kalerkantho


বিশ্বব্যাংকের গবেষণা

বায়ুদূষণে দেশে বছরে ক্ষতি ২৫০ কোটি ডলার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বায়ুদূষণে দেশে বছরে ক্ষতি ২৫০ কোটি ডলার

অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো কিছু কারণে শহরের বায়ু ও পানি দূষিত হচ্ছে। কেবল বায়ুদূষণের কারণেই প্রতিবছর দেশ ১ শতাংশ জিডিপি হারাচ্ছে। বাংলাদেশের জিডিপির আকার বর্তমানে প্রায় ২৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ হিসাবে বায়ুদূষণের কারণে ক্ষতির পরিমাণ গড়ে আড়াই বিলিয়ন বা ২৫০ কোটি ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশের পরিবেশের অবস্থা মূল্যায়ন করে তৈরি এক খসড়া প্রতিবেদনের ওপর গতকাল রবিবার বিশ্বব্যাংক আয়োজিত কর্মশালায় এ তথ্য উল্লেখ করা হয়।

রাজধানীর একটি হোটেলে ‘কান্ট্রি এনভায়রনমেন্ট অ্যাসেসমেন্ট ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। মন্ত্রণালয়ের সচিব ইশতিয়াক আহমেদ, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রইসুল আলম মণ্ডল, বিশ্বব্যাংকের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. জাহিদ হোসেন বক্তব্য দেন। বিশ্বব্যাংকের পরিবেশ বিভাগের প্র্যাকটিস ম্যানেজার ক্যাসেনিয়া লভস্কি স্বাগত বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানে পরিবেশমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, ‘পরিবেশদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের জিডিপির ৪ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে দুর্নীতির কারণেও ক্ষতি হচ্ছে জিডিপির ৩ শতাংশ। তাই এটা অবশ্যই উদ্বেগের।’ তিনি বলেন, ‘পরিবেশ নিয়ে আমাদের একটি জাতীয় কমিটি রয়েছে, যে কমিটির প্রধান হলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। এর সমন্বয় করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। এটি পদ্ধতিগতভাবে ঠিক আছে। কিন্তু এ কমিটির বৈঠক শেষে আমি যখন মন্ত্রণালয়ে আসি তখন দেখতে পাই, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ তারা কোনো সিদ্ধান্তের বিষয়ে ভ্রূক্ষেপই করে না।’ মন্ত্রী আরো বলেন, ‘পরিবেশ মন্ত্রণালয় পুকুর খনন করে, কৃষি মন্ত্রণালয় ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ও পুকুর খনন করছে। মন্ত্রণালয়গুলোকে অনেক টাকা দেওয়া হয়েছে পুকুর ও খাল খননে। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে এই টাকা দেওয়ার পরও ৫০ ভাগ পুকুর খনন হয় না, ৭০ ভাগ খালও খনন হয় না।’

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে সৃষ্ট দূষণ পরিস্থিতি বড় এবং ছোট শহরের বাসিন্দাদের ঝুঁকির মুখে ফেলছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, বর্তমানে ঢাকার আশপাশের ছয় লাখ বাসিন্দা, বিশেষ করে শিশুরা তীব্র দূষণের শিকার; যা তাদের দৃষ্টিশক্তি এবং স্নায়ুবিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। আবার ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে শহরগুলো জলাবদ্ধতার সমস্যায় ভুগছে। পানি নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে জলাভূমিগুলোর অকার্যকারিতা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে বেশির ভাগ শহর বন্যার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে পাবনার কথা।

প্রতিবেদনের প্রাথমিক ফলাফলে বলা হয়েছে, দেশে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা শিল্প এবং দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শহরগুলোর বাতাসের পাশাপাশি ভূ-উপরিস্থ এবং ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত করছে। ডায়িং এবং ফিনিশিং ফ্যাক্টরিগুলোর বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। এসব ফ্যাক্টরি পোশাক তৈরিতে ব্যবহৃত প্রতি টন ফেব্রিকের জন্য ২০০ মেট্রিক টন বিষাক্ত পানীয় বর্জ্য উৎপন্ন করে, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। খসড়া প্রতিবেদনে মূলত চারটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেছে : পরিবেশগত অবনতির আর্থিক মূল্য, শহুরে জলাভূমি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি এবং পরিবেশবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা উন্নয়ন। প্রতিবেদনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে বাংলাদেশের নগরায়ণ এবং শিল্পায়ন প্রক্রিয়া পরিবেশগতভাবে টেকসই হওয়া প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবেশনীতি বাস্তবায়ন করতে সরকারকে অবশ্যই এ সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে। এ ছাড়া সবুজ ও পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি গ্রহণের জন্য শিল্প-কারখানাগুলোকে প্রণোদনা দেওয়ার নীতি এবং দূষণকারীর কাছ থেকে জরিমানা আদায়ের নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা উচিত। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শিল্পদূষণ আরো বাড়বে। কৃষির উৎপাদনশীলতা কমে যাবে, অপুষ্টি বাড়বে এবং অনেক এলাকায় পানি সরবরাহ হ্রাস পাবে।

বিশ্বব্যাংকের খসড়া প্রতিবেদনে চারটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো হচ্ছে—পরিরেশ দূষণের ফলে ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ, জলাভূমি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক উন্নতি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। সেই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক এবং নিয়ন্ত্রণ কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে। এর মাধ্যমে সবুজ এবং নির্মল প্রযুক্তির প্রসার করতে হবে।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, পরিবেশ সুরক্ষা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশকে পরিকল্পিতভাবে পরিবেশ সুরক্ষায় কাজ করতে হবে।

 

 



মন্তব্য