kalerkantho


নিষিদ্ধ, তবু সুন্দরবনে পারশে পোনা ধরতে ব্যাপক প্রস্তুতি

কৌশিক দে, খুলনা   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



নিষিদ্ধ, তবু সুন্দরবনে পারশে পোনা ধরতে ব্যাপক প্রস্তুতি

বিশ্বের সর্ববৃহৎ ও বৈচিত্র্যে ভরা ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার, নেট জাল ব্যবহার এবং রেণু পোনা আহরণ নিষিদ্ধ দীর্ঘদিন ধরেই। তার পরও আসন্ন মৌসুমে সেখানে পারশে পোনা আহরণে প্রস্তুতি নিচ্ছে খুলনার দুই শতাধিক জেলে।

এরই মধ্যে জেলার সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা উপজেলার পোনা ব্যবসায়ীরা বিলাসবহুল ও দ্রুতগতির ২২টি ট্রলার তৈরি করেছে।

অভিযোগ রয়েছে, নিষিদ্ধ সত্ত্বেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়িয়ে বন বিভাগের এক শ্রেণির কর্মকর্তার যোগসাজশে পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের শিবসা নদীর সাগর উপকূলে জেলেরা নেট জালের মাধ্যমে পোনা ধরে থাকে। এতে সরকার মোটা অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। জীববৈচিত্র্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে। তবে বন কর্মকর্তারা বিষয়টির সত্যতা অস্বীকার করে বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা বন বিভাগের চোখ ফাঁকি দিয়ে পোনা আহরণ করতে পারে। তবে বন বিভাগের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কেউ ধরা পড়লে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের শিবসা নদীর সাগরসংশ্লিষ্ট এলাকা, হংসরাজ নদীর মোহনা, কালিরচর, আলোর কোল, মেহের আলীর চর, নারকেলবাড়িয়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় জোয়ারের সময় নেট জালে পারশে মাছের রেণু পোনা ধরে জেলারা। এক শ্রেণির ব্যবসায়ীর মাধ্যমে জেলেরা নভেম্বরের শেষ থেকে মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত এই পোনা আহরণ করে থাকে।

প্রতি ট্রলারে গড়ে ১০-১২ জন জেলে সেখানে দুই-তিন দিন অবস্থান করে পোনা শিকারে এক হাজার ফুট দৈর্ঘ্যের নেট জাল ব্যবহার করে। ২০০-৩০০ কেজি পোনা ধরার পর জেলেরা দ্রুত ট্রলার চালিয়ে সুন্দরবন অভ্যন্তরের শিবসা নদী বেয়ে পাইকগাছা থানার শিববাড়ী পোনা সেটে (পোনা বিক্রির স্থান) এসে সেগুলো বিক্রি করে। এখানে প্রতি কেজি রেণু পোনা তিন থেকে চার হাজার টাকায় বিক্রি হয়। প্রতি কেজিতে গড়ে সাত-আট হাজার পোনা থাকে। এভাবে একেকটি ট্রলারের পোনা গড়ে ছয় থেকে ৯ লাখ টাকায় বিক্রি হয়।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি ট্রলার পোনা সেটে আসার আগেই অলিখিত চুক্তি অনুযায়ী বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এক লাখ টাকা করে দিতে হয়। কোস্ট গার্ড ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়াতে জেলেরা সাধারণত রাতে পোনা ধরে থাকে। পোনা আহরণ শেষে ফেরার পথেও জেলেরা বনের আধা চাকি ও শিবসা ফরেস্ট ক্যাম্প, কালাবগী স্টেশন, নলিয়ান ফরেস্ট রেঞ্জ অফিস ও নলিয়ান ফরেস্ট স্টেশনের সামনে দিয়ে গড়ইখালী বাজার হয়ে ভোররাতে শিববাড়ী পোনা সেটে পৌঁছায়। জেলেরা বনে ঢোকার আগেই এসব স্টেশনে যোগাযোগ করে। দুজন বনরক্ষীর তত্ত্বাবধানে ট্রলারগুলো অতি সহজে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত এখান থেকে ঘের মালিকরা চাহিদা অনুযায়ী পারশে মাছের পোনা সংগ্রহ করে।

নাম প্রকাশ না করে কয়রার ঝিলিয়াঘাটা গ্রামের এক জেলে বলেন, ‘পোনা ধরতে যাওয়ার প্রস্তুতির সময় মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে সাত-আট লাখ টাকা ঋণ নিতে হয়। ট্রলারটিও বিলাসবহুল হতে হয়। প্রতিটি ট্রলারে থাকে ১০০ ওয়াটের সোলার প্যানেল। পোনা বাঁচিয়ে রাখতে পানি পরিবর্তনের জন্য একটি মেশিন রাখা হয়। এ ছাড়া বনে ঢোকার আগে পুলিশ ও বন বিভাগের সঙ্গে চুক্তি করতে মোটা অঙ্কের টাকা অগ্রিম দিতে হয়। এ জন্য পোনার দাম বেশি পড়ে। তার পরও গেল বছর চার মাস পোনা ধরে লক্ষাধিক টাকা ভাগে পেয়েছিলাম। তাই এবারও প্রস্তুতি নিয়েছি। ’

সূত্র জানায়, চলতি বছর কয়রা উপজেলার ঝিলিয়াঘাটা, ২ নম্বর কয়রা, ৫ নম্বর কয়রা, বেদকাশী ও কাটকাটা গ্রামের ২২ জন রেণু পোনা ব্যবসায়ী বিলাসবহুল ও দ্রুতগতির ২২টি ট্রলার প্রস্তুত করেছে। আগামী সপ্তাহে সুন্দরবনের সাগর উপকূলে পোনা ধরতে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে তারা।

বিগত বছরে এ ব্যবসায় জড়িত কয়রা থানার লোকা গ্রামের আবু তালেব ও ৬ নম্বর কয়রা গ্রামের ইদ্রিস মোল্যা জানান, পাইকগাছা থানার শিববাড়ী ব্রিজের নিচে পোনার সেটে চাহিদা ও ভালো দাম পাওয়ায় সুন্দরবনের শিবসা নদী এ ব্যবসায় চলাচলের জন্য ভালো। নলিয়ান রেঞ্জ অফিসের সহযোগিতা না পেলে এ ব্যবসা আদৌ সম্ভব নয়।

পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) খুলনার বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জেলেরা যে নেট জালের মাধ্যমে পোনা আহরণ করে তা জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। এভাবে পোনা আহরণ করতে গিয়ে জেলেরা হাজারো প্রজাতি নষ্ট করে ফেলে। এ জন্য সরকার এই পোনা আহরণ নিষিদ্ধ করেছে। ’

খুলনা পশ্চিম বন বিভাগীয় অফিসে কর্মরত ফরেস্ট গার্ড অলিয়ার রহমান মিলন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পূর্ব বন বিভাগে মত্স্য আহরণের অনুমতি থাকলেও পশ্চিম বন বিভাগে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেউ এই এলাকায় পোনা আহরণ করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এখানে পোনা শিকারে বন বিভাগের সহযোগিতার অভিযোগ সঠিক নয়। ’

নলিয়ান ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা এস এম শোয়াইব খান বলেন, ‘সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগে যন্ত্রচালিত ট্রলার চলাচল ও মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেউ কেউ চোখ ফাঁকি দিয়ে যেতে পারে। তবে বন বিভাগকে ম্যানেজের বিষয়টি সঠিক নয়। ’


মন্তব্য