kalerkantho


মহতী

আঁধার সরিয়ে আলোর ফোয়ারা

অরণ্য ইমতিয়াজ, টাঙ্গাইল   

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আঁধার সরিয়ে আলোর ফোয়ারা

টাঙ্গাইলের এসপি পার্কে দর্শনার্থীর ভিড়। ছবি : কালের কণ্ঠ

মাত্র এক বছর আগের কথা। টাঙ্গাইল শহরের পুলিশ লাইনসের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে হাজরাঘাট ও এর আশপাশের জায়গাটি তখন মাদকের কুখ্যাত আখড়া। বস্তির খুপরি ঘর আর ময়লা-আবর্জনায় ঠাসা বলে নাকে-মুখে রুমাল গুঁজেও চলাচলে কষ্ট হয়। দিনে যদি যাওয়াও যায়, রাতে অপেক্ষা করে বিপদ। এক বছরের ব্যবধানে শহরের মানুষের পদচারণে মুখর থাকে এলাকাটি। বড়রা ভোরে ছোটেন ব্যায়াম করতে, দুপুর গড়াতেই শিশু-কিশোররা ছুটে যায় বিনোদনের খোঁজে। বসে মহা আনন্দহাট। জেলা শহরের ভেতর সব বয়সীদের ফুসফুস ভরে শ্বাস নেওয়ার নিরাপদ স্থানটি গড়া সম্ভব হয়েছে শহরের কয়েকজন ব্যবসায়ীর সহায়তা ও পুলিশ সুপারের সাহসী ভূমিকায়।

অদূরেই টাঙ্গাইল জেলা কারাগার, পুলিশ লাইনস আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, পুলিশ প্যারেড গ্রাউন্ড।

কয়েক শ গজ দূরে পুলিশ সুপারের কার্যালয়। এমন একটি এলাকায় মাদকসেবীদের আখড়া গড়ে ওঠায় শহরবাসী মনে মনে ক্ষুব্ধই ছিল। এ অবস্থায় ২০১৬ সালের ১৭ জুলাই টাঙ্গাইলে পুলিশ সুপার হিসেবে যোগ দেন মাহবুব আলম পিপিএম। একই বছরের শেষের দিকে টাঙ্গাইলের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মাহবুব হোসেনের উদ্যোগে টাঙ্গাইল শহরের লৌহজং নদী পুনরুদ্ধারের আন্দোলন শুরু হয়। তখন জেলা প্রশাসক পুলিশ সুপারের সঙ্গে পরামর্শ করেন কিভাবে কাজটি সম্পন্ন করা যায়। ঠিক তখনই পুলিশ সুপারের মাথায় আসে, পুলিশ লাইনসের পাশের বেদখলে থাকা জায়গা উদ্ধার করে নোংরা আবর্জনা সরিয়ে আর মাদকের আখড়া ধ্বংস করে তৈরি করা হবে একটি পার্ক। শুরু হয় এসপি পার্কের প্রাথমিক কাজ।

এর পরের গল্পটি কালের কণ্ঠকে শোনান পুলিশ সুপার মাহবুব হোসেন। তিনি জানান, বস্তি উচ্ছেদ করা হলেও কিছুদিন পর আবার সেখানে ধীরে ধীরে বস্তি গড়ে ওঠে। একই সঙ্গে মাদকের আড্ডাও শুরু হয়। তাই প্রথম অবস্থায় পরিকল্পনা নেওয়া হয় উদ্ধারকৃত জায়গায় মাটি দিয়ে ভরাট করে বাগান করা হবে। এসপি জানান, প্রথম দিকে যারা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে তারাই বাগান দেখে খুব খুশি হয়ে সেখানে হাঁটার জন্য রাস্তা করে দেওয়ার দাবি জানায় পুলিশের কাছে। পরে রাস্তা করা হয়। এরপর কয়েকজন ব্যবসায়ী এগিয়ে আসেন সেখানে বিনোদনের ব্যবস্থা করার জন্য। ব্যবসায়ী পীরজাদা শফিউল্লাহ আল মুনির শিশুদের খেলার জন্য চায়না থেকে চারটি স্লিপার এবং লাইটিংয়ের ব্যবস্থা করেন। আলাউদ্দিন টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড ছাতা বানিয়ে দেয়। এভাবে চলতে থাকে পার্কের কার্যক্রম। পরে পুলিশ সুপারের নিজস্ব তহবিল থেকে পার্কের উন্নয়নকাজ করা হয়। গত ৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক আনুষ্ঠানিকভাবে পার্কের উদ্বোধন করেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুলিশ লাইনসের পশ্চিম পাশে লৌহজং নদীর স্লুইস গেটের কাছে পার্কের গেট করা হয়েছে। টাঙ্গাইল পুলিশ লাইনস আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে থেকে শুরু করে হাজরাঘাট স্লুইস গেটের উত্তর ও পূর্ব দুই পাশ দিয়ে জেলা কারাগারের সামনের ফটক পর্যন্ত পার্কের সীমানা। এখানে রয়েছে ছাতা, স্লিপার, বসার বেঞ্চ, দোলনা, ফুলের বাগান, ইলেকট্রিক দোলনা ও ফোয়ারা। গাছের চারদিকে জড়িয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন রঙের লাইট। লাইনগুলো রাতে জ্বলে ওঠে। বিশেষ করে স্লুইস গেটের দক্ষিণ-পশ্চিম কর্নারের বটগাছের লাইট রাতের বেলা পার্কে আসা মানুষের নজর কাড়ে।

টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ সুজা উদ্দিন তালুকদার জানান, প্রতিদিন ভোরে তিনি এসপি পার্ক ও ডিসি পার্কে দৌড়ান। তিনি বলেন, শহরের অন্যান্য জায়গায় দৌড়ানোর মতো অবস্থা নেই। নোংরা, ভাঙাচোরা রাস্তা। কিন্তু এ জায়গায় নিরাপদে চলাচল করা যায়। পার্কটি খুব সুন্দরও হয়েছে। উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

শিশু সংগঠক অধ্যাপক তরুণ ইউসুফ বলেন, শিশুদের বেড়ানোর মতো ভালো ব্যবস্থা টাঙ্গাইলে তেমন নেই। সেই অভাব অনেকটাই পূরণ হয়েছে এই পার্কের কারণে। পার্কটি অবশ্যই শিশুদের বেড়ানোর উপযুুক্ত স্থান। টাঙ্গাইল শহরের সোহেল খান বলেন, যে জায়গা দিয়ে আগে যাতায়াত করতে নাকে রুমাল ব্যবহার করতে হতো, সেখানে এত চমৎকার পার্ক, বসার ব্যবস্থা, হাঁটার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সত্যি খুব ভালো লাগছে। এভাবে যদি টাঙ্গাইলের অন্যান্য বেদখল হয়ে যাওয়া জায়গা উদ্ধার করে বেড়ানোর মতো ব্যবস্থা করা হতো, তাহলে খুবই ভালো হয়।

পার্কের কারিগর টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মাহবুব আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, টাঙ্গাইলবাসীর ইচ্ছা এবং সহযোগিতায় এসপি পার্ক করা সম্ভব হয়েছে। এখানে নিরাপত্তার সব ব্যবস্থা রয়েছে। শিশুরা যাতে বেড়াতে এসে দোলনা, স্লিপার থেকে পরে দুর্ঘটনায় শিকার না হয় সেদিকে নজর রাখতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য পাহারা দিচ্ছেন। শিশুদের খাবারের জন্য নির্ধারিত বিশেষ ক্যাফেটেরিয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখানে কোনো পচা, বাসি খাবার বিক্রি করা হবে না। পুলিশ সুপার বলেন, ‘পার্ক করতে পেরে আমার ভীষণ ভালো লাগছে। মাঝেমধ্যে সকালে-বিকেলে বা সন্ধ্যায় পার্কে যাই। মনে হয় প্রাণটা তখন জুড়িয়ে গেল।’

 


মন্তব্য