kalerkantho


সুন্দরে ঢাকা নীল কষ্ট

আরিফুর রহমান, সেন্ট মার্টিনস থেকে ফিরে   

৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সুন্দরে ঢাকা নীল কষ্ট

‘একটা ছেলের জন্য অপেক্ষা করতে করতে পাঁচটি মেয়ে হয়েছে’—বলছিলেন মোহাম্মদ আলমগীর। লেখাপড়া বেশি করেননি। পেশায় জেলে। সংসার ছোট রাখার কোনো পরিকল্পনা তাঁর নিজের যেমন ছিল না, তাঁর দোরগোড়ায় পৌঁছায়নি সরকারি স্বাস্থ্যসেবাও। দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনসের চারপাশের রূপ যখন মুগ্ধ করছে প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটককে, দ্বীপের ১০ হাজার বাসিন্দা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থ—সব বিচারে রয়েছে মানবেতর দশায়। পাঁচ বর্গকিলোমিটারের দ্বীপটি যেন সুন্দরে ঢাকা নীল কষ্টের আধার। সম্প্রতি কালের কণ্ঠ’র এই প্রতিবেদক সেখানে একাধিক দিন অবস্থান করে এমনই তথ্য-উপাত্ত পেয়েছেন।

দ্বীপের বাসিন্দা নজির আহমেদ; বয়স ষাটোর্ধ্ব। সাত সন্তানের জনক। আরেক দ্বীপবাসী আমিনুল হক ভ্যানচালক। তাঁরও সাত সন্তান। আড়াই শ বছর আগে জেগে ওঠা পাঁচ বর্গকিলোমিটার এলাকার সেন্ট মার্টিনস ইউনিয়ন ঘুরে প্রায় প্রতিটি পরিবারেই এমন চিত্র দেখা গেল। যেন পরিবার মানেই সাত থেকে দশ সন্তান থাকতে হবে!

মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন সেন্ট মার্টিনস দ্বীপ প্রশাসনিকভাবে একটি ইউনিয়ন। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার আওতায় পড়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নূর আহমেদের দেওয়া তথ্য মতে, স্বাধীনতার পর দ্বীপে পরিবার ছিল ১১২টি। এখন সংখ্যাটি এক হাজার ৩৫০। স্বাধীনতার পর দ্বীপে বাসিন্দা ছিল এক হাজারের মতো। বেড়ে এখন হয়েছে দশ হাজার। স্বাধীনতাকালে দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি, এখন ১৬ কোটির কিছু বেশি, তাহলে এই দ্বীপে জনসংখ্যা দশ গুণ হলো কেন? সরকারের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির সুবিধা দ্বীপের মানুষ পেয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নে ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘এখানকার মানুষের মধ্যে শিক্ষার হার খুবই কম। পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে মানুষ অসচেতন। জন্মনিয়ন্ত্রণের দিকে কোনো নজর নেই। এ ছাড়া ধর্মীয় বিষয় এখন প্রকট।’

সরেজমিনে ঘুরে স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র অবকাঠামো হিসেবে দ্বীপে দশ শয্যার একটি হাসপাতাল পাওয়া যায়। তবে নামেই চিকিৎসাকেন্দ্র!  সার্বক্ষণিক একজন সরকারি ডাক্তার থাকার কথা, কিন্তু থাকেন না। নাম হাসপাতাল হলেও নেই কোনো যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম। গর্ভবতী মায়েদের সন্তান প্রসবের জন্য নিয়ে যেতে হয় অনেক দূর বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে, নাফ নদ পেরিয়ে টেকনাফ উপজেলায়।

দেশের সর্বদক্ষিণের এই ইউনিয়নে ওষুধের দোকান আছে ছয়টি। একটি ওষুধের দোকানের মালিক সৈয়দ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে তেমন জানাশোনা নেই। ইউনিয়নের বেশির ভাগ মানুষই অশিক্ষিত। তাদের পেশা কৃষি ও জেলে। এ কারণে প্রতিটি পরিবারে সন্তানের সংখ্যা বেশি।’ শিক্ষাদীক্ষা কম হলে কারো কারো পুষ্টি নিয়েও ভুল ধারণা থাকে। মুক্তার নামে একজন মত্স্যজীবী যেমন বলছিলেন, ‘আমাদের প্রধান খাবার মাছ। তিন বেলাই আমরা মাছ খাই। এতে করে শরীরে প্রচুর ভিটামিন ঢুকছে। এ কারণে সেন্টমার্টিনস ইউনিয়নে প্রতি পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি।’

চেয়ারম্যান নূর আহমেদ বলেন, ‘আমি অনেকবার ওপরের মহলে অভিযোগ করেছি, আমার ইউনিয়নে ডাক্তার থাকে না। দুর্গম এলাকায় কেউ থাকতে চায় না। টাকা-পয়সা দিয়ে চলে যায়। কেউ এলেও টেকনাফে থাকে। সেন্টমার্টিনসে আসে কালেভদ্রে।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দশ শয্যা হোক, হাসপাতাল তো। দ্বীপের সাধারণ বাসিন্দা আছে। অসংখ্য পর্যটক আসছে প্রতিদিন, তাদের অনেকে রাতেও অবস্থান করছে। এ বিষয়টি বিবেচনা করেও হাসপাতালটি সচল রাখা উচিত। অথচ কোনো সরঞ্জাম বা যন্ত্রপাতি নেই।

সেন্ট মার্টিনস ইউনিয়নে শিক্ষাব্যবস্থাও শোচনীয়। ইউনিয়ন পরিষদের দেওয়া তথ্য মতে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একটি, বেসরকারি স্কুল আছে দুটি। এমপিওভুক্ত স্কুল অ্যান্ড কলেজ আছে মাত্র একটি। প্রয়োজনীয় শিক্ষাদানের মান নেই, আছে দারিদ্র্য। এ কারণে ঝরে পড়ার হারও প্রকট। পরিবারে অভাবের কারণে কেউ বাবার সঙ্গে চলে যায় মাছ ধরতে। আর মেয়েরা প্রবাল, শৈবাল, শামুক, ঝিনুক ধরে পর্যটকদের কাছে বিক্রি করে সংসারে সহযোগিতা করে। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেল, পুরো দ্বীপে নেই কোনো ব্যাংক। এনজিও থাকারও তথ্য পাওয়া যায়নি। ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্র অকার্যকর। এককথায় সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত দ্বীপের মানুষ।

একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জিনজিরা স্কুলে শিক্ষার্থী এখন ৩১৫ জন। সরকারিভাবে শিক্ষকের পদ আছে সাতটি। কিন্তু স্কুলে গিয়ে দেখা গেল দুজন শিক্ষক। জানা গেল, যোগাযোগব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় শিক্ষকরাও সেখানে যেতে চান না। এমপিওভুক্ত বিএন স্কুল অ্যান্ড কলেজেরও একই চিত্র। শিক্ষকের অভাব। ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমার এখানে শিক্ষাব্যবস্থা ভালো না। শিক্ষক সংকট। শিক্ষকরা থাকতেই চান না।’

সমুদ্রবেষ্টিত বলে সেন্ট মার্টিনস যথেষ্ট দুর্গম। উপজেলা প্রশাসন টেকনাফে। জরুরি কাজ পড়লে জাহাজে করে গেলে সময় লাগে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। ট্রলারযাত্রার সময় আরো বেশি—চার ঘণ্টা। স্পিড বোট থাকলেও ভাড়া বেশি হওয়ায় সেটি নিম্নবিত্তদের নাগালের বাইরে। চাল, ডাল, তেলসহ সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আনতে হয় টেকনাফ থেকে। সাগরে নিম্নচাপ কিংবা বৈরঅ আবহাওয়ার কারণে প্রশাসন জাহাজ, ট্রলার বন্ধ করে দিলে বিপাকে পড়ে দ্বীপের বাসিন্দারা। বেড়ে যায় সব ধরনের পণ্যের দাম।

দ্বীপে নেই বিদ্যুতের ব্যবস্থা। হোটেলগুলো জেনারেটর চালায় এবং সেই শব্দে সারা রাত দ্বীপটি কম্পমান থাকে। সীমিতসংখ্যায় সৌর বিদ্যুতের প্যানেল রয়েছে, সচ্ছল পরিবারগুলো এই ব্যবস্থা করেছে। সেন্ট মার্টিনস ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার হাবিবুর রহমান খান জানালেন, ‘দ্বীপে একসময় বিদ্যুৎ ছিল। ১৯৯৯ সালের ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে বিদ্যুতের খুঁটি, জেনারেটরসহ সব উড়িয়ে নিয়ে যায়। এরপর পরিবেশ অধিদপ্তরের আপত্তির কারণে আজ পর্যন্ত সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়নি। অবশ্য এখন সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ চলছে।’

দ্বীপের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বেশির ভাগ মানুষই অসচ্ছল বলে তার সুযোগ নিচ্ছে বাইরের ধনিক শ্রেণি। যেটুকু কৃষিজমি আছে, হোটেল করার জন্য বেশি দামে কিনে নিচ্ছে প্রভাবশালীরা। যে গাছ ও প্রবাল দ্বীপকে বাঁচিয়ে রেখেছে, সেগুলো দিন দিন ধ্বংস হচ্ছে। দ্বীপটি রক্ষায় ২০০৯ সালে ২৪ দফা সুপারিশ করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে না পারলে সেন্টমার্টিনসের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা কঠিন হবে বলে মনে করে পরিবেশ অধিদপ্তর।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই দ্বীপের চারদিকে লবণাক্ত পানি। শুধু দ্বীপের ভেতরে সুপেয় পানি মেলে। কিন্তু স্থানীয় অধিবাসীদের খাবার পানি, কৃষিকাজসহ সব কাজেই ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের ফলে নিঃশেষ হতে চলেছে সুপেয় পানি। খাবার পানি নিশ্চিত করতে বৈদ্যুতিক পাম্প ব্যবহারের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি ওঠানো বন্ধের সুপারিশ ছিল পরিবেশ অধিদপ্তরের। কিন্তু সেটি এখনো কার্যকর হয়নি। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূর আহমেদ বলেন, ‘এরই মধ্যে দ্বীপের অনেক জায়গায় লবণ পানি উঠছে। সুপেয় পানি শেষ হয়ে গেলে দ্বীপে বসবাস কঠিন হয়ে পড়বে।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের সুপারিশ ছিল, দ্বীপের অধিবাসীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ সব সরকারি সেবার মান বাড়াতে হবে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রোহিঙ্গাসহ বহিরাগতদের বের করে দিতে হবে। দ্বীপে ঘুড়ি উৎসব ও বর্ষবরণের মতো আয়োজন বন্ধ করার সুপারিশ রয়েছে। একই সঙ্গে দ্বীপের অধিবাসীদের কর্মসংস্থানের জন্য পরিকল্পিত আবাসনের পাশাপাশি তাদের পরিবেশবান্ধব পর্যটনের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। সৈকত ও দ্বীপের অভ্যন্তর থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ, প্রবাল ও শৈবাল উত্তোলন বন্ধের সুপারিশও মানা হচ্ছে না।

পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কাজী সারওয়ার ইমতিয়াজ হাশমী মনে করেন, এককভাবে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষে সেন্ট মার্টিনস রক্ষা সম্ভব নয়। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘দ্বীপটি রক্ষা করতে হলে সবার সহযোগিতা লাগবে। স্থানীয় মানুষেরও সহযোগিতা লাগবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জনবল বাড়াতে হবে।’


মন্তব্য