kalerkantho


নাগরিক সম্মেলনে সিপিডির তথ্য

অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে বরিশাল সিলেট রংপুর

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে বরিশাল সিলেট রংপুর

এসডিজি বাস্তবায়ন উপলক্ষে গতকাল বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে নাগরিক সম্মেলন ২০১৭ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

দেশে ভোগের চেয়ে আয় ও সম্পদের বৈষম্য বেড়েছে। বরিশাল, সিলেট ও রংপুর বিভাগ এখনো অর্থনৈতিকভাবে অনেক পিছিয়ে আছে। ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী এখনো অনেক পিছিয়ে। গ্রাম ও শহরের মধ্যে অর্থনৈতিক পার্থক্য যোজন যোজন বেশি।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে বাংলাদেশে এসডিজি বাস্তবায়ন নাগরিক সম্মেলনে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। ‘কাউকে পেছনে রাখা যাবে না’—এ প্রতিপাদ্যে দিনব্যাপী এই সম্মেলনের আয়োজন করে সিপিডি।

আয়বৈষম্যের এ প্রেক্ষাপটে সম্মেলনে বক্তারা বলেছেন, দেশে যেভাবে আয়বৈষম্য ও সম্পদের বৈষম্য বাড়ছে, তা কমাতে না পারলে জাতিসংঘ ঘোষিত ১৫ বছর মেয়াদি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন কঠিন হবে।

বক্তারা বলেন, দেশে উন্নয়ন হচ্ছে ঠিকই; কিন্তু পাল্লা দিয়ে বাড়ছে

আয়বৈষম্য। এসডিজিতে যেহেতু বলা হয়েছে, কাউকে পেছনে রাখা যাবে না; তাই এসডিজি বাস্তবায়নে বাকি যে সময় আছে, তার আগেই আয়বৈষম্য ও সম্পদের বৈষম্য কমাতে হবে।

সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য দেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, রাশেদা কে চৌধুরী, অর্থনীতিবিদ ড. রেহমান সোবহান, অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশে ইউএনডিপির ভারপ্রাপ্ত আবাসিক প্রধান কিয়াকো ইয়োসাকা। সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান।

অধ্যাপক আনিসুজ্জমান বলেন, স্বাস্থ্য খাতের ব্যাপক বিকাশ ঘটলেও প্রান্তিক মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা এখনো সোনার হরিণ। আভিজাত্যের অনেক স্থাপত্য গড়ে উঠলেও দেশে এখনো অনেক মানুষ আকাশের নিচে রাত কাটায়।

অধ্যাপক আনিসুজ্জমান বলেন, মানুষের প্রতি মানুষের নিষ্ঠুরতা, প্রতিহিংসাপরায়ণতা বাড়ছে। নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে। এসব বন্ধ করতে হবে।

আনিসুজ্জামান বলেন, দেশে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। সঙ্গে সুষম বণ্টনও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। প্রান্তিকের একজন মানুষ যাতে তার সব ধরনের অধিকার পায়, সেটি দিতে হবে।

রেহমান সোবহান বলেন, ১৫ বছর মেয়াদি এসডিজি বাস্তবায়ন করতে হলে সরকার ও বেসরকারি উভয়ের কাজের সমন্বয় সাধন করতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের কাজেরও সমন্বয় থাকতে হবে।

নজরদারির ওপর জোর দিয়ে রেহমান সোবহান বলেন, যেকোনো কাজ যাতে সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন হয়, সেটি দেখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দেশে উন্নয়ন হচ্ছে, এটা ঠিক। এটা অস্বীকার করা যাবে না। প্রতিবছর গড়ে ৭ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, এটাও ঠিক। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি কার কাছে যাচ্ছে সেটাও দেখতে হবে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দেশে গত কয়েক বছরে অবিশ্বাস্যভাবে আয়বৈষম্য ও সম্পদের বৈষম্য বেড়েছে। এই বৈষম্য ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধির ধারাকে টেনে ধরতে পারে। এই বৈষম্য একসময় সমাজে অসন্তোষ তৈরি করবে। আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা দুর্বল করে দিতে পারে।

এসডিজি বাস্তবায়নে সরকারের একার উদ্যোগ যথেষ্ট নয় মন্তব্য করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নাগরিকদের সম্পৃক্ত করতে হবে।

সুলতানা কামাল বলেন, এসডিজির মূল লক্ষ্য কাউকে পেছনে রাখা যাবে না। সে ক্ষেত্রে যারা দলিত শ্রেণি, যারা প্রতিবন্ধী, যারা কামার—সবার প্রতি সমান দৃষ্টি দিতে হবে সরকারকে। বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। রক্ত দিয়ে গড়া স্বাধীন এই দেশের সবাই মানুষ—এটা নিশ্চিত করতে হবে।

রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, দেশে এখন দুই কোটি ১৭ লাখ শিশু আছে প্রাথমিক শিক্ষায়। এদের মধ্যে প্রতি পাঁচজনে একজন ঝরে যায়। তাদের প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার সুযোগ করে দিতে হবে। তিনি বলেন, শিক্ষায় ব্যাপক বৈষম্য তৈরি হয়েছে। এই বৈষম্য কমাতে হবে এখনই।

সেলিনা হায়াত আইভী বলেন, এসডিজি বাস্তবায়ন করতে হলে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হবে। কারণ, স্থানীয় সরকারের মাধ্যমেই তৃণমূলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয়।

কিয়াকো ইয়োসাকা বলেন, গত এক দশকে বাংলাদেশে আর্থসামাজিক অবস্থার বেশ উন্নতি হয়েছে। প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপর অর্জিত হচ্ছে। দারিদ্র্য কমেছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এখনো ২৪ শতাংশ—প্রায় চার কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে। তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে হবে।

কিয়াকো ইয়োসাকা বলেন, বাংলাদেশে আরেক বড় সমস্যা অসমতা। এখানে বেশ আয়বৈষম্য দেখা যাচ্ছে। এটি কমাতে হবে। একই সঙ্গে তথ্যের প্রাপ্যতা থাকতে হবে।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকারী তৌফিকুল ইসলাম খান তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, বিপন্ন জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন চাহিদার জবাবে বেশির ভাগ প্রান্তিক মানুষ দারিদ্র্য থেকে উঠে আসা ও শোভন কাজ করার আকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়েছে; এর পরে যথাক্রমে মানসম্মত শিক্ষা এবং অবকাঠামো ও দুর্যোগ মোকাবেলা।

ঢাকা ঘোষণার মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী সম্মেলন শেষ হয়।


মন্তব্য