kalerkantho


১৬ চিকিৎসকে চলছে ১০০ শয্যার সেবা

মানিক আকবর, চুয়াডাঙ্গা   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



১৬ চিকিৎসকে চলছে ১০০ শয্যার সেবা

সকাল ৭টা ৪০ মিনিট। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা হাসপাতাল পরিষ্কারে ব্যস্ত।

ততক্ষণে দু-একজন রোগী চলেও এসেছে। তারা হাসপাতালের নিচতলায় বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারের সামনে অপেক্ষা করছে।

জরুরি বিভাগের রাতের পালার চিকিৎসক ডা. আবু হাসান ওয়াহেদুজ্জামান রানা তখনো দায়িত্ব পালন করছেন। পরের পালার চিকিৎসক ডা. সেলিমা আক্তার আসবেন সকাল ৮টায়।

৭টা ৫০ মিনিট। দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা থেকে আসা রুমা নামের এক রোগীকে টিকিট কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। তিনি বললেন, তিনি ভায়া পরীক্ষা (জরায়ু মুখের ক্যান্সার পরীক্ষার পদ্ধতি) করাতে এসেছেন। শুনেছেন, সকাল সকাল না এলে ফিরে যেতে হয়। এ জন্যই আগেভাগেই আসা।

হাসপাতালের কার্যালয় কক্ষটি দোতলায়। ৭টা ৫৩ মিনিটে কার্যালয় কক্ষের (নম্বর ২০২) তালা খুললেন অফিস সহায়ক তাসলিমা খাতুন। ঘড়ির কাঁটা যখন ৮টার ঘরে, হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স জলি খাতুন কার্যালয় কক্ষে ঢুকে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে আঙুলের ছাপ দিয়ে হাজিরা দিলেন। এ সময় এলেন আরো কয়েকজন। সকাল ৮টায় জরুরি বিভাগে বসার কথা ডা. সেলিমা আক্তারের। তিনি ৮টা ১৯ মিনিটে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে হাজিরা দিয়ে নিচতলায় জরুরি বিভাগে গেলেন দায়িত্ব পালন করতে।

নিচতলার বহির্বিভাগে ততক্ষণে টিকিট কাউন্টার খুলে গেছে। বেশ কিছু রোগীর ভিড়ও দেখা গেল। দোতলায়ও বহির্বিভাগে রোগী দেখেন চিকিৎসকরা। সকাল ৮টা ২৯ মিনিটে বহির্বিভাগে চিকিৎসকদের কক্ষ খোলা শুরু হলো। তবে সব কক্ষ নয়, তিন-চারটি খুলে রাখা হলো। তখনো পর্যন্ত কোনো চিকিৎসক এসে রোগী দেখা শুরু করেননি। ৮টা ৩৩ মিনিটে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, বহির্বিভাগে রোগী দেখার জন্য কোনো চিকিৎসক আসেননি।

এই ছিল গতকাল মঙ্গল সকালে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের চিত্র। আরো কয়েক ঘণ্টা হাসপাতালে অবস্থান করে পাওয়া গেছে চিকিৎসাসেবার আরো নানা চিত্র।

আলমডাঙ্গা থেকে এসেছেন রমেছা (৫৫)। তিনি বলেন, ‘সকাল সকাল হাসপাতালে এসেছি, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরব। কোনো ডাক্তার তো নেই। ’ এরপর সেখানে অপেক্ষায় থাকা অন্য একজনের পরামর্শ নিয়ে রমেছা চলে গেলেন জরুরি বিভাগে।

বহির্বিভাগের ওষুধ বিতরণ কেন্দ্র নিচতলায়। রোকসানা পারভীন ছুটিতে থাকায় দায়িত্বে আছেন খুরশিদা পারভীন। তিনি জানান, ৮টা ৫০ মিনিটে প্রথম একজন রোগী এসে ওষুধ নিয়ে গেছেন। তাঁকে ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন ডা. কানিজ নাঈমা।

সকাল ৯টা ০৫ মিনিটে দোতলায় ২১৪ নম্বর কক্ষে গিয়ে দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনার রুমা, সদর উপজেলার সরোজগঞ্জের ফাতেমা ও মেহেরুন খাতুনকে অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেল। তাঁরা সবাই ভায়া পরীক্ষা করাবেন। কিন্তু যিনি পরীক্ষার দায়িত্বে তিনি তখনো আসেননি।

ডা. জয়নাল আবেদিন সকাল ৯টা ০৭ মিনিটে তাঁর কক্ষে আসেন। এর পরপরই হাসপাতালের একজন এসে খবর দেন, বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসের শোভাযাত্রা হবে, যেতে হবে তাঁকে। কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন ডা. জয়নাল।

চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. মো. খায়রুল আলমের নেতৃত্বে হাসপাতালসংলগ্ন সিভিল সার্জন অফিস থেকে শোভাযাত্রা শুরু হলো এবং সাড়ে ৯টায় হাসপাতালে এসে শেষ হলো। ইতিমধ্যে বহির্বিভাগের অনেক রোগী হাসপাতালে এসে চিকিৎসকদের কক্ষের বাইরে অপেক্ষা করছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ডায়াবেটিস দিবসের শোভাযাত্রা শেষে হাসপাতালের দোতলার একটি কক্ষে চিকিৎসকরা ডায়াবেটিস দিবসের আলোচনায় ব্যস্ত। এ কারণেই বহির্বিভাগে চিকিৎসক নেই।

ডায়াবেটিস দিবসের আলোচনাসভায় অনেক চিকিৎসক ব্যস্ত থাকলেও উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার ডা. রবিউল ইসলামকে তাঁর কক্ষে পাওয়া গেল। তিনি রোগী দেখা শুরু করেছেন। মাত্র পাঁচজন রোগী দেখার পরপরই জরুরি ফোন এলো। ৯টা ৫০ মিনিটে তিনি কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। যেতে যেতে বললেন, ‘জেএসসি পরীক্ষার হলেও দায়িত্ব পালন করতে হয়। এক পরীক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাকে দেখতে হবে, চলে যেতে হচ্ছে। ’

কিছুক্ষণ পর একই কক্ষে এলেন আরেক উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার ডা. আশরাফুল হক। তিনি জানান, এতক্ষণ তাঁকে জরুরি বিভাগে ডা. সেলিমা আক্তারকে সহযোগিতা করতে হয়েছে। এ জন্য এখানে রোগীদের অপেক্ষা করতে হয়েছে। তিনি জানান, লোকবল সংকটের কারণে বিভিন্ন রকম দায়িত্ব পালন করতে হয়। কোনো চিকিৎসক যদি ময়নাতদন্ত কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাঁর নির্ধারিত দায়িত্ব অন্যকে পালন করতে হয়। এ জন্য সময়মতো কক্ষে বসা সম্ভব হয় না।

সকাল ১০টা ১০ মিনিট। ততক্ষণে শেষ হয়েছে ডায়াবেটিস দিবসের আলোচনাসভা। স্বস্তি ফেরে অপেক্ষমাণ রোগীদের মধ্যে। তবে তখনো অনেক চিকিৎসককে কক্ষে ফিরতে দেখা যায়নি।

আলোচনাসভা শেষ করে ডা. কানিজ নাঈমা তাঁর কক্ষে এসে রোগী দেখা শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে রোগী দেখা শুরু করেছি। পাঁচ-ছয়টি রোগী দেখে শোভাযাত্রা ও আলোচনাসভায় গিয়েছিলাম। এখন আবার রোগী দেখা শুরু হলো। ’

সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট। ভায়া পরীক্ষার জন্য ২১৪ নম্বর কক্ষে এসেছেন সিনিয়র স্টাফ নার্স বিভা লাহিড়ী। তিনি ভায়া পরীক্ষা করবেন। সকাল থেকে রোগীরা তাঁর কক্ষে অপেক্ষা করছে—বলতেই তাঁর জবাব, সিভিল সার্জন অফিসে কাজ ছিল। ভায়া পরীক্ষা ছাড়াও তাঁদের ডায়রিয়া রিপোর্ট তৈরি করতে হয়। ব্যস্ত থাকতে হয় অন্যদিকে।

সকাল ১১টার পর থেকেই সার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. ওয়ালিউর রহমান নয়নের কক্ষের সামনে রোগীদের ভিড়। তিনি এলেন দুপুর পৌনে ১২টায়। রোগীর সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা আলমডাঙ্গা উপজেলার মুন্সীগঞ্জের ডলি খাতুন বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন, ‘এভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে না থেকে চেম্বারে গিয়ে দেখানো অনেক ভালো। কষ্ট কম হয়। ’

একই সারিতে থাকা দামুড়হুদা উপজেলার জয়রামপুর গ্রামের আলেয়া বেগম বলেন, ‘আমার ব্রেস্ট টিউমার হয়েছিল। ডা. নয়ন স্যার অপারেশন করেছেন। সমস্যা হচ্ছে বলে এসেছি। অনেকক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। ’

দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে সদর উপজেলার ভাণ্ডারদহ গ্রামের রবিউল ইসলামকে দেখা গেল চিকিৎসক দেখিয়ে ফার্মেসি বিভাগে এসে ওষুধ নিচ্ছেন। তিনি অ্যাজমা ও ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত। তাঁকে হাসপাতাল থেকে তিন ধরনের ওষুধ বিনা মূল্যে দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসক বলেছেন, একটা সিরাপ বাইরে থেকে কিনতে হবে।

হাতিকাটা গ্রামের নাজমা বেগমের মন খারাপ। তাঁকে একটা ওষুধ হাসপাতাল থেকে দেওয়া হয়েছে। বাকি আরো তিনটি ওষুধ কিনতে হবে বাইরে থেকে।

দুপুর ১টা বেজে যাওয়ার পরপরই হাসপাতালে উপস্থিত থাকা প্রায় সব চিকিৎসক তাঁদের কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। গন্তব্য দোতলার হলরুম। যে কক্ষে সকালে ডায়াবেটিস দিবসের আলোচনাসভা হয়েছে। চিকিৎসকদের পরপরই দেখা গেল স্টাফ নার্সরাও দলবেঁধে হাসপাতালের করিডর ধরে হলরুমের দিকে যাচ্ছেন। জানা গেল, সিভিল সার্জন ডা. মো. খায়রুল আলমের নেতৃত্বে এফআইপিভি ভ্যাকসিন বিষয়ে কর্মশালা অনুষ্ঠিত হবে।

দুপুর ১টায় এফআইপিভি-বিষয়ক কর্মশালা শুরু হওয়ার কারণে শহরের কোর্টপাড়ার ফরিদা বেগম, দামুড়হুদা উপজেলার ছোটদুধপাতিলা গ্রামের বিলকিস বেগমসহ আরো কয়েকজন চিকিৎসক দেখাতে পারেননি। সব চিকিৎসক ব্যস্ত থাকায় ফিরে যেতে হয় তাঁদের।

তাঁদেরই একজন বললেন, ‘রবিবারে এসে শুনলাম ডাক্তার অপারেশন থিয়েটারে। আজ শুনলাম ডাক্তাররা মিটিং করছেন। তাহলে আমরা কোথায় যাব?’

নিজেদের কক্ষে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি প্রসঙ্গে হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মো. শামীম কবির বলেন, ‘চিকিৎসকরা হাসপাতালে এসে ভর্তি রোগীদের দেখেন। প্রতিদিন ভর্তি থাকে প্রায় আড়াই শ রোগী। তাদের দেখার পর চিকিৎসকরা বহির্বিভাগের রোগী দেখার সুযোগ পান। এ জন্যই একটু দেরিতে চিকিৎসকরা তাঁদের কক্ষে গিয়ে বহির্বিভাগের রোগী দেখা শুরু করেন।

এ ব্যাপারে সিভিল সার্জন ও সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. খায়রুল আলম বলেন, বহির্বিভাগের রোগীদের যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সেদিকে নজর রাখা হয়েছে। আজ (মঙ্গলবার) শোভাযাত্রা এবং ডায়াবেটিস দিবসের আলোচনার পর কর্মশালাটি শুরু করা হয় দুপুর ১টার পর। এর মধ্যেই বহির্বিভাগের রোগী দেখার কাজ শেষ করা হয়। রোগীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই কর্মশালা করা হয়েছে দুপুর ১টার পর।

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ৫০ শয্যার লোকবল হিসেবে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ২১ জন চিকিৎসক থাকার কথা। ১৩ বছর আগে ১০০ শয্যা হওয়ার পর থেকেই হাসপাতালের চিকিৎসকও দ্বিগুণ হওয়ার কথা। তা হয়নি। বরং চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে এখন চিকিৎসক আছেন ১৬ জন। নার্সসহ অন্যান্য পদেও রয়েছে জনবল সংকট। প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম জনবল নিয়ে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার রোগী সামাল দিতে হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতিদিন জরুরি বিভাগে ১৫০ থেকে ২০০, বহির্বিভাগে ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী দেখতে হয়। হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন ভর্তি থাকে ২০০ থেকে ২৫০ রোগী।


মন্তব্য