kalerkantho


ঢাকায় খ্রিস্টান বৃদ্ধাকে গলা কেটে হত্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ঢাকায় খ্রিস্টান বৃদ্ধাকে গলা কেটে হত্যা

স্মৃতিশক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলা ৮০ বছরের বৃদ্ধ এডওয়ার্ড অনিল গোমেজ অবাক হয়ে সবার দিকে তাকাচ্ছিলেন। স্ত্রী মিলরেট গোমেজ ওরফে মিলা গোমেজ (৭০) খুন হওয়ার বিষয়ে স্বজনরা প্রশ্ন করলে ‘আমি জানি না’ বলে কেঁদে উঠছিলেন। স্বজনরাও তখন তাঁকে ঘিরে কান্নায় ভেঙে পড়ে।

আবার কিছু সময় পর একজন প্রশ্ন করেন, ‘কী হইছে?’, ‘বাসায় কারা এসেছে?’, ‘দরজা কে খুলেছে?’ কিন্তু কোনো উত্তর নেই অনিল গোমেজের। এই নীরবতা বাড়িয়ে দেয় কান্নার রোল।

গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর তেজগাঁও থানাধীন মহাখালীর আরজতপাড়ায় অনিলের বাড়িতে গিয়ে এমন মর্মস্পর্শী পরিবেশ দেখা যায়।

স্বজন ও প্রতিবেশীরা জানায়, অনিল ও মিলা দম্পতির চার ছেলেই বিদেশে থাকে। তাঁরা দুজনই কেবল আরজতপাড়ার নিজ বাড়িতে থাকতেন। অনিলের সামনেই বাসায় ঢুকে দুর্বৃত্তরা তাঁর স্ত্রীকে গলা ও পেট কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে বলে স্বজন ও প্রতিবেশীদের ধারণা।

প্রতিবেশীরা জানায়, রহস্যজনকভাবে ঘরের দরজাটি ভেতর থেকেই বন্ধ ছিল। সকালে অনেকক্ষণ ধাক্কাধাক্কির পর অসুস্থ অনিলই ঘরের দরজা খুলে দেন। তখন তাঁর মুখ-গলা মাফলার ও কাপড়ে বাঁধা ছিল। দরজা খুলে অনিল যখন কোনোমতে সোফায় বসেন, তখন পাশেই দেখা যায় মেঝেতে তাঁর স্ত্রীর গলাকাটা লাশ পড়ে রয়েছে। এরপর পুলিশ এসে অনিলের কাছ থেকে তথ্য জানার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। শেষে স্বজনরাও তাঁর স্মৃতিশক্তি জাগানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে।

পুলিশ, স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভাষ্য মতে, সকাল ৭টা থেকে পৌনে ৮টার মধ্যে বাসায় ঢুকে গলা কেটে ও পেট কেটে দুর্বৃত্তরা মিলাকে হত্যা করে। এই সময়ের মধ্যে গৃহকর্মী ও প্রতিবেশীরা দরজার কড়া নেড়েও বৃদ্ধ দম্পতির কোনো সাড়া পায়নি। তখন বাসার দরজায় যুবকদের পায়ের দুই জোড়া জুতা পড়ে থাকতে দেখা যায়। কেউ বাসা থেকে খুনিদের পালিয়ে যেতে দেখেনি। তবে খোলা বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে বলে প্রতিবেশীরা জানায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছে, প্রবীণ এই দম্পতির তিন ছেলে কানাডা ও এক ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। এই দম্পতিও সম্পত্তি বিক্রি করে স্থায়ীভাবে ছেলেদের কাছে চলে যাওয়ার চিন্তা করছিলেন।

সাত কাঠা জমির ওপর তিন তলা বাড়িটি দখল করতেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় বাড়িটির ভেতরে খোলা জায়গায় ঢুকে মাদক সেবন করত স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। মাদকের আড্ডা বা বাসায় লুটের সময় বাধা দেওয়ার কারণে তাদের হাতেও খুন হতে পারেন মিলা। তাঁর শোবার ঘরের মালপত্র তছনছ দেখা গেছে। পাসপোর্টসহ কিছু কাগজপত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে স্বজনরা। হত্যাকাণ্ডটি ধর্মীয় মতাদর্শবিরোধী উগ্রপন্থীদের কাজ কি না তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে একটি ছুরি উদ্ধার করেছে পুলিশ, যেটি খুনিরা এনেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সারা দিন তথ্য ও আলামত সংগ্রহ করার পর বিকেলে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার সাত্যকি কবিরাজ ঝুলন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিহতের স্বামী আসলে কিছু বলতে পারেন না। কেন, কারা খুন করেছে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে মাদকসেবী সন্ত্রাসী গ্রুপ, সম্পত্তি দখলের চেষ্টা, ডাকাতিসহ সব বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েই তদন্ত করা হচ্ছে।’

আড়জতপাড়ার ৩৮/এইচ নম্বরের ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটির তৃতীয় তলায় বাম পাশের ফ্ল্যাটে থাকতেন অনিল ও মিলা। নিচতলা থেকে তৃতীয় তলার বাকি পাঁচটি ফ্লাটে থাকে ভাড়াটিয়ারা।

অনিল ও মিলার পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া অ্যাডভোকেট সুভাষ সরকার বলেন, তিনি সকালে এক দফায় গৃহকর্মীর ডাকাডাকি শুনতে পান। এরপর আবার তিনতলার ভাড়াটিয়াসহ কয়েকজন এসে ডাকাডাকি করলেও দরজা খোলা হচ্ছিল না। তখন তিনিও যান। একপর্যায়ে ৮টার দিকে বৃদ্ধ অনিল ঘরের দরজা খোলেন।

সুভাষ আরো বলেন, ডাকাডাকির সময়ই দরজার সামনে জুতা দেখতে পান তাঁরা। তবে বাসার মধ্যে কারো আগমন বা কোনো চিৎকার শুনতে পাননি বলে দাবি করেন সুভাষ।

গৃহকর্মী খুরশি বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, সকাল সাড়ে ৭টার পর তিনি আসেন। প্রথমে দরজা ধাক্কাধাক্কি করে সাড়া না পেয়ে নিচে চলে যান। এর ১০-১৫ মিনিট পর আবার এসেও সাড়া পাননি। তখন পানি ছাড়ার জন্য অন্য ভাড়াটিয়াও আসে। দুই বেলায় বাসায় এসে কাজ করলেও কখনো কোনো সমস্যা দেখেননি বলে দাবি করেন খুরশি।

নিহত মিলার বোন শেলি প্যারেরা বলেন, ‘আমি গাজীপুরের কালীগঞ্জে থাকি। সকাল ৬টা ৫৫ মিনিটে বোন (মিলি) আমাকে ফোন করেছিল। আমি গির্জায় ছিলাম। তখন আমার নাতিনের সঙ্গে কথা বলেছিল।’

মিলার বোনের মেয়ে সিলভিয়া প্যারেরা ও ভাইয়ের মেয়ে জেসিকা গোমেজ জানান, অনিল গোমেজ আমেরিকান দূতাবাসে ব্যবস্থাপকের চাকরি করতেন। ২০ বছর আগে তিনি অবসরে গেছেন। তাঁদের গ্রামের বাড়ি গাজীপুরের কালীগঞ্জের পাউডানে। মিলা ছিলেন গৃহিণী। প্রায় ৪০ বছর আগে তাঁরা আড়জতপাড়ায় সাত কাঠা জমি কেনেন। অন্তত ৩০ বছর আগে তিনতলা বাড়িটি নির্মাণ করেন। মিলারা সাত বোন, পাঁচ ভাই। মিলা ছিলেন দ্বিতীয়। আড়জতপাড়ায় খ্রিস্টান সোসাইটি থাকলেও সেখানে তাঁদের ঘনিষ্ঠ কোনো আত্মীয় নেই।

এই দম্পতির চার ছেলের মধ্যে বড় তিনজন কানাডায় থাকেন। ছোট ছেলে মজেশ গোমেজ থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। প্রবীণ দম্পতি বছরের বেশির ভাগ সময়ই ছেলেদের কাছে থাকেন। তাঁরা দুজনই কানাডার গ্রিনকার্ড পেয়েছেন।

স্বজনরা জানায়, গত সেপ্টেম্বর মাসে মিলা ও অনিল কানাডা থেকে দেশে আসেন। আগামী মার্চে আবার যাওয়ার কথা ছিল। এ দফায় তাঁরা স্থায়ীভাবে চলে যাওয়ারও চিন্তা করছিলেন। এ জন্য বাড়িসহ জমিটি বিক্রির কথা বলেছিলেন মিলা।

গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নিহতের লাশ বাসা থেকে উদ্ধার করে মর্গে পাঠায় পুলিশ। পরে বিকেলে বৃদ্ধ অনিল গোমেজ ও গৃহকর্মী খুরশিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে তেজগাঁও থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম বলেন, তাঁদের নিরাপত্তা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ঘটনার ব্যাপারে জানারও চেষ্টা করা হচ্ছে।

মিলার বোন নিলু প্যারেরা, ভাইয়ের ছেলে বাঁধন ও অনিলের বোনের মেয়ে জেসিকা গোমেজ জানান, অনিল ১০ বছর আগে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে শয্যাশায়ীও ছিলেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি স্মৃতিশক্তি হারিয়েছেন। সাহায্য ছাড়া চলাফেরাও করতে পারতেন না। মিলাই সংসার সামলানো এবং স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।

হত্যার কারণ অজানা : অনিলের এক আত্মীয় কালের কণ্ঠকে বলেন, বাসা থেকে কিছু খোয়া গেছে কি না বুঝতে পারছি না। দলিল থাকতে পারে। ছেলেরা এলে বোঝা যাবে। তবে তাঁরা জমিটি বিক্রি করে বা ডেভেলপারদের দিতে চাচ্ছিলেন। একেবারে বাইরে চলে যাওয়ারও চিন্তা করছিলেন। এটা কেউ দখল করার জন্যও করতে পারে।

আরেকটি সূত্র জানায়, বাড়ি থেকে প্রতি মাসে অন্তত এক লাখ ২০ হাজার টাকা ভাড়া ওঠে। অনেক ভাড়াটিয়া অগ্রিম ও বকেয়ায় ভাড়া দেয়। এসব টাকার লেনদেন বা লুটের কারণেও খুন হতে পারে।

বাড়ির দুই ভাড়াটিয়া বলেন, বাড়ির গেটে কোনো নিরাপত্তাকর্মী নেই। প্রতিদিন সন্ধ্যায় স্থানীয় বখাটেরা গেটের ভেতরে ঢুকে আড্ডা দেয়। তারা খোলা জায়গায়, এমনকি বাড়ির সিঁড়িতে ঢুকে ইয়াবা, গাঁজা ও ফেনসিডিল সেবন করে। ভয়ে অনিল ও মিলা দম্পতি তাদের কিছু বলতেন না। তবে ভাড়াটিয়াদের আপত্তির মুখে তাদের অনুরোধ করতেন।

ওই সূত্র জানায়, তিন মাস আগে ওই বাড়ির নিচে মাদক আড্ডা থেকে পাঁচ-ছয়জনকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। আগেও অভিযান চালিয়েছিল পুলিশ। এসব ঘটনার প্রতিশোধ নিতেও খুন হতে পারে বলে সন্দেহ করে সূত্রটি।

তা ছাড়া প্রতিবেশীরা জানায়, গত বছরের ১০ ডিসেম্বর রাতে অনিল গোমেজের ভবনের সামনের ভবনটির (২৬, আড়জতপাড়া) দ্বিতীয় তলায় ঢুকে একটি খ্রিস্টান পরিবারের ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এতে সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের প্রশাসনিক বিভাগের কর্মকর্তা বিপাশা ডি’ক্রুজ, তাঁর ভাই রাজেশ আলেকজান্ডার ডি’ক্রুজ ও রঞ্জন ওরফে লরেন্স আলেকজান্ডার ডি’ক্রুজ আহত হন। সেই ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি। উল্টো নিরাপত্তাহীনতায় বাসা বদল করেছে পরিবারটি।

বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিউবার্ট গোমেজ ও সাধারণ সম্পাদক হেমন্ড আই কোড়াইয়া বলেন, দুই বছর আগের ওই হামলার তদন্তে কোনো কিছু বের হয়নি। পুলিশ বলেছে ডাকাতির চেষ্টা। শেষে আসামি ধরা পড়েনি। ভুক্তভোগীরা রাজারবাগে চলে গেছে। এর আগে রবিন রোজারিও নামে একজনের বাসায়ও হামলা হয়।

খ্রিস্টান নেতারা বলেন, এটি সাধারণ কোনো হত্যাকাণ্ড নয়। বড়দিনের আগে উগ্রপন্থী চক্র এই ঘটনা ঘটিয়েছে কি না তাও খতিয়ে দেখার দাবি জানান তাঁরা। 

রহস্যঘেরা আলামত : বাসার দরজার সামনে জুতা পড়ে থাকলেও যাদের জুতা সেই দুজন কিভাবে বেরিয়ে গেল তা পরিষ্কার নয়। গৃহকর্মী খুরশি প্রথম দফায় এসে চলে যাওয়ার পরই খুনিরা বের হয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিহতের লাশের পাশে চায়ের টেবিল থেকে হলুদ রঙের হাতলের একটি ছুরি উদ্ধার করেছে পুলিশ। গৃহকর্মী খুরশি জানিয়েছে, ওই ছুরিটি তিনি এর আগে বাসায় দেখেননি।


মন্তব্য