kalerkantho


সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড

অতল সমুদ্রে রহস্য সন্ধান

আরিফুর রহমান   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



অতল সমুদ্রে রহস্য সন্ধান

সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডে ডলফিনের অবাধ বিচরণ। ছবি : সংগৃহীত

সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড—বঙ্গোপসাগরের সবচেয়ে গভীর এলাকা। ১৪ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত মেরিন সংরক্ষিত এই এলাকা নিয়ে আছে পৌরাণিক নানা কল্পকাহিনি।

অষ্টাদশ শতকে বিপুল ধনরত্ন নিয়ে ব্রিটেনের উদ্দেশে রওনা হওয়া একটি জাহাজ ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবে যায় সাগরের এই পয়েন্টে। সেই জাহাজের হদিস মেলেনি আজও। বিশ্বের বড় ১১টি উপত্যকার মধ্যে এটি একটি। গভীরতা এক শ মিটার থেকে এক হাজার মিটার অর্থাৎ তিন হাজার ফুট পর্যন্ত।

কী আছে বঙ্গোপসাগরের সবচেয়ে গভীরতম খাদে? বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশে এর আগে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে তেমন গবেষণা হয়নি। বিচ্ছিন্নভাবে কেউ কেউ ঘুরে এসেছেন, ব্যস ওইটুকুই। জাতিসংঘ ঘোষিত ১৫ বছরমেয়াদি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) একটি অভীষ্ট রয়েছে জলজ জীবন ও সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ নিয়ে। এবার সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের অজানাকে জানতে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে যাচ্ছে দেশের বেসরকারি সংস্থা ‘ইসাবেলা ফাউন্ডেশন’। জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে থাকছেন সরকারি দলের প্রতিনিধিও।

‘মীন সন্ধানী’ নামের জাহাজে করে ১৭ নভেম্বর সকালে চট্টগ্রাম থেকে সোয়াচের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করবেন ইসাবেলা ফাউন্ডেশনের গবেষকরা। ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (প্রশাসন) কবির বিন আনোয়ারের নেতৃত্বে থাকছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান উপদেষ্টা ড. আনিসুজ্জামান খান, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সমুদ্রবিজ্ঞানী, জিআইএস ও বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞসহ অন্যরা।

কবির বিন আনোয়ার এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সোয়াচে কী আছে তা অনুসন্ধানের জন্য আমরা সেখানে যাচ্ছি। সেখানে আমরা শুধু পাখি নিয়ে গবেষণা করব না। গবেষণা হবে জলজ প্রাণী, সমুদ্রের তলদেশের লতা-গুল্মসহ আরো অনেক বিষয় নিয়েও। সাগরের ওই অংশের তলদেশে কী আছে আমরা দেখতে চাই, জানতে চাই। পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে এক সপ্তাহের জন্য আমরা সোয়াচে যাচ্ছি। আমাদের এই গবেষণা সরকারের নীতিকৌশল প্রণয়নে বেশ কাজে আসবে আশা করছি। ’ সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডে অভিযাত্রার আগ্রহ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০১২ সালে সুন্দরবন সফরে গিয়ে প্রথম বঙ্গোপসাগরে সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের কথা জানতে পারি। তারপর থেকেই সেখানে যাওয়ার আগ্রহ তৈরি হয় আমার। ভয়ের কারণে মানুষ সেখানে যেতে চায় না। সোয়াচে কী আছে তা কেউ জানে না। গত এপ্রিলে এক দিনের জন্য আমরা সেখানে গিয়েছিলাম। এক দিনের ওই দেখার পর সেখানে কী আছে তা জানার আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। এবার বড় ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে যাচ্ছি। ’

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র বলছে, মিয়ানমার ও ভারত থেকে এক লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমা পাওয়ার পর থেকে ‘নীল সমুদ্র অর্থনীতি’ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয় বাংলাদেশের। এর সঙ্গে ২০১৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় অনুমোদন পেয়েছে ১৫ বছরমেয়াদি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি। ১৭টি অভীষ্টের মধ্যে ১৪ নম্বরে জলজ সম্পদের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে নীল সমুদ্র অর্থনীতির দিকে ঝুঁকছে সরকার। সাগর সম্পদ আহরণে কেনা হয়েছে মিন সন্ধানী জাহাজ।

ইসাবেলা ফাউন্ডেশনের গবেষকরা বলছেন, সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডে রয়েছে তিমি, ডলফিন, হাঙ্গরসহ বিভিন্ন প্রজাতির জলজ প্রাণীর অভয়ারণ্য। এসব প্রাণীর নিরাপদ প্রজনন কেন্দ্র এটা। এ কারণে এটাকে ২০১৪ সালে মেরিন সংরক্ষিত অঞ্চল ঘোষণা করে সরকার। গত এপ্রিলে ইসাবেলা ফাউন্ডেশনের গবেষকরা যখন বঙ্গোপসাগরের ওই অঞ্চলে যান তখন দুই প্রজাতির তিমি, চার প্রজাতির ডলফিন, ১৮ প্রজাতির সামুদ্রিক পাখি, দুই প্রজাতির কচ্ছপের সন্ধান মেলে। সেখানে রয়েছে প্রচুর মত্স্যসম্পদ।

ড. আনিসুজ্জামান খান বলেন, ‘সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড সম্পর্কে জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করতে আমাদের এই অভিযাত্রা। সরকারের এসডিজি বাস্তবায়নের পাশাপাশি যেকোনো নীতি-কৌশল প্রণয়নে কাজে আসতে পারে আমাদের এই গবেষণা। ’


মন্তব্য