kalerkantho


ময়মনসিংহের গৌরীপুর

‘আমারে আওনের লাইগ্যা কইলো, অহন ফোনডাও ধরে না’

আলম ফরাজী, ময়মনসিংহ (আঞ্চলিক)   

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



‘আমারে আওনের লাইগ্যা কইলো, অহন ফোনডাও ধরে না’

পৌষের কনকনে শীতে জবুথবু বয়স্ক এক নারী। কানে মোবাইল ফোন। বছর ছয়েকের শিশুর হাত ধরে থানায় প্রবেশ করছেন। ঘন কুয়াশার ভেতর উঁকি দিয়ে এদিক-সেদিক কাকে যেন খুঁজছেন। থানা ভবনের জানালা দিয়ে ভেতরে বসে থাকা এক নারী কনস্টেবলকে কী যেন বললেন। ভেতর থেকে আওয়াজ ভেসে আসে, ‘এখন যান, পরে আইসেন।’ কনস্টেবলের এ কথার জবাব না দিয়ে ওই নারী আবারও মোবাইল ফোন টিপতে থাকেন প্রত্যাশিত করো সঙ্গে কথা বলার জন্য। মুখভঙ্গিতে বোঝা গেল, চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছেন তিনি। হতাশ হয়ে স্বগতোক্তি করতে থাকেন, ‘আমারে আওনের লাইগ্যা কইলো। অহন ফোন করতাছি, ফোনডাও ধরে না। আল্লা গো, আমি কি বিচার পাইতাম না।’

ওই নারীর পিছু নিয়ে সমস্যার কথা জানতে চাইলে খেঁকিয়ে বলে ওঠেন, ‘কী আর অইবো! আফনারারে তো টেহা-পইসা না দিলে মামলা নেইন না। আমার ছেড়াডারে কোবাইয়া মাথা ও নাক ফালা ফালা কইরালাইছে। হে অহন হাসপাতালে। যারা মারছে, তারা আবার মারনের হুমকি দিতাছে। গত মঙ্গলবার থানায় দরহাস্থ দিছি। সাইদুর দারোগা আমার কাছে ১৫ হাজার টেহা চাইলো। অত টেহা কিবায় দিয়াম? টেহা দিতাম পারছি না দেইখ্যা মামলা নিছে না। বিশ্বাস না অয়, হাসপাতালে গিয়া আমার ছেড়ারে দেইখ্যা আইওহাইন।’

গত শুক্রবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে ময়মনসিংহের গৌরীপুর থানায় দেখা গেল এই দৃশ্য। আর পরিস্থিতির শিকার ওই নারী হলেন গৌরীপুর পৌরসভার কালীপুর মধ্যমতরফ মহল্লার বাসিন্দা মোছা. হাসিনা বেগম (৫৫)। ছেলের ঘরের নাতি নুরকে সঙ্গে নিয়ে গত বুধবার থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় থানায় ধরনা দিচ্ছেন মামলা রেকর্ড করার জন্য। চার দিনেও তাঁর মামলাটি রেকর্ড করেননি দারোগা মো. সাইদুর রহমান। থানায় দারোগাকে না পেয়ে ক্ষোভে-কষ্টে রাত সোয়া ৮টার দিকে চলে যান তিনি। হাসিনা বেগম যখন দারোগার খোঁজ করছিলেন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পরিদর্শকসহ অনেককে ব্যাডমিন্টন খেলায় ব্যস্ত দেখা গেছে। 

রাত সাড়ে ৮টা। থানায় প্রবেশ করছেন মোছা. খোদেজা বেগম (৪০) নামের এক নারী। থানার প্রহরীকে তিনি একটি মোবাইল ফোন নম্বর দেখিয়ে জানতে চাইলেন এটা কোন দারোগার নম্বর। প্রহরী নম্বরটি দেখে জানান, দারোগা আবদুল আওয়ালের নম্বর। ওই দারোগাও তখন থানায় ছিলেন না। কাছে গিয়ে জানতে চাইলে খোদেজা জানান, অন্যায়ভাবে তাঁকে মারধর করেছে এক প্রতিবেশী। এ ঘটনায় মামলা নিলেও পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়নি। মামলার জন্য আবদুল আওয়াল দারোগা তাঁর কাছ থেকে দুই হাজার ২০০ টাকা নিয়েছেন। ঘটনাস্থলে যাওয়ার জন্য আরো টাকা দিতে হবে। সে জন্যই তিনি থানায় এসেছেন দারোগার খোঁজে।

খোদেজা বেগমের সঙ্গে কথা বলে সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথে থানার ফটকের সামনে দেখা গেল অপেক্ষারত এক ব্যক্তিকে। তিনি মোবাইল ফোনে স্যার সম্বোধন করে অন্য প্রান্তের ব্যক্তিকে বলছেন, ‘আমি তো গেটের সামনে। আপনি এখানে আসেন।’ কিছুক্ষণ পর মোটরসাইকেলে ওই ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে আসেন থানার এসআই আবদুল আওয়াল। জানা যায়, মোবাইল ফোনে কথা বলা ব্যক্তিটি গ্রাম পুলিশের সদস্য। নাম আবুল কালাম আজাদ। এসআই ও গ্রাম পুলিশ অন্ধকারে গিয়ে কথা বলেন। আবদুুল আওয়ালের কণ্ঠ ভেসে আসে, ‘এইডা অপহরণ মামলা, উল্ডা-ফাল্ডা কিছু করলে চাকরি থাকতো না। নেতাদের কাছে যাইও না। পার্টিরে সরাসরি আমার কাছে লইয়া আসো।’

হাসিনা বেগমের আহত ছেলের খোঁজ নিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, মাথা ও নাকে ব্যান্ডেজ নিয়ে শুয়ে আছেন আল-আমীন (২৮)। পেশায় তিনি ভ্যানচালক। ঘটনার পর আয়-রোজগার বন্ধ। গত মঙ্গলবার সকালে দুই মাদকসেবী সন্ত্রাসী সাদ্দাম ও সাখাওয়াৎ মাদক কিনতে তাঁর কাছে ২০০ টাকা দাবি করে। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তারা দা দিয়ে কোপায় আল-আমীনকে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বললেও অর্থাভাবে তা আর সম্ভব হয়নি। পাশে বসে থাকা তাঁর স্ত্রী রোজিনা জানান, বিচারের আশায় তাঁর শাশুড়ি থানায় অভিযোগ জমা দিয়েছেন। কিন্তু পুলিশ ১৫ হাজার টাকা দাবি করছে। মামলা না হওয়ায় উল্টো ওই দুই মাদকসেবী এখন তাঁদের পুরো পরিবারকে হুমকি দিচ্ছে। এএসআই সাইদুর রহমান টাকা চাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে জানান, স্থানীয় কাউন্সিলর বিষয়টি মীমাংসার দায়িত্ব নেওয়ায় মামলা রেকর্ড করা হয়নি। 

রাত সোয়া ১০টা। তিন আরোহী নিয়ে একটি মোটরসাইকেল দ্রুতগতিতে থানায় প্রবেশ করে। এক তরুণকে প্রহরীর জিম্মায় রেখে অন্য দুই আরোহী মোটরসাইকেল নিয়ে থানা থেকে বেরিয়ে যায়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই তরুণটি শহরের মধ্যবাজার এলাকার সুমন (২২)। তাঁকে ধরে এনেছেন এএসআই আশেক রাব্বানী। প্রহরীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হয়তো নেশাটেশা করেছে।’

রাত পৌনে ১১টায় থানা থেকে বেরিয়ে বাসায় চলে যান ওসি দেলোয়ার আহাম্মদ। তিনি চলে যাওয়ার পরপরই অন্যরাও থানা থেকে চলে যেতে শুরু করেন। একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা করে বেরিয়ে যায় পরিদর্শক তারেকুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি দল। ব্যাটারিচালিত ইজি বাইকে করে থানা ছাড়ে পুলিশের আরেকটি দল। থানায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একটি দল গেছে ওরস মাহফিলে। অন্যটি বেরিয়েছে নিয়মিত টহলে। ওই সময় থানার মধ্যে ওয়্যারলেস অপারেটর ছাড়া আর কেউ ছিলেন না।

থানার পাশে ৩২ বছর ধরে পান-সিগারেটের ব্যবসা করছেন সুমন্ত্র পাল (৫০)। তিনি জানান, থানায় ভিড়বাট্টার কারণে রাত ২টা-৩টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখেন। বর্তমানে তীব্র শীতে লোকজনের আনাগোনা কম।

রাত ১১টা। সাদা লুঙ্গি ও সোয়েটার পরা দুই ব্যক্তি থানায় প্রবেশ করেন। প্রহরী কনস্টেবল জাহাঙ্গীর তাঁদের পরিচয় ও গন্তব্য জানতে চান। অবয়বের বর্ণনা দিয়ে একজন জানতে চান পুলিশ কাউকে ধরে এনেছে কি না। হাজতের দরজার কাছে নিয়ে গেলে তিনি নিশ্চিত হন পুলিশ তাঁর ছেলেকে ধরে এনেছে। ধরে আনা তরুণের নাম সুমন মিয়া। বাবার নাম মো. মোস্তফা। একসময় তিনি পুলিশে চাকরি করতেন। তাঁর সর্বশেষ কর্মস্থল ছিল গৌরীপুর থানা। এই থানা থেকেই অবসরে যান তিনি।

শুরু হয় রফার আলোচনা। প্রহরী এগিয়ে যান থানার মুন্সি আবদুল কাদেরের কাছে। সুমন ততক্ষণে পুলিশের ভাতিজা বলে পরিচিত হয়ে ওঠেন। মুন্সি কাদের খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, এএসআই আশেক রাব্বানী সুমনকে ধরে এনেছেন। মুন্সিকে তখন ধমকের সুরে সহকারী দারোগার উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, ‘এই মিয়া, এইডা কী করছেন, আপনি কারে ধইর‌্যা আনছেন, এইডা তো আমার ভাতিজা। আপনি কই, তাড়াতাড়ি থানায় আসেন, ছাড়ন লাগবো।’

রাত সোয়া ১১টা। আশেক রাব্বানী থানায় প্রবেশ করে সেন্ট্রির কাছে জানতে চান কী হয়েছে। সেন্ট্রির কথা শুনে তিনি মৃদু ক্ষোভ দেখিয়ে বলেন, ‘ওরে ছাড়ন যাইবো না, ওর কাছে অনেক মাল পাইছি। মাদক মামলা দিতে হইব।’ এ সময় সুমনের ভগ্নিপতি তামাম মিয়া থানায় প্রবেশ করেন। সেন্ট্রির কাছে গিয়ে কুশল বিনিময় করেন। জানা যায়, তামাম মিয়া ও সেন্ট্রি জাহাঙ্গীরের বাড়ি একই গ্রামে। দুজনই পূর্বপরিচিত। রাত সাড়ে ১১টার দিকে এএসআই আশেক রব্বানী থানায় প্রবেশ করে সুমনকে হাজতখানা থেকে বের করে আনেন। তারপর একটি মোটরসাইকেলযোগে সুমনকে নিয়ে বের হয়ে যান তিন আরোহী।

এসব বিষয়ে গৌরীপুর থানার ওসি মো. দেলোয়ার আহাম্মদ গতকাল শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি গরিবের পয়সা খাই না। তা ছাড়া আমার জানা মতে এই থানায় কেউ এমন কাজ করতে পারে না। করলে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ওই নারীর মামলা আজই নেওয়া হবে।’

এত দিন মামলা না নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আসামি ধরে পরে মামলা নিতে বলেছিলাম।’ ডিউটি অফিসার না থাকা প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটা দুঃখজনক। আমি ওকে শাসিয়ে দেব।’

গ্রেপ্তার সুমনকে ছেড়ে দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সুমন পুলিশের ছেলে হওয়ায় প্রথমবারের মতো তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হলো।’


মন্তব্য