kalerkantho


পাথরঘাটায় ধর্ষণ ও হত্যা

গ্রেপ্তার দুই ছাত্রলীগ নেতা রিমান্ডে

অভিযুক্ত চারজনকে বহিষ্কার

বরগুনা ও পাথরঘাটা প্রতিনিধি   

১৪ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



গ্রেপ্তার দুই ছাত্রলীগ নেতা রিমান্ডে

তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে বরগুনার পাথরঘাটায় চার ছাত্রলীগ নেতাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল সোমবার পাথরঘাটা কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি রুহি আনান দানিয়েল ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন ছোট্টকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

এরই মধ্যে চার ছাত্রলীগ নেতাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানায়।

১০ আগস্ট পাথরঘাটা কলেজের পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল এক তরুণীর লাশ। তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যার বিষয়ে রবিবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন ছাত্রলীগ নেতা মোহাম্মদ মাহমুদ। তিনি এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের পরিচয় প্রকাশ করলে গ্রেপ্তার করা হয় দানিয়েল ও ছোট্টকে। গতকাল বিকেলে বরগুনা থেকে তাঁদের পাথরঘাটার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। পুলিশ সাত দিনের রিমান্ড আবেদন জানালে ম্যাজিস্ট্রেট মো. মঞ্জুরুল ইসলাম দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

দলীয় সূত্র জানায়, গতকাল কেন্দ্রের নির্দেশে চার ছাত্রলীগ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাঁরা হলেন পাথরঘাটা কলেজ শাখার সভাপতি রুহি আনান দানিয়েল (২২), সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন ছোট্ট (২১), সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মাহিদুল ইসলাম রায়হান (১৯) ও উপজেলা ছাত্রলীগের সহসম্পাদক মোহাম্মদ মাহমুদ (১৮)।

জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুবায়ের আদনান অনিক বলেন, ‘চার ছাত্রলীগ নেতাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এসব তাদের ব্যক্তিগত অপরাধ। ছাত্রলীগ কখনোই দুর্বৃত্তায়নের দায়ভার নেবে না। ’

বরগুনার পুলিশ সুপার বিজয় বসাক জানান, গ্রেপ্তারকৃত ছাত্রলীগ নেতাদের অপরাধ ও অনিয়মের নানা তথ্য পুলিশ পেয়েছে। তদন্তের স্বার্থে সব কিছু প্রকাশ করা যাচ্ছে না। যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়ায় অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে পুলিশের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, ১০ আগস্ট পাথরঘাটা কলেজের একটি পুকুর থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় অজ্ঞাতপরিচয় এক তরুণীর লাশ উদ্ধারের পর মামলা করা হয়েছিল। তাঁকে গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয় বলে তদন্তকালে ধারণা করা হচ্ছিল। গত বৃহস্পতিবার কলেজের নৈশপ্রহরী মো. জাহাঙ্গির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মেলে। এরপর শনিবার গ্রেপ্তার করা হয় মাহিদুল ইসলাম রায়হান ও মোহাম্মদ মাহমুদকে। পরদিন গ্রেপ্তার করা হয় রুহি আনান দানিয়েল ও মো. সাদ্দাম হোসেন ছোট্টকে। এরই মধ্যে মাহমুদ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

এদিকে ছাত্রলীগ নেতাদের গ্রেপ্তারের পর তাঁদের নানা অপকর্ম নিয়ে মুখ খুলছে স্থানীয় বাসিন্দা ও কলেজসংশ্লিষ্টরা। আধিপত্য বিস্তারে মহড়ার পাশাপাশি তাঁরা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের লাঞ্ছিত করার একাধিক ঘটনায় জড়িত বলে অভিযোগ মিলেছে। কলেজে ভর্তি ও পরীক্ষার বিষয়ে তাঁরা চাপ সৃষ্টি করে আসছিলেন।

অভিযুক্ত দানিয়েল পাথরঘাটা ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তাঁর পিতার নাম সাত্তার মাস্টার। ভাই মোফাসসের ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। কলেজের ডিগ্রি চূড়ান্ত বর্ষে অধ্যয়নরত দানিয়েল স্থানীয় সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিতি আছে। কলেজ শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করা ও ছাত্রীদের উত্ত্যক্তের একাধিক ঘটনায় তাঁর নাম এসেছে।

সাদ্দাম হোসেন পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবদুস সালামের ছেলে। ডিগ্রি চূড়ান্ত বর্ষে অধ্যয়নত এ শিক্ষার্থী দানিয়েলের সব অপকর্মের সহযোগী হিসেবে পরিচিত। আরেক নেতা মহিদুল ইসলাম রায়হানের বাড়ি কাকচিড়া ইউনিয়নে। স্বীকারোক্তি দেওয়া মোহাম্মদ মাহমুদ ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মিজানুর রহমানের ছেলে। পাথরঘাটা ফাজিল মাদরাসার এ ছাত্র দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিতে ফরম পূরণ করেছেন। এর আগে পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি বেলাল হোসেনের সঙ্গে বিরোধে জড়ালে পুলিশ তাঁকে আটক করলেও ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। আগস্ট মাসে প্রভাষক মিলন মিয়া ও সামসুল আলমকে ক্লাসে ঢুকে অপমান করেছিলেন দানিয়েল, সাদ্দামসহ অন্যরা।

পাথরঘাটা ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, পাঁচ বছর ধরে এই ছাত্রলীগ নেতাদের কাছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জিম্মি। ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়নি। শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় বিচার চাইলে উল্টো দলীয় নেতাদের কাছে মাফ চাইতে হয়েছে।

এদিকে নৃশংস এ ঘটনার প্রতিবাদে ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল দুপুরে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের উদ্যোগে বরগুনা প্রেস ক্লাব চত্বরে এক প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বক্তব্য দেন সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন বরগুনা জেলা শাখার সভাপতি সোহেলী পারভিন ছবি, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আলহাজ আব্দুর রশীদ, বরগুনা প্রেস ক্লাব সভাপতি মো. জাকির হোসেন মিরাজ, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বরগুনা জেলা শাখার সভাপতি নাজমা বেগম, নারী নেত্রী মাহফুজা বেগম, খালেদা আক্তার সুইটি, হোসনে আরা হাসি, সাংবাদিক সোহেল হাফিজ, মুশফিক আরিফ প্রমুখ।


মন্তব্য