kalerkantho


হাসানাত নিশ্চিত, স্বপনকে মাঠ গোছাতে বলেছেন খালেদা

রফিকুল ইসলাম ও আজিম হোসেন, বরিশাল   

৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



হাসানাত নিশ্চিত, স্বপনকে মাঠ গোছাতে বলেছেন খালেদা

বরিশালের গৌরনদী দক্ষিণের ছয় জেলার প্রবেশদ্বার। এর সঙ্গে আগৈলঝাড়া উপজেলা নিয়ে বরিশাল-১ আসন। এ আসনে আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ্। দলটির নেতাকর্মীরা দলীয় অভিভাবক হিসেবে তাঁকে শ্রদ্ধা করে। তিনিই আগামী নির্বাচনে এ আসনে দলের একক প্রার্থী। শুধু এ আসনে নয়, দক্ষিণাঞ্চলজুড়েই রয়েছে তাঁর প্রভাব।

অন্যদিকে স্থানীয় বিএনপিতে রয়েছে ত্রিধাবিভক্তি। সেই বিরোধের কারণে এ আসনে বিএনপির একাধিক নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য এম জহিরউদ্দিন স্বপন, দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবাহান, কার্যনির্বাহী কমিটির আরেক সদস্য অ্যাডভোকেট গাজী কামরুল ইসলাম সজল ও বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান।

এ ছাড়া জাতীয় পার্টির (এরশাদ) ঢাকা দক্ষিণ শাখার সদস্য অ্যাডভোকেট সেকেন্দার আলী ও কেন্দ্রীয় সদস্য এস এম রহমান পারভেজের নাম প্রার্থী হিসেবে শোনা যাচ্ছে।

পরিসংখ্যান বলছে, এ আসনে আওয়ামী লীগের পাল্লাই ভারী। ১০টি সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলটি পাঁচবার জয়লাভ করেছে। অন্যদিকে জাতীয় পার্টি দুইবার এবং বিএনপি তিনবার জয়লাভ করেছে। এর মধ্যে ছিয়ানব্বই সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছিল বিতর্কিত।

উল্লেখ্য, দেশের যে স্বল্পসংখ্যক আসন আওয়ামী পরিবারের সম্মানের আসন হিসেবে বিবেচিত, এর মধ্যে বরিশাল-১ আসনটি অন্যতম। ১৯৭০-এর নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগের নিশ্চিত প্রার্থী হয়ে আসছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের পরিবারের সদস্যরা। শুরুটা করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত। ১৯৭৩-এর নির্বাচনে সংসদ সদস্য হয়ে তিনি বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রী হন। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অন্য যাঁরা নিহত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম আব্দুর রব সেরনিয়াবাত। তাঁর মৃত্যুর পর বরিশালের রাজনীতিতে আবির্ভূত হন তাঁর বড় ছেলে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ্। তিনি ১৯৯১ সালে প্রথম বরিশাল-১ আসন থেকেই নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি এ আসনের সংসদ সদস্য এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পাশাপাশি হাসানাত স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি।

আওয়ামী লীগ : এ আসনে একানব্বই ও ছিয়ানব্বইয়ের নির্বাচনে পর পর দুইবার আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ্ সংসদ সদস্য হন। ওই দুইবারই তাঁর কাছে হারেন বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী কাজী গোলাম মাহবুব। নির্বাচিত হয়ে হাসানাত দুই উপজেলাতেই ব্যাপক উন্নয়নকাজ করেন। এর পরও ২০০১-এর নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী এম জহিরউদ্দিন স্বপনের কাছে সামান্য ভোটের ব্যবধানে হাসানাত হেরে যান। যদিও আওয়ামী লীগ দাবি করে, ওই নির্বাচনে নীলনকশা, ষড়যন্ত্র ও প্রশাসনিক কারচুপি হয়েছে।

তবে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ষড়যন্ত্রমূলক মামলার কারণে হাসানাত দেশের বাইরে অবস্থান করেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী হন। তিনি বিএনপি প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবাহানকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই সময় আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর হাসানাত মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়ে বরিশালে ফিরে আসেন। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন হাসানাত। শুধু তাঁর আসনেই নয়, জেলা থেকে বিভাগের বেশির ভাগ সংসদীয় আসনে তাঁর একক প্রভাব রয়েছে। বিগত স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে তিনি প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকায় ছিলেন। তাঁর দক্ষ নেতৃত্বের কারণেই দক্ষিণাঞ্চলে উপজেলা, পৌর ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল জয় পায়।

সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ্ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ আসন নৌকার। বিপুল ভোটে নৌকা বিজয়ী হবে। কারণ আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় আসে এলাকার রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, স্কুল-কলেজের ব্যাপক উন্নয়ন করে। উন্নয়নের পাশাপাশি বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, বিধবা এবং প্রতিবন্ধীদের ভাতা প্রদানসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কারণে মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারছে।’

হাসানাত বলেন, ‘বিএনপি জনগণের কল্যাণের কথা না ভেবে, দলীয় কর্মসূচি পালনের নামে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। এ কারণে জনগণ তাদের ওপর খুবই ক্ষুব্ধ। এই সন্ত্রাসী দলকে জনগণ আর ভোট দেবে না।’

বিএনপি : স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতে, নেতৃত্বের দুর্বলতার কারণে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের দুটি নির্বাচনেই কাজী গোলাম মাহবুবের মতো ব্যক্তিকে দলের প্রার্থী করার পরও বিএনপি বিজয়ী হতে পারেনি। বামপন্থী সাবেক ছাত্রনেতা জহিরউদ্দিন স্বপন বিএনপিতে যোগদান করে ১৯৯৬ সালে বিতর্কিত নির্বাচনে জয়লাভ করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে তাঁর কাছে হেরে যান আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ্। অথচ তাঁর নেতৃত্বের দুর্বলতার কারণেই স্থানীয় বিএনপিতে চলছে বিভক্তির রাজনীতি। গৌরনদী-আগৈলঝাড়া উপজেলা বিএনপি এখন বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ২০০৯ সালের শেষের দিকে বিএনপির বিভক্তির সূচনা হয়েছিল। পরাজিত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবাহানকে আহ্বায়ক করে ৪৬ সদস্যের গৌরনদী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠন নিয়ে এই বিভক্তির সূত্রপাত।

নেতাকর্মীরা প্রশ্ন তুলেছিল আগৈলঝাড়ার বাশাইল গ্রামের বাসিন্দা ইঞ্জিনিয়ার সোবাহানের গৌরনদী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক হওয়া নিয়ে। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ছাত্রদলের গৌরনদী পৌর শাখার আহ্বায়ক কমিটি ও আগৈলঝাড়া উপজেলা শাখার আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিরোধ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে। এ তিন আহ্বায়ক কমিটিতে বিএনপিতে সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত নেতাদের সমর্থকদের রাখা হয়নি।

এ অবস্থায় বঞ্চিতরা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তিন কমিটি প্রত্যাখ্যান এবং পাল্টা কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয়। গৌরনদী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবাহান ও দলের পৌর শাখার আহ্বায়ক মো. মনিরুজ্জামানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। পরে ওই কমিটি বাতিলের দাবিতে বঞ্চিতরা আন্দোলনে নামে। এ আন্দোলনের মধ্যেই আহ্বায়ক কমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। পাশাপাশি আবদুস সোবাহান পৌর ও ইউনিয়ন শাখার আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটি নিয়েও বিরোধ তৈরি হয়।

সেই বিরোধের মধ্যেই আবুল হোসেন মিয়াকে আহ্বায়ক করে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে গৌরনদী উপজেলা বিএনপির কমিটি করা হয়। ওই কমিটি গঠনের কিছুদিন পর মনিরুজ্জামান মনিরকে সভাপতি ও শাহ আলম ফকিরকে সাধারণ সম্পাদক করে পৌর বিএনপির কমিটি ঘোষণা করা হয়। ইঞ্জিনিয়ার সোবাহান ও স্বপনের সমর্থকরা এ দুই কমিটিকে অবশ্য মানে না। এখনো সোবাহানের কমিটিই বহাল রয়েছে বলে দাবি তাদের।

জহিরউদ্দিন স্বপন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সংস্কারপন্থী বলে একটি পক্ষ দল থেকে আমাকে দূরে সরিয়ে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু বিএনপির নীতিনির্ধারকরা তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশার প্রতি আস্থা রেখে আমাকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। এ ধারাবাহিকতায় গত ২২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া আমাকে তাঁর কার্যালয়ে ডেকে পাঠিয়ে ছিলেন। একই সঙ্গে নেত্রী আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ ও নির্দেশ দেন। সেই আলোকে গত কোরবানির ঈদে গৌরনদীর গ্রামের বাড়ি শরিকলে ছিলাম।’

বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বরিশাল উত্তর জেলা শাখার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবাহান বলেন, ‘বিএনপির দুঃসময় ২০০৮ সালে দলের মনোনয়ন পেয়ে আমি নির্বাচনে অংশ নিয়ে নামমাত্র কিছু ভোটে হেরেছিলাম। তবু রাজনীতির মাঠ ছাড়িনি। আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়ে মামলা-হামলার শিকার হয়েছি। এমনকি ঢাকায় পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করেছিল। পৌর নির্বাচনে এলাকায় দলীয় প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় গিয়েছিলাম। তখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বাধা দিয়েছিলেন। দলের ত্যাগী কর্মী হিসেবে আশা করছি, আগামী নির্বাচনে আমাকেই দল মনোনয়ন দেবে।’

দলীয় মনোনয়ন চাচ্ছেন বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য গাজী কামরুল ইসলাম সজল। তিনি অনেক আগে থেকেই এলাকায় অবস্থান করছেন। দলীয় নেতাকর্মী ও স্থানীয় লোকজনের মধ্যে নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রচারণা চালাচ্ছেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আন্দোলনে কারা মাঠে ছিল, তা কেন্দ্রীয় কমিটি অবগত। সর্বদা তৃণমূলে অবস্থান নিয়ে নেতাকর্মীদের সঙ্গে দলীয় সব কর্মসূচি পালন করেছি। মামলা-হামলার শিকার স্থানীয় তৃণমূল নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছি সব সময়। তাই তাদের সমর্থন রয়েছে। তা ছাড়া বিএনপি চাচ্ছে আগামী নির্বাচনে নতুনদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে। এমন বিবেচনায় এই আসনে আমি দলীয় মনোনয়ন পেতে আশাবাদী।’

আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, ‘আশির দশকে ছাত্রদলের মাধ্যমে রাজনীতিতে হাতেখড়ি। সেই থেকে ধারাবাহিকভাবে যুবদল এবং বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছি। নাশকতা মামলার আসামি হওয়ায় গ্রেপ্তার এড়াতে এলাকায় আসতে পারছি না।’

মনোনয়ন প্রসঙ্গে বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকাসহ সার্বিক দিক বিবেচনা করে নীতিনির্ধারকরা সিদ্ধান্ত নেবেন। স্বপন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘২০০১ সালে জনগণকে মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে ভোটে জিতেছিলেন তিনি। কিন্তু নির্বাচিত হয়েই জনগণের কথা না ভেবে নিজের উন্নয়ন করেছেন। বঞ্চিত জনগণের ভয়ে সেই থেকে আর এলাকায় আসেন না।’

তবে এলাকায় অনুপস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্বপন বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যাঁকে দলের অভিভাবক ভাবেন, তাঁকেই ভোটে হারিয়েছি। সেই পরাজয়ের শোধ নিতেই আমাকে সরকারদলীয় ক্যাডাররা এলাকায় যেতে বাধা দিচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে শুধু শারীরিক উপস্থিতির বাইরেও নানাভাবে এলাকার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকা যায়। তাই সেই অর্থে এলাকায় অনুপস্থিতির বিষয়টিও পুরোপুরি সঠিক নয়।’


মন্তব্য