kalerkantho


তিন দিক থেকে হামলায় পড়ে হটে হানাদার

কুদ্দুস বিশ্বাস, রৌমারী (কুড়িগ্রাম)   

৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



তিন দিক থেকে হামলায় পড়ে হটে হানাদার

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাদের

আব্দুল কাদের সেই বীর সেনানীদের একজন, যাঁদের কারণে পাকিস্তানি বাহিনীর কলুষিত পা রৌমারীর মাটি স্পর্শ করতে পারেনি। কাদের ও তাঁর সহযোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে হানাদাররা ব্রহ্মপুত্র নদের চরে এসেও ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। এখানকার মুক্তিযোদ্ধাদের বিরল প্রতিরোধ লড়াইয়ের ফলেই মুক্তিযুদ্ধের পুরো ৯ মাস রৌমারী ছিল স্বাধীন। ওই অঞ্চলের সবখানে সার্বক্ষণিক স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়েছে পত পত করে। দেশের একমাত্র মুক্তাঞ্চল কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বাইটকামরী গ্রামে বাড়ি আব্দুল কাদেরের। হানাদার বাহিনীর হাতে পড়েও বেঁচে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাদের যুদ্ধাহত। সম্প্রতি তাঁর বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি প্রাণ খুলে তাঁর মুক্তিসংগ্রামের স্মৃতিচারণা করেন; বলেছেন জীবনযুদ্ধের কথাও।

দেড় শ যোদ্ধার সংঘবদ্ধ হামলা :  ‘১৯৭১ সালের ১১ অক্টোবর। আমাদের মিশন ছিল চিলমারী নৌবন্দরে ওয়াপদা বিল্ডিংয়ে অবস্থান নেওয়া হানাদানদের ক্যাম্প দখলে নেওয়া। ক্যাম্প থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে ব্রহ্মপুত্র নদের তিনটা চরে ১২ জনের গ্রুপ করে কমপক্ষে দেড় শ মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান নিই।

বিকেলের দিকে বাংকারে আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নিয়ে আছি আমরা ১২ জনের একটা দল। সবার কাছে রাইফেল আর একটা করে গ্রেনেড। তারপর সবাই মিলে হানাদারদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করি। সারা রাত চলে গুলি-পাল্টাগুলি। শেষ রাতের দিকে হঠাৎ পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের অবস্থান জানতে বিশেষ আলো জ্বালায়। এ সময় আমাদের সহযোদ্ধা আবদুল মজিদ মনে করেছিল আমাদের বিজয় হয়েছে। সে উল্লাসে চিৎকার করে ক্যাম্পের দিকে ছুটে যায়। দূর থেকে গুলি করে তাকে শহীদ করে হানাদাররা। এদিকে দুপুর হয়ে যায় কিন্তু আমাদের খাবার বা গোলাবারুদ আসে না। পরে সন্দোয়া চরের যে বাড়িতে আমরা কমান্ডারের সঙ্গে অবস্থান করতাম সেদিকে রওনা দিই। ’

কোমরে গুলি খাই : আব্দুল কাদের বলেন, “সন্দোয়া চরের ওই বাড়িতে আমরা যেই ঢুকছি—ভেতর থেকে ব্রাশফায়ার শুরু হয় আমাদের লক্ষ্য করে। সহযোদ্ধা সাদেকুল ইসলাম, আসাদ মিয়া, আব্দুল বারী, আব্দুল হামিদ ও আব্দুল লতিফ লুটিয়ে পড়ে। গুলিবিদ্ধ হয়েও সাদেকুল ইসলাম দৌড়ে নদীতে ঝাঁপ দিতে পেরেছিল। মুহূর্তেই আমরা বুঝে যাই মুক্তিবাহিনীর বাড়িটি দখল করে অবস্থান নিয়েছে হানাদাররা। এ অবস্থায় পেছনে থাকা আমরা পাঁচজন ধানক্ষেতে লুকিয়ে থাকি। কিন্তু পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের অবস্থান বুঝতে পেরে পুরো ধানক্ষেত ঘিরে ফেলে গুলি করতে থাকে। ধানক্ষেত থেকে আমরা পাল্টা গুলি করে আত্মরক্ষার চেষ্টা করি। তখন আমাদের কাছে গুলিও শেষ। শেষ চেষ্টা হিসেবে আমরা গ্রেনেড ছুড়ি। হঠাৎ একটি গুলি আমার কোমরের পেছন দিকে লাগে এবং আমি আর হামাগুড়ি দিতে পারছিলাম না। তখন আমার সঙ্গে থাকা চারজনকে চলে যেতে বলি। তারা কোনো রকমে হামাগুড়ি দিয়ে বেঁচে যায়। এদিকে আমার সারা শরীরের কাপড় রক্তে ভিজে গেছে। আমি মরার মতো করে উপুড় হয়ে শুয়ে আছি। ব্যথাও হচ্ছে। কয়েকজন পাকিস্তানি আর্মি আমাকে খুঁজে বের করে। এদের একজন আমাকে লাথি মেরে বলে, ‘এ সালা মার গিয়ে’ (এই শালা মরে গেছে)। এরপর তারা চলে যায় এবং আমি প্রাণে বেঁচে যাই। ”

যুদ্ধে যেভাবে যাই : ‘২৫ মার্চ যখন যুদ্ধ শুরু হয় তখন আমি রংপুর কলেজের ছাত্র। সারা দেশে গণহত্যা শুরু করেছে হানাদার ও তাদের দোসররা। এ অবস্থায় আমি পায়ে হেঁটে রৌমারীতে চলে আসি। বাড়িতে আসার পর হাফিজ উদ্দিনসহ এলাকার আমার সমবয়সী যুবকদের ডেকে টাপুরচর হাই স্কুল মাঠে জড়ো করি। আমরা একমত হই, দেশের এ অবস্থায় আমাদের আর ঘরে বসে থাকা চলবে না। সিদ্ধান্ত নিই পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে বাঁশ দিয়ে আমাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করে ছুটিতে আসা সেনাবাহিনীর সদস্য সাহাব উদ্দিন, বসির উদ্দিন ও নজরুল ইসলাম। প্রশিক্ষণ ক্যাম্প খোলা হয় রৌমারী সিজি জামান হাই স্কুলে। এখান থেকে দেড় শর মতো যুবককে প্রশিক্ষণের জন্য ভারতের কোচবিহার পাঠানো হয়। ’

যেভাবে রৌমারী মুক্তাঞ্চল : ‘প্রশিক্ষণ শেষে আমরা যুদ্ধে অংশ নেই। ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন চরাঞ্চল থেকেই আমরা প্রতিরোধ লড়াইয়ের দল গড়েছিলাম। মূলত আমাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে চিলমারী থেকে রৌমারীর উদ্দেশে ছুটে আসা পাকিস্তানি বাহিনী মাঝপথ থেকেই ফেরত যেতে বাধ্য হয়েছিল। একদিন খবর এলো পাকিস্তানি বাহিনী ব্রহ্মপুত্র নদের হাজির চর অঞ্চলে এসে জড়ো হয়েছে। তারা সকালেই রৌমারীর দিকে মার্চ করবে। প্রতিরোধ করতে আমাদের দলের সব মুুক্তিযোদ্ধা এবং আফতাব বাহিনীর সদস্যরা একসঙ্গে মিলিত হই। হামলার কৌশল ঠিক করি। ওই রাতেই ব্রহ্মপুত্র নদের চরে অবস্থান নিয়ে হানাদারদের ওপর তিন দিক থেকে আক্রমণ চালাই। টিকতে না পেরে পাকিস্তানি সৈন্যরা সকালে ওই চর ছেড়ে চিলমারীর দিকে চলে যায়। আমরা যদি ওই রাতে তাদের আক্রমণ না করতাম তাহলে ওরা রৌমারী ঢুকে যেত। ওই রাতে আমরা তাদের একটা গানবোটও গুলি করে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিলাম। ’

জীবনব্রত সমাজসেবা : দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাদের টাপুরচর হাই স্কুলে চাকরি নেন। ছোট পদ। অফিস সহকারী। এই পদেই চাকরিরত অবস্থায় ২০০৩ সালে বন্দবেড় ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে বিপুল ভোটে চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হন। ইউনিয়ন নিয়ে ভাগবণ্টন মামলা চলার কারণে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তাঁকে এই দায়িত্ব পালন করতে হয়। আওয়ামী লীগের একজন পরীক্ষিত নেতা হিসেবেও এলাকায় পরিচিত তিনি। ৩০ বছর ধরে বন্দবেড় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল কাদের। এ ছাড়া তিনি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার। সরকারের দেওয়া যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাচ্ছেন। তিন মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। একমাত্র ছেলে স্নাতক শ্রেণিতে লেখাপড়া করছে।


মন্তব্য