানে যে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু আছে তা দিয়ে ভারী ইলেকট্রো মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি চালনাসহ সার্বিক বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত নয়।


মন্তব্য