kalerkantho

‘আজ নগদ কাল বাকি’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



‘আজ নগদ কাল বাকি’

চারদিক সুনসান। তীব্র শীতের মধ্যেই কেমন যেন গুমট ভাব। আড্ডার মতো করে দাঁড়িয়ে জনাপাঁচেক লোক। কখনো ফিসফিসিয়ে, কখনো বা উচ্চ স্বরেই কথা বলছিলেন তাঁরা। এরই মধ্যে গলা ফাটিয়ে একজন বললেন, ‘আরে না, হবে না। আজ নগদ, কাল বাকি।’ এক কথা দুই কথা শেষে একজনের পকেটে কিছু টাকা ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। যাঁর পকেটে টাকা ঢুকিয়ে দেওয়া হলো তিনি পুলিশ কর্মকর্তা।

আর ওই দৃশ্যটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ থানায় দেখা গেল গত বৃহস্পতিবার। সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত অবস্থান করে এমন একাধিক দৃশ্য চোখে পড়ে। থানায় আসা ভুক্তভোগীদের নানা ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে দেখা যায়। থানা প্রাঙ্গণে ঢোকার পর মূল ভবনের সামনের দিকে লেখা ‘সেবাই পুলিশের লক্ষ্য’। অথচ কথাটার সঙ্গে এসব বিষয় যেন বড়ই বেমানান।

আরেকটি দৃশ্য এমন—চোরাই গরু ও বহন করা নৌকাসহ চোর ধরিয়ে দিয়ে দুপুর থেকে থানায় বসে আছেন ভুক্তভোগীরা। দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে রাতে মামলা নথিভুক্তহলো। যাওয়ার পথে এক পুলিশ কর্মকর্তা ভুক্তভোগীদের বলে দিলেন, ‘কাল আসার সময় পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে আসবেন। অনেক খরচ আছে।’

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে আশুগঞ্জ সদরে থানাটির অবস্থান। চারদিকে সীমানা প্রাচীর ঘেরা থানা প্রাঙ্গণে একটি দোতলা ভবন রয়েছে। এটিই মূল ভবন, যেখানে দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডসহ থাকার ব্যবস্থা করা আছে। পাশের আরেকটি একতলা ভবনে থাকেন থানার ওসি। মূল ভবনটি অনেকটা জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। থানার একপাশে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র আরেক পাশে একটি হাইওয়ে হোটেল। আশপাশে খুব একটা জনবসতি নেই।

থানা সূত্র জানায়, কর্মকর্তাসহ যে ৪৩ জন পুলিশ সদস্য আছেন তাঁদের দিয়ে এখানকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় তেমন বেগ পেতে হয় না। তবে বিশেষ কারণে অনেক সময় বাড়তি পুলিশ আনতে হয়। জরাজীর্ণ ভবন মেরামতে সাত লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় থানায় গিয়ে দেখা যায়, ওসি ও পরিদর্শকের (তদন্ত) কক্ষ বন্ধ। কর্তব্যরত কর্মকর্তাও কক্ষে নেই। তার পাশের কক্ষের প্রথম চেয়ারটিতে বসে একজন পুলিশ কর্মকর্তা ল্যাপটপে গান শুনছেন। ওই কক্ষেই দুজন কম্পিউটারে কাজে ব্যস্ত।

সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে পাঁচজনের একটি জটলার কাছে গিয়ে দেখা যায়, অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) এক কর্মকর্তার মোবাইল ফোন উদ্ধার নিয়ে কথা হচ্ছে। এরই মধ্যে একজন বলে উঠলেন, ‘আরে না, হবে না। আজ নগদ, কাল বাকি। মোবাইলের টাকাই তো সাড়ে ছয় হাজার। এ ছাড়া আমার খরচ আছে না। কোনো বাকি চলবে না।’

কথা বলে জানা গেল, এক সিআইডি কর্মকর্তার চুরি হওয়া মোবাইল ফোনসেট আশুগঞ্জে উদ্ধার হয়। এ ঘটনায় গত বুধবার পুলিশ ছয়জনকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। ওই ছয়জনের মধ্যে ওই মোবাইল ফোনটি হাতবদল হয়। বিভিন্ন রকমের আলোচনা শেষে ওই ছয়জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ছাড়া পেতে টাকাও দিতে হয় প্রত্যেককে। পুলিশ সিদ্ধান্ত দেয় যে, মোবাইল ফোনসেটটি সর্বশেষ যিনি কিনেছেন, তাঁকে দাম বাবদ সাড়ে ছয় হাজার টাকা দিয়ে দেবে প্রথম বিক্রি করা ব্যক্তি। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই টাকা দিতে থানায় আসে কয়েকজন। এ সময়ই পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. হানিফ বাড়তি টাকা দাবি করেন।

গরু চুরির ঘটনাতেও ভুক্তভোগীদের কাছে টাকা চাইতে দেখা যায় পুলিশকে। নবীনগরের বিটঘর গ্রাম থেকে চুরি হওয়া ইসহাক মিয়ার গরু উদ্ধার হয় আশুগঞ্জের লালপুরে। এ সময় চোরাই কাজে ব্যবহৃত একটি নৌকাও উদ্ধার করে স্থানীয় লোকজন। রাতে গরু ও নৌকার মালিককে পাঁচ হাজার টাকা করে নিয়ে আসতে বলেন উপপরিদর্শক মো. আতিক উল্লাহ। টাকা কেন লাগবে— এমন প্রশ্নে প্রতিবেদকের পরিচয় জানতে চান আতিক উল্লাহ। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি বলেন, ‘আমাকে ডিআইজি, এসপি সবাই চিনে। কয় দিন আগে আমি অটোরিকশাচালক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উদ্ঘাটন করেছি। গরু ও নৌকা পাহারা দেওয়া, আসামিকে আদালতে পাঠানোর জন্য টাকা নিয়ে আসতে বলেছি। এটা কোনো সমস্যা নয়। আরো কিছু জানতে চাইলে বলতে পারেন।’

এএসআই মো. মমিনুল এ থানার সবচেয়ে ‘দাপুটে কর্মকর্তা’ বলে জানা যায়। ওসির সঙ্গে তাঁর খুব সখ্য রয়েছে। সন্ধ্যায় তিনি একটি প্রাইভেট কার নিয়ে বেরিয়ে ঘণ্টা দুয়েক পরে ফেরেন। জানা গেছে, গাঁজাসহ এ প্রাইভেট কারটি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জব্দ হিসেবে থানায় আছে। মমিনুর এ গাড়ি নিয়ে প্রায়ই বেরিয়ে পড়েন। অবশ্য ওসি জানিয়েছেন, অফিসিয়াল কোনো কাজে এটি ব্যবহার করা হয় না। ব্যক্তিগত একটি কাজে খুব কাছেই তিনি প্রাইভেট কারটি দিয়ে মমিনুলকে পাঠিয়েছিলেন। 

সন্ধ্যায় থানার গোলঘরে এক নারী তাঁর ভাইকে নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। জানান, উপপরিদর্শক (এসআই) জামাল হোসেনের জন্য অপেক্ষা করছেন তাঁরা। কারণ জানতে চাইলে ওই নারী বলেন, ‘আমার মাইয়া গত নভেম্বর মাসে অপহরণ অইছে। থানাত মামলা দিলে হেরা (অপহরণকারীরা) আইন্না আমার মাইয়ারে পুলিশের কাছে দিয়া গেছে। কিন্তু যারা দিয়া গেছে হেরারে পুলিশ কিছু কইছে না। অহন পুলিশ কোনো আসামি ধরছে না।’

ওই নারীর ভাই আক্ষেপ করে বলেন, ‘বুঝেন না ভাই। পুলিশরে কি টেহা না দিয়া কাম করা যায়।’

থানা থেকে কয়েক শ গজ দূরে আশুগঞ্জ সদর অভিমুখে কয়েকটি ছোট দোকান রয়েছে। এর সামনে শীতের পিঠা বিক্রি হয়। সেখানে বসে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এ থানায় মূলত ধরপাকড় থেকেই পুলিশের ‘বাণিজ্য’ হয় বেশি। এ ছাড়া এলাকাভিত্তিক কিছু জুয়ার আসর থেকেও পুলিশ ‘বাণিজ্য’ করে। মাদক পাচারকারীদের কাছ থেকে পুলিশ বখরা আদায় করে।

রাত সাড়ে ৮টায় ওসি তাঁর কার্যালয় কক্ষে এসে বসেন। প্রথমেই তিনি দোকান বকেয়ার টাকা পরিশোধ করেন, টাকা নিতে আসা ব্যক্তির কাছে। তবে রাত ১১টা পর্যন্ত পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মেজবাহ উদ্দিনের কক্ষটি বন্ধ ছিল। সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে হেলাল নামের এক পুলিশ কর্মকর্তাকে কর্তব্যরত কর্মকর্তার কক্ষে বসতে দেখা যায়। ঘণ্টাখানেক ধরে তিনি এক ভুক্তভোগী নারীর সঙ্গে কথা বলেন। থানায় দায়িত্ব পালনরত ওসিসহ বেশির ভাগ কর্মকর্তাকে নির্ধারিত পোশাক পরতে দেখা যায়নি। এমনকি রাতে মোবাইল ডিউটিতে বের হওয়া পুলিশ কর্মকর্তাও সাদা পোশাকে পিকআপ নিয়ে বের হন।

আশুগঞ্জ থানার ওসি মো. বদরুল আলম তালুকদার এসব বিষয়ে বলেন, ‘আমি আসার পর এখানকার দাঙ্গা কমিয়ে এনেছি। দাঙ্গাবাজির ঘটনায় মামলা হলে কেউ যেন সুবিধা না নিতে পারে সে বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছি। এমনকি প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও লকআপে এনে ঢুকিয়েছি। জনগণকে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। বেশ কিছু মাদকের চালান আটক করা হয়েছে।’


মন্তব্য