kalerkantho


মেলে শুধু আশ্বাস ফিরছে না স্বজন

► ব্যবসা ধ্বংসের পথে ইশরাকের বাবার
► মোবাশ্বারের মা-বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন
► সংসার চলছে না আশিক ঘোষের পরিবারের
► কান্না থামছে না উৎপলের পরিবারের

ওমর ফারুক   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মেলে শুধু আশ্বাস ফিরছে না স্বজন

তাঁদের কেউ নিখোঁজ হয়েছেন আড়াই মাস আগে, কারো হদিস মিলছে না এক মাস ধরে। কারো নিখোঁজের পর পেরিয়েছে সপ্তাহ।

কিন্তু সবার পরিবারেই একই চিত্র। অসহায় স্বজনরা দিশাহারা হয়ে পড়েছে। বুকে পাথরচাপা দিয়ে ধৈর্য ধরে আছে। ‘খোঁজ মিলেছে’—এমন খবর শোনার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে তারা। সকাল-বিকেল তারা যোগাযোগ করছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে। সেখান থেকে আশ্বাসও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ঘরে ফিরছে না হারানো প্রিয়জন। একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানের ফেরার পথ চেয়ে বসে আছেন মা-বাবা, ভাইয়ের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আকুতি জানাচ্ছেন বোন, খেলনা নিয়ে ফিরবে বাবা—এমন আশায় অপেক্ষায় আছে অবুঝ সন্তান কিংবা প্রিয়তম স্বামীর জন্য দিন গুনছেন অসহায় স্ত্রী। কেউ কেউ অসুস্থও হয়ে পড়েছেন।

গত ২৬ আগস্ট রাজধানীর ধানমণ্ডি এলাকা থেকে নিখোঁজ হন কানাডার মন্ট্রিয়লের ম্যাগসাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ইশরাক আহমেদ। গতকাল তাঁর নিখোঁজের আড়াই মাস পেরিয়েছে। কোনো সন্ধান পায়নি পরিবার। ছেলের চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তাঁর মা নাসরিন আক্তার। ইশরাকের বাবা জামাল উদ্দীন গার্মেন্ট মালিক। ছেলে নিখোঁজের পর থেকে প্রায় দিনই তিনি পুলিশ ও র‌্যাবের কাছে যাচ্ছেন। কিন্তু সুখবর পাচ্ছেন না তাদের কাছ থেকে। গতকালও র‌্যাব-২-এর কার্যালয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল সন্তান নিখোঁজ হওয়ায় জামাল উদ্দীন নিজেও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। বাসায় স্ত্রী কাঁদছেন, তাঁকে দিতে পারছেন না সান্ত্বনা। ব্যবসায়ও মন দিতে পারছেন না। কিন্তু কী কারণে ছেলে নিখোঁজ হয়ে গেল, কোথায় গেলে তাকে পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে সামান্য ধারণাও করতে পারছেন না তিনি।

পরিবার থেকে জানা গেছে, ইশরাক কানাডায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ৯ মাসে দুটি সেমিস্টার শেষে তিন মাসের জন্য দেশে এসেছিলেন। ৩ সেপ্টেম্বর তাঁর কানাডায় ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাঁর সাত দিন আগেই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান।

জামাল উদ্দীনের তিন ছেলে। তাঁদের মধ্যে সবার বড় ইশরাক। ইশরাকের নিখোঁজ হওয়ার কারণে পুরো পরিবারে নেমে এসেছে অন্ধকার। জামাল উদ্দীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আর সহ্য করতে পারছি না। কবে আমার প্রিয় সন্তানকে ফিরে পাব এ কথাই মনে আসে সারাক্ষণ। আমরা ইশরাককে অক্ষত অবস্থায় ফিরে পাওয়ার আকুল আবেদন জানাচ্ছি। চিন্তা করার শক্তিও হারিয়ে ফেলছি আমরা। ’

ইশরাক নিখোঁজের পর ২৬ আগস্ট ধানমণ্ডি থানায় জিডি করেন জামাল উদ্দীন। এ বিষয়ে ধানমণ্ডি থানার ওসি আবদুল লতিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইশরাকের সন্ধান এখনো পাইনি আমরা। আমরা তদন্তে নেমে ইশরাকের বন্ধু, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। ’

গত ৭ নভেম্বর সন্ধ্যা থেকে খোঁজ মিলছে না নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. মোবাশ্বার হাসান সিজারের। তাঁর নিখোঁজের পর সারা দেশে আলোড়ন শুরু হয়। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত তাঁকে উদ্ধারের খবর পাওয়া যায়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরিবারে মোবাশ্বারের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠতা ছিল তাঁর বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মোতাহার হোসেনের। বাসায় এলে বাপ-বেটা বসে গল্প না করলে চলত না তাঁদের। ছেলে নিখোঁজের পর থেকে বাবা চিন্তায় চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁর মা উম্মে কুলসুম আরা বেগমও বিছানায় পড়ে গেছেন। সব মিলিয়ে পরিবারটিকে এখন অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে পথ চলতে হচ্ছে।

মোবাশ্বারের ছোট বোন তামান্না তাসমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা খুব কষ্টের মধ্যে আছি। আমরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছ থেকে শুধু আশ্বাসই পাচ্ছি। প্রতীক্ষা করে আছি ভাই কখন ফিরবে। কিন্তু প্রতীক্ষার শেষ আর হয় না। ’

নিখোঁজের কথা এখনো জানানো হয়নি মোবাশ্বারের মেয়ে আরিয়ানাকে। তাকে বলা হয়েছে, “বাবা বিদেশে পড়তে গেছে। ফেরার সময় তার জন্য প্রিয় খেলনা ‘মাই লিটল পনি’ নিয়ে আসবে। ’ এ কথায় প্রচণ্ড অভিমান করেছে ছোট্ট আরিয়ানা। বাবা তাকে না জানিয়ে বিদেশ যাবে, এটা সে কিছুতেই মানতে পারছে না। সে মাকে বলেছে, ‘কই, বাবা তো আমাকে বলে গেল না। ’ 

এসব কথা জানিয়েছেন মোবাশ্বারের সাবেক স্ত্রী। তাঁর হয়ে গতকাল কথাগুলো ফেসবুকে তুলে দিয়েছেন মোবাশ্বারের বোন তামান্না।

ছেলে নিখোঁজের ঘটনায় মোবাশ্বারের বাবা ৭ নভেম্বর খিলগাঁও থানায় জিডি করেন। খিলগাঁও থানার ওসি মশিউর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। এরই মধ্যে তার সাবেক স্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলেছি আমরা। এ ছাড়া প্রযুক্তি ব্যবহার করেও জানার চেষ্টা করা হচ্ছে মোবাশ্বার কিভাবে নিখোঁজ হয়েছেন। ’

গত ২৭ অক্টোবর রাজধানীর সূত্রাপুর এলাকা থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে তুলে নেওয়ার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন বাংলাদেশ জনতা পার্টির (বিজেপি) কেন্দ্রীয় নেতা আশিক ঘোষ অসিত। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি রাজধানীর দক্ষিণখানে আংটির পাথরের ব্যবসা করেন। পাশাপাশি রাজনীতিতেও জড়িয়েছিলেন। দুই মাস আগে গঠিত হওয়া বিজেপি নামের একটি দলের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে নিজের নাম লেখান। তখন থেকে তিনি নতুন দলের কার্যক্রম নিয়েও ব্যস্ত ছিলেন। গতকাল পর্যন্ত তাঁর খোঁজ পায়নি পরিবার।

আশিক ঘোষের স্ত্রী সতী রানী ঘোষ কালের কণ্ঠকে জানান, স্বামীই তাঁদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। তিনি নিখোঁজ হওয়ায় তাঁর সংসার চলা দায় হয়ে পড়েছে। বকেয়া পড়েছে বাড়িভাড়াও। এখন তিনি দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে সংসার চালাতে পারছেন না। পাশাপাশি কাজ করছে আতঙ্ক।

আশিক ঘোষের সঙ্গে একই দিন বিজেপির সভাপতি মিঠুন চৌধুরীকেও তুলে নেওয়া হেয়ছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল। গতকাল বিকেলে মিঠুন চৌধুরীকে ডিবি পুলিশ আদালতে পাঠিয়ে রিমান্ডে নিয়েছে বলে জানা গেছে।

গত ১০ অক্টোবর নিখোঁজ হন সাংবাদিক উৎপল দাস। গতকাল পর্যন্ত ৩৪ দিন পেরিয়ে গেছে, কিন্তু তাঁকে উদ্ধার করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাঁর সহকর্মীদের কাছ থেকে জানা গেছে, ছেলেকে না পেয়ে উৎপলের মা-বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। অন্য নিখোঁজ ব্যক্তিদের মতো তাঁরাও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে শুধু আশ্বাসই পেয়ে যাচ্ছেন। উৎপলের এক সহকর্মী কালের কণ্ঠকে জানান, উৎপলকে নিয়ে খুব চিন্তার মধ্যে অছেন তাঁর মা-বাবা, ভাই-বোনসহ পরিবারের সবাই। তাঁদের কান্নার যেন শেষ নেই।

উৎপল নিখোঁজের ঘটনায় তাঁর বাবা চিত্তরঞ্জন দাস ১২ অক্টোবর মতিঝিল থানায় জিডি করেন। এ বিষয়ে মতিঝিল থানার ওসি ওমর ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। প্রযুক্তি ব্যবহার করে জানার চেষ্টা করা হচ্ছে উৎপল কিভাবে নিখোঁজ হলেন। ’

গত ২৭ আগস্ট গুলশান এলাকা থেকে নিখোঁজ হন অনিরুদ্ধ রায়। তিনি কয়েক দিন আগে বাড়ি ফিরেছেন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে পুলিশ ও পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এমনকি অনিরুদ্ধর পরিবারের লোকজন তাঁর ফেরার বিষয়টি গোপনের চেষ্টা করছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

গত শনিবার বিকেলে অনিরুদ্ধ রায়ের স্ত্রী শাশ্বতি রায়ের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফিরে আসার খবর সত্যি না। ’ এ বিষয়ে গুলশান থানার ওসি আবু বকর ছিদ্দিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফোন করে অনেক মিডিয়া থেকে জানতে চাচ্ছে তিনি ফিরে এসেছেন কি না, তবে আমাদের কাছে সে তথ্য নেই। আমরা তাঁর পরিবারের কাছ থেকে কিছু জানতে পারিনি। ’

এ ছাড়া গত ২২ আগস্ট বিমানবন্দর সড়ক থেকে অপহৃত হন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও এবিএন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সাদাত আহমেদ। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, ওই দিন রাস্তায় তাঁর গাড়ি থামিয়ে অন্য একটি গাড়িতে তুলে নেওয়া হয় তাঁকে।

২৬ আগস্ট রাজধানীর পল্টন থেকে নিখোঁজ হন কল্যাণ পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান। তাঁরও খোঁজ মেলেনি।


মন্তব্য