kalerkantho


পাকিস্তানের অন্যায়ই বাংলাদেশ সৃষ্টির কারণ : নওয়াজ

বঙ্গবন্ধুর প্রতি বঞ্চনার সঙ্গে নিজের মিলও দেখছেন তিনি

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

১০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পাকিস্তানের অন্যায়ই বাংলাদেশ সৃষ্টির কারণ : নওয়াজ

ফাইল ছবি

পাকিস্তানের অতীত পর্যালোচনা করতে গিয়ে ঐতিহাসিক কিছু উপলব্ধির কথা তুলে ধরেছেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। তিনি ১৯৭০-৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি পাকিস্তানের অন্যায় আচরণের সঙ্গে তাঁর প্রতি বর্তমান পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যায়ের সাদৃশ্য দেখছেন। গতকাল মঙ্গলবার ইসলামাবাদে জনাকীর্ণ আদালতে তিনি বলেন, ‘শেখ মুজিবুুর রহমান বিদ্রোহী ছিলেন না। পাকিস্তানের আচরণের কারণেই তাঁকে বিদ্রোহী হতে হয়েছে।’

পাকিস্তানে তিনবার ক্ষমতা থেকে উত্খাত হওয়া নওয়াজ তাঁর দেশ থেকে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন হওয়া প্রসঙ্গে বলেন, ‘পাকিস্তান সৃষ্টির প্রচেষ্টায় মুখ্য ভূমিকা ছিল বাঙালিদের। কিন্তু আমরা তাদের সঙ্গে সদাচরণ করিনি এবং তাদের আমাদের কাছ থেকে আলাদা হতে বাধ্য করেছি।’ তিনি বলেন, ‘বিচারপতি হামুদুর রহমান কমিশন বাংলাদেশ সৃষ্টির বিষয়ে অত্যন্ত সত্য ও স্পষ্ট প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। কিন্তু আমরা তা পড়েও দেখিনি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা কি এ বিষয়ে (ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে) কাজ করেছি। করলে আজকের পাকিস্তান অন্যরকম হতো। আর আজ যে ধরনের খেলা চলছে তা হতো না।’

পাকিস্তানের ডন পত্রিকার অনলাইনে নওয়াজ শরিফকে উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সঙ্গে নওয়াজের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পটভূমির মিল রয়েছে।

নওয়াজ বলেন, পাকিস্তানের কোনো আদালত কোনো একনায়ক-স্বৈরশাসকের বিচার করতে পারেনি। অথচ সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে ক্ষমতার বাইরে ঠেলে দিয়েছে। বছরের পর বছর নিপীড়ন করে তাঁকে বিদ্রোহের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রযন্ত্র জনপ্রিয় ও নির্বাচিত একজন নেতাকে প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে পাকিস্তানের সরকার গঠনের অধিকার পেলেও পশ্চিম পাকিস্তানি গোষ্ঠী তা মেনে না নেওয়া এবং এরপর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসের দিকে ইংগিত করেন নওয়াজ শরিফ। তিনি বলেন, ‘আমি এসব ক্ষত ভুলে যেতে চাই। আমি যেখানে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারব না সেখানে যেতে চাই না।’

নওয়াজ বলেন, ‘আমার সঙ্গে এবং এ দেশের ইতিহাসে নির্বাচিত সব প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যা করা হয়েছে তা ঠিক নয়। দেশ সেবার এ কী প্রতিদান?’ নির্বাচিত সরকারগুলোকে উত্খাত বন্ধের দাবি করে তিনি রাজনীতির আড়ালের ক্রীড়নকদের নিজেদের অপকর্ম স্বীকার করার এবং জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান।

সাবেক ও বর্তমান বিচারকদের দোষারোপ করে নওয়াজ শরিফ বলেন, পাকিস্তানের বিচারব্যবস্থাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করেছে। বিচারকরা একনায়ক স্বৈরশাসকদের বৈধতা দিয়েছেন এবং ‘প্রয়োজনের তাগিদে’ নীতি আবিষ্কার করেছেন। তিনি বলেন, ‘তাদের (স্বৈরশাসকদের) বলা হয়েছে যে তারা যদি না আসত তাহলে দেশ (পাকিস্তান) ধ্বংস হয়ে যেত। তাদের (স্বৈরশাসকদের) বলা হয়েছে—এটি পাকিস্তানের সংবিধান এবং এটি তাদের সম্পত্তি। তাদের (স্বৈরশাসকদের) সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অথচ এমন কর্তৃত্ব বিচারকদের নিজেদেরই নেই।’ নওয়াজ বলেন, “তাদের (স্বৈরশাসকদের) বলা হয়েছে— ‘আমরা (বিচারকরা) কখনো আপনাদের (স্বৈরশাসকদের) প্রশ্ন করব না, কেউ আপনাদের (স্বৈরশাসকদের) প্রশ্ন করবে না’ এবং পুরো জাতি চুপ থাকবে।’’

পাকিস্তানকে অনেক ভুলের সমাহার হিসেবে উল্লেখ করে নওয়াজ বিচারকদের নিজেদের আদালতের দিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, লাখ লাখ মামলা ঝুলে আছে। জনগণ বিচার পাচ্ছে না। মামলা পরিচালনার ব্যয় এত বেশি যে তিনি নিজেও আইনজীবীদের ফি দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।


মন্তব্য