kalerkantho


আ. লীগ গাছাড়া, মিত্ররা এগিয়ে, বিএনপিতে দ্বন্দ্ব

রফিকুল ইসলাম ও আজিম হোসেন, বরিশাল   

৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আ. লীগ গাছাড়া, মিত্ররা এগিয়ে, বিএনপিতে দ্বন্দ্ব

আড়িয়াল খাঁ নদ বিচ্ছিন্ন করেছে দুই উপজেলাকে। এপারে বাবুগঞ্জ, ওপারে মুলাদী। এপার-ওপার নিয়েই বরিশাল-৩ আসন। জাতীয় সংসদের ১২১ নম্বর নির্বাচনী এলাকাটিতে একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে এক প্রকার গাছাড়া ভাব রয়েছে। অন্যদিকে দলটির মিত্ররা এগিয়ে আছে, যদিও জোট-মহাজোট সমীকরণে টানাপড়েন আছে। আর বিএনপিতে দ্বন্দ্ব থাকায় মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে একাধিক নাম শোনা যাচ্ছে।

পিঠাপিঠি নির্বাচনে অর্থাৎ ২০০৮ ও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ এ আসন যথাক্রমে মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলীয় জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টিকে ছেড়ে দিয়েছিল। জাতীয় পার্টির হাতবদল হয়ে আসনটি এখন ওয়ার্কার্স পার্টির দখলে। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও মিত্রদের মধ্যে সমঝোতা না হলে চিত্র পাল্টে যেতে পারে। কারণ আসনটি বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।

দশম সংসদ নির্বাচনে হাতে গোনা যে কটি আসনে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছিল তার একটি বরিশাল-৩। জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপুকে হারিয়েছিলেন ওয়ার্কার্স পার্টির শেখ টিপু সুলতান।

এর আগে বিএনপির প্রার্থী মোশাররফ হোসেন মঙ্গু পর পর তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এ আসন থেকে। অবশ্য ২০০৮ সালে সীমানা পুনর্বিন্যাস করার পর মনোনয়নবঞ্চিত হন মঙ্গু। দলের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান ও অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন মনোনয়ন নিয়ে বিরোধে জড়ান।

গাছাড়া আওয়ামী লীগ : বাবুগঞ্জ আর মুলাদীতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে অনেকটা গাছাড়া ভাব। পর পর দুই নির্বাচনে জোটের সঙ্গীদের আসনটি ছেড়ে দেওয়ায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আগামী নির্বাচনেও আসনটি জাতীয় পার্টি কিংবা ওয়ার্কার্স পার্টির জন্য বরাদ্দ হবে কি না সেটা নিয়ে ভাবনায় আছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। তবু যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসম্পাদক মো. মিজানুর রহমান বছরের পর বছর এলাকায় নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সাংগঠনিকভাবেও বেশ সক্রিয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন আলাদা ভাবমূর্তি। তৃণমূলে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি একাই মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। তবে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইছেন সাবেক সচিব সিরাজউদ্দিন আহম্মেদ। তাঁর ব্যক্তি ভাবমূর্তি পরিচ্ছন্ন হলেও দলের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ কম।



কেন্দ্রীয় যুবলীগের সহসম্পাদক মো. মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দলীয় প্রার্থী না থাকলে সাংগঠনিক ভিত্তি দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ে। এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। সাংগঠনিক ভিত্তি ঠিক রাখতেই নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছি।’

মনোনয়ন প্রসঙ্গে মিজানুর রহমান বলেন, ‘জোটের কারণে এ আসন আমাদের ছেড়ে দিতে হচ্ছে। এতে স্থানীয়ভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কেন্দ্রীয়ভাবে তার সুফল ভোগ করছি। তার পরও প্রধানমন্ত্রী চাইলে এ আসনে নির্বাচন করব।’ 

এ ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বৃহৎ স্বার্থের কারণে ক্ষুদ্র স্বার্থ বিসর্জন দিতে হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে দলকে সুসংগঠিত করা হচ্ছে। জোটের প্রার্থীর পক্ষেই নেতাকর্মীরা কাজ করবে। সেভাবেই দলীয় নেতাকর্মীদের দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। বিগত নির্বাচনে স্থানীয় কর্মীদের সঙ্গে জোটের প্রার্থীর একটু দূরত্ব হয়েছিল। এবার সেই দূরত্ব আর থাকছে না। যিনি জোটের মনোনয়ন পাবেন তাঁর পক্ষেই আমরা কাজ করব।’

মিত্ররা এগিয়ে : সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেননের গ্রামের বাড়ি বাবুগঞ্জে। ১৯৯১-এ এই আসন (তখন উজিরপুর-বাবুগঞ্জ মিলে বরিশাল-৩) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। মহাজোট থেকে তিনি ২০০৮ সালে ঢাকায় নির্বাচন করে বিজয়ী হন। তবে জন্মস্থান বাবুগঞ্জের প্রতি তাঁর বিশেষ টান রয়েছে। এ কারণেই এ নির্বাচনী এলাকার প্রতি আলাদা নজরও রাখেন তিনি। মেননের এলাকা বাবুগঞ্জ-মুলাদীতে রয়েছে ওয়ার্কার্স পার্টির শক্ত অবস্থান। এখানকার সংসদ সদস্য শেখ টিপু সুলতান বরিশাল জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক।

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু বাবুগঞ্জের সন্তান। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে হাতে গোনা যে কটি আসনে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় তার একটি বরিশাল-৩। এখানে বর্তমান সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া টিপুকে হারিয়ে জেতেন ওয়ার্কার্স পার্টির শেখ টিপু সুলতান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগামী নির্বাচনে প্রার্থিতা নিয়ে জটিলতা রয়েছে ওয়ার্কার্স পার্টিতেও। সংসদ সদস্য শেখ টিপু সুলতানের পাশাপাশি দলীয় মনোনয়ন চাইছেন যুব মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সহসভাপতি আতিকুর রহমান আতিক। রাশেদ খান মেননের ঘনিষ্ঠ হিসেবেও ব্যাপকভাবে পরিচিত তিনি। বছরের পর বছর এলাকায় নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, রাজনীতি ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন আলাদা ভাবমূর্তি। মনোনয়ন প্রশ্নে শেখ টিপু সুলতানের জন্য আতিক বড় হুমকি। 

তবে আতিককে আমলে আনতে রাজি নন টিপু সুলতান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করে। এ জোটে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) অনুপস্থিত। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোট এরশাদকে নিয়ে নির্বাচনী মহাজোট গঠন করেছিল। কিন্তু ২০১৫ সালের নির্বাচনে তারা বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এখন জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় রয়েছে দলটি। তিনি বলেন, ‘১৪ দলীয় জোট মনোনয়নের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নেবে, সে অনুযায়ী নির্বাচন হবে।’ 

নির্বাচন প্রসঙ্গে আতিকুর রহমান বলেন, ‘জনগণ যদি মনে করে আমি এমপি হওয়ার যোগ্য, তাহলে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আমার কোনো আপত্তি নেই। তবে এ ক্ষেত্রে আমার নেতা রাশেদ খান মেনন যে সিদ্ধান্ত দেবেন সেই সিদ্ধান্তকেই সবার আগে প্রাধান্য দিতে হবে। তিনি যদি মনে করেন আমি ওয়ার্কার্স পার্টির হয়ে বরিশাল-৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি, তবে সেটাই করব। তা ছাড়া জনগণের ওপর আমার বিশ্বাস রয়েছে। আমি তাদেরই সন্তান। তাই তারা আমার ক্ষতি চাইবে না।’

ক্ষমতাসীন দলের মিত্রদের মধ্যে মনোনয়ন প্রশ্নে এখানে সবচেয়ে ভালো অবস্থায় আছেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু। দলের ভেতরে তাঁর তেমন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই বললেই চলে। এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নিয়মিত সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন তিনি।

গোলাম কিবরিয়া টিপু বলেন, ‘আওয়ামী লীগের কতিপয় ব্যক্তি টাকার বিনিময়ে আমার ভোট (২০১৪ সালে) ডাকাতি করেছে। নির্বাচনের দিন দুপুর ১২টায় আমি সংবাদ সম্মেলন করে ভোট প্রত্যাখ্যান করি। এ ছাড়া যেখানে সারা দেশে ওয়ার্কার্স পার্টির নেতারা নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেছেন সেখানে এ আসনে দলটি ভোট করেছে দলীয় প্রতীক হাতুড়ি নিয়ে। এটা আসলে ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়।’

বিএনপিতে দ্বন্দ্ব: এ আসনের নির্বাচনী ইতিহাস খানিকটা ভিন্ন। ১৯৯১ (হিজলা-মুলাদী মিলে তখন ছিল বরিশাল-৪), ১৯৯৬ ও ২০০১—পরপর তিনবার এখানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বিএনপির প্রার্থী মোশাররফ হোসেন মঙ্গু। ২০০৮-এ এসে এখানে মনোনয়ন নিয়ে বিরোধে জড়ান দুই প্রভাবশালী নেতা দলের ভাইস চেয়ারম্যান  সেলিমা রহমান ও অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। সেলিমার বাড়ি বাবুগঞ্জে এবং জয়নুলের বাড়ি মুলাদীতে। ২০০৮ সালে এ আসনে বিএনপি মনোনয়ন দেয় সেলিমা রহমানকে।

দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে অ্যাডভোকেট জয়নুল স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটযুদ্ধে নামেন। ফলে মহাজোটের টিকিটে নির্বাচন করা জাতীয় পার্টির প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া টিপুর কাছে হেরে যায় বিএনপি। নির্বাচনের পর এলাকায়ও খুব একটা আসেননি জয়নুল। আট বছরে কয়েকবার এসেছেন মাত্র। এ দুজনের পাশাপাশি এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন চাইছেন সাবেক সংসদ সদস্য মোশাররফ হোসেন মঙ্গু ও বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস ছত্তার খান।

অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রায় দুই যুগ ধরে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সংগঠিত করে আসছি। সাবেক সংসদ সদস্য মোশাররফ হোসেন মঙ্গু আমার হয়ে কাজ করছেন। ২০০৮ সালে সেলিমা রহমানকে দল মনোনয়ন দিয়েছিল। ভোটে তিনি হেরেছিলেন। তার ওপর সেলিমা রহমানের ভাই ওয়ার্কার্স পার্টির মেনন সাহেব এই আসন থেকে নির্বাচন করবেন। এসব বিবেচনায় আগামী নির্বাচনে দল আমায় মনোনয়ন দেবেন বলে আশা করি। স্থানীয় কর্মীরাও তাই চায়। একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকলে ওই আসনে বিএনপির বিজয় নিশ্চিত।’

সেলিমা রহমান বলেন, ‘২০০৮ সালের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে আমি পেয়েছিলাম ৬৭ হাজার ভোট। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়নুল আবেদীন ২০ হাজার ভোট পেয়েছিলেন, যেটা বিএনপির ভোট ছিল। সেই হিসেবে মিলিতভাবে বিএনপি ৮৭ হাজার ভোট পেয়েছে। কিন্তু ভোটের ফলাফলে ধানের শীষ  হেরেছে মাত্র চার হাজার ভোটে।’

এবারের নির্বাচনে বিএনপিতে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকা প্রসঙ্গে সেলিমা বলেন, ‘২০০৮ আর এখনকার রাজনৈতিক অবস্থা এক নয়। তবে আগামী নির্বাচনে একক প্রার্থী থাকবে। এর পরে যদি কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হন তাতে ধানের শীষে কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ আগামী নির্বাচন হবে বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। তখন ধানের শীষ ছাড়া অন্য ব্যালটে সিল পড়বে না।’

জয়নুল আবেদীনের বক্তব্য সম্পর্কে সেলিমা বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে মেনন বরিশাল-৩ থেকে নির্বাচন করবেন উনি (জয়নুল) কিভাবে নিশ্চিত হলেন।’

জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) ভাইস চেয়ারম্যান মো. এনায়েত কবির বরিশাল-৩ আসনে নির্বাচন করবেন বলে জানিয়েছেন।


মন্তব্য