kalerkantho


আসেম বৈঠকেও বিশেষ গুরুত্ব পাবে রোহিঙ্গা ইস্যু

মেহেদী হাসান   

১৮ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



আসেম বৈঠকেও বিশেষ গুরুত্ব পাবে রোহিঙ্গা ইস্যু

মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে এশিয়া-ইউরোপ মিটিংয়ে (আসেম) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে ও বৈঠকের ফাঁকে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকট বিশেষ গুরুত্ব পাবে। আগামী সোম ও মঙ্গলবার অনুষ্ঠেয় ওই বৈঠকে যোগ দিতে মিয়ানমার যাওয়ার পথে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য আজ শনিবার ও আগামীকাল রবিবার ঢাকায় আসছেন চীন, জাপান, জার্মানি, সুইডেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা।

এর মধ্যে চীন ছাড়া অন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা কক্সবাজারে গিয়ে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখবেন। এটি তাঁদের মিয়ানমার সফরের সময় রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনায় আরো সহায়ক হবে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সদস্য জেফ মার্কলের নেতৃত্বে সাত সদস্যের প্রতিনিধিদল আজ ঢাকায় আসার পরপরই রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে কক্সবাজার সফর করবে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের থার্ড কমিটিতে গত বৃহস্পতিবার রাতে গৃহীত প্রস্তাবের কারণে বেশ বড় ধরনের চাপে পড়েছে মিয়ানমার। সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা বলছেন, থার্ড কমিটিতে গৃহীত প্রস্তাব আগামী মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্লেনারিতে উপস্থাপিত হবে। ওই প্রস্তাবে মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের একজন বিশেষ দূত নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রস্তাবটিতে রাখাইন রাজ্যে অনতিবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ, সবার মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা ও বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করার জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এতে গত আগস্ট থেকে রাখাইন রাজ্যে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা ও বিচারের আওতায় আনার বিষয়ে জোর দেওয়া হয়। সাধারণ পরিষদের প্লেনারিতে প্রস্তাবটি গৃহীত হওয়ার পর জাতিসংঘ মহাসচিব একজন উপযুক্ত ব্যক্তিকে এই পদে নিয়োগ দেবেন।

 

চীন, রাশিয়াসহ ১০টি দেশ ওই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিলেও তা সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সাধারণ পরিষদের থার্ড কমিটিতে গৃহীত হওয়ায় মিয়ানমারের জন্য একটি বড় ধরনের চাপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ মাসেই ঢাকায় কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি সম্মেলনের সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী ওই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিতে সদস্য দেশগুলোর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছিলেন। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টায় এটি একটি বড় অগ্রগতি। তবে এ চাপ ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, আসেমের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের রিট্রিট সেশনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে সম্ভাব্য এজেন্ডা হিসেবে আছে শান্তি উৎসাহিতকরণ এবং এশিয়া ও ইউরোপে প্রথাগত ও অপ্রথাগত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। রোহিঙ্গা সংকট ইতিমধ্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাই এ বিষয়টি সেখানে ওঠার কথা রয়েছে।

আসেম বৈঠকের ফাঁকে ইইউর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করবে। গত মাসে লুক্সেমবার্গে ইইউর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের সময়ই আসেম বৈঠক ঘিরে এ ইস্যুতে আলোচনার সুযোগ কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত হয়।

জানা গেছে, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং উই, জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিগমার গ্যাব্রিয়েল, সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গট ওয়ালস্ট্রম ও জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কানো আজ ঢাকায় এসে পৌঁছবেন। ইইউয়ের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তাবিষয়ক হাইরিপ্রেজেন্টেটিভ ফেদেরিকা মঘেরিনি আগামীকাল ভোরের মধ্যে ঢাকায় আসবেন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়া অন্য চার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী কাল সকালে কক্সবাজার যাবেন। সেখানে তাঁরা রোহিঙ্গা পরিস্থিতি সরেজমিন দেখে ঢাকায় ফিরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মিয়ানমারের উদ্দেশে রওনা হবেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী ও জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিগমার গ্যাব্রিয়েল একসঙ্গে নেপিডো যাবেন। সেখানে তাঁরা আসেমের ১৩তম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন। এ বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আরো দুই দিন মিয়ানমারে অবস্থানের কথা রয়েছে। সে সময় দুই দেশের আনুষ্ঠানিক বৈঠকে প্রত্যাবাসনবিষয়ক একটি চুক্তি সই করার চেষ্টা করবে বাংলাদেশ।

সিনেটর জেফ মার্কলের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কংগ্রেস প্রতিনিধিদল আজ ঢাকায় আসছে। জানা গেছে, ওই দলে দুজন সিনেটর, তিনজন কংগ্রেসম্যান ও চারজন স্টাফ রয়েছেন। প্রতিনিধিদলটি আজই কক্সবাজারের বালুখালীতে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করবে। কাল বাংলাদেশ ছাড়ার আগে প্রতিনিধিদলটি প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করবে।

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান : রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অঙ্গীকার করেছে মিয়ানমারের বেসামরিক সরকার। সরকারের এসব অঙ্গীকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহযোগিতা করতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন গত বুধবার নেপিডোয় গিয়ে মিয়ানমারের সামরিক সর্বাধিনায়ক ও সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংকে আহ্বান জানিয়েছেন। তবে এর এক দিন পরই মিন অং হ্লাইং বলেছেন, ‘মিয়ানমারের প্রকৃত নাগরিক’রা যত দিন না চাইবে তত দিন পর্যন্ত রোহিঙ্গারা দেশে ফিরতে পারবে না।

মিয়ানমারের সংবাদপত্র মিজিমায় প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে জেনারেল মিনকে কট্টরপন্থী সেনাপ্রধান হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও রাখাইন রাজ্যের রাখাইন সম্প্রদায় রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর অত্যাচার চালিয়ে দেশছাড়া করলেও সেনাপ্রধান তা পুরোপুরি নাকচ করেছেন। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক নয়—এমন ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় রাখাইন নৃগোষ্ঠীর লোকজনই মিয়ানমারের প্রকৃত নাগরিক। তাই রাখাইনরা কী চায় সে বিষয়ে অবশ্যই জোর দিতে হবে। যখন স্থানীয় সম্প্রদায় তাদের গ্রহণ করবে তখনই আমরা সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পারব। ’

গণহত্যার জোরালো প্রমাণ পাওয়ার দাবি : যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার সংস্থা হলোকাস্ট মিউজিয়াম এবং  দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানবাধিকার সংস্থা ফোরটিফাই গ্রুপের এক যৌথ অনুসন্ধানে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর গণহত্যা চালানোর ‘জোরালো প্রমাণ’ পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। এদিকে নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত সংঘবদ্ধ ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের যৌন নিপীড়নের আলামত সংগ্রহ করেছে। গণহত্যা ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দুটি প্রতিবেদনেই মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আবারও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর আগেও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ এনেছে।

১২ সপ্তাহে ছয় লাখ ২০ হাজার : জেনেভায় জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র উইলিয়াম স্পিন্ডলার গতকাল সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, গত ২৫ আগস্ট থেকে অন্তত ছয় লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসেছে। গত ১০ দিনে হাতে তৈরি প্রায় ৩০টি ভেলায় করে হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা এসেছে। তারা রোহিঙ্গারা ইউএনএইচসিআরকে জানিয়েছে, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে তারা মিয়ানমার উপকূলে অপেক্ষা করেছে। সেখানে রোহিঙ্গাদের খাবার ও পানি ফুরিয়ে যাচ্ছে।


মন্তব্য