kalerkantho


রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে পেরিয়ে যাবে দশক!

প্রক্রিয়া শুরু নিয়েই অনিশ্চয়তা

মেহেদী হাসান   

১৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে পেরিয়ে যাবে দশক!

ফাইল ছবি

সরকারি পর্যায় থেকে আগামী ২২ জানুয়ারির মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর বিষয়ে আশা প্রকাশ করা হলেও যথাসময়ে তা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের কোনো তালিকা এখনো মিয়ানমারকে দেওয়া হয়নি। প্রাথমিকভাবে তাদের এক লাখ রোহিঙ্গার তথ্য দেওয়ার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ। নেপিডোতে আগামী সোমবার অনুষ্ঠেয় প্রত্যাবাসনবিষয়ক যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে তালিকা দেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা হবে।

ওই বৈঠকে তালিকা হস্তান্তর হতে পারে। এ অবস্থায় ধারণা করা যায়, চুক্তির শর্ত ও প্রক্রিয়াগত ধীরগতির কারণে প্রত্যাবাসন শেষ করতে এক দশক পেরিয়ে যেতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা গত সপ্তাহে কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রত্যাবাসনের বিষয়টি খুবই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তালিকা দিলেই প্রত্যাবাসন হয়ে যাবে—এমন নয়। মিয়ানমার ওই তালিকা ধরে পরিচয় যাচাই করবে। এরপর প্রত্যাবাসন শুরুর প্রসঙ্গ আসবে।

গত ২৩ নভেম্বর নেপিডোতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সই হওয়া প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবরের পর থেকে আসা রোহিঙ্গাদের পরিচয় যাচাই সাপেক্ষে স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়ার বিষয়টি দুই দেশ বিবেচনা করবে। বাংলাদেশে অবস্থানরত ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার মধ্যে ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবরের পর এসেছে প্রায় সাত লাখ ৩৮ হাজার রোহিঙ্গা। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, গত ১৯ ডিসেম্বর ঢাকায় দুই দেশের বৈঠকে মিয়ানমার প্রথম দফায় একটি বড় তালিকা দেওয়ার অনুরোধ করেছে। বাংলাদেশ প্রাথমিকভাবে এক লাখ রোহিঙ্গার তালিকা দেওয়ার কথা ভাবছে।

সাত লাখ ৩৮ হাজার রোহিঙ্গার মধ্য থেকে এক লাখ রোহিঙ্গা কিভাবে বাছাই করা হবে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, দৈবচয়ন পদ্ধতিতে বাছাই (র‌্যান্ডম সিলেকশন) করার কথা ভাবা হচ্ছে।

রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরতে চায় কি না এবং এ বিষয়ে মতামত নেওয়া হচ্ছে কি না জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এ পর্যায়ে এমন কোনো মতামত নেওয়া হচ্ছে না। বাংলাদেশের দেওয়া তালিকা ধরে মিয়ানমার পর্যায়ক্রমে তাদের পরিচয় যাচাই করবে। এরপর মিয়ানমারের পাঠানো ফরম পূরণ করে তাদের আরো তথ্য দেওয়া ও ফিরে যেতে সম্মত হওয়ার মতো বিষয়গুলো আসবে। 

এদিকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বলছে, রোহিঙ্গাদের কোনো অবস্থাতেই জোর করে ফেরত পাঠানো যাবে না। তাদের ফিরে যাওয়ার উদ্যোগটি হতে হবে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও সম্মানজনক। জাতিসংঘের সংস্থাগুলো রাখাইন পরিস্থিতি রোহিঙ্গাদের জন্য এখনই ফিরে যাওয়ার অনুকূল নয় বলে মনে করে। তা ছাড়া এখনো রোহিঙ্গারা নিপীড়নের শিকার হয়ে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে। মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যে পরিস্থিতির উন্নয়ন ও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের কথা বলেছে। সে বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া প্রত্যাবাসন কতটা টেকসই হবে তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। সর্বোপরি মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিয়ে ফিরিয়ে নিচ্ছে না। রাখাইন রাজ্য থেকে ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবরের পর তারা বাংলাদেশে আসার বিষয়টি মিয়ানমার যাচাই করবে। রাখাইনে ফেরার পর তাদের নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে। সে প্রক্রিয়ায় সফল না হলে রোহিঙ্গাদের ভাগ্যে কী ঘটবে তা দেশটি স্পষ্ট করেনি।

মিয়ানমার আগামী ২২ জানুয়ারি ৪৫০ জন হিন্দু রোহিঙ্গাকে দিয়ে প্রত্যাবাসন শুরুর যে আগ্রহ দেখাচ্ছে সেটিকেও ‘লোক-দেখানো’ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা। রাখাইন রাজ্যে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও ‘প্রিফেব্রিকেটেড বাড়ি’ নির্মাণের বিষয়ে ভারত গত মাসে মিয়ানমারের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে। ভারত রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান ও আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে ৪৫০ জন হিন্দু রোহিঙ্গাকে রাখাইনে ফিরিয়ে নিয়ে মিয়ানমার একটি ইতিবাচক বার্তা দিতে চায়। আগামী সোমবার নেপিডোতে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার বিষয়ে ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ সই হওয়ার কথা রয়েছে। কবে কোন সীমান্ত দিয়ে কতজন ফিরে যাবে তা তাতে উল্লেখ থাকবে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার সবাই নিজ ভূমে ফিরে যেতে চাইলে এবং মিয়ানমার দ্রুততার সঙ্গে রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা হিসেবে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করলেও প্রত্যাবাসন শেষ করতে বেশ কয়েক বছর এমনকি এক দশকের বেশি সময় লেগে যেতে পারে। কারণ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এখনো রাখাইন তথা মিয়ানমারে বেশ স্পর্শকাতর ইস্যু। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমার সরকার আভাস দিয়েছে যে দিনে এক শ থেকে দেড় শর মতো রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়া হতে পারে। সে হিসাবে ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবরের পর থেকে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরাতে ১৮ থেকে ২০ বছর লেগে যাবে। চুক্তি অনুযায়ী, এদের ফেরত পাঠানো শেষ হওয়ার পর তারও আগে আসা তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার বিষয় দুই দেশ বিবেচনা করবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে সময় যত গড়িয়েছে সংকট ততই বেড়েছে। ধারণা করা যায়, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হতে হতে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা বাড়বে। বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন আভাস দিয়েছে, এ বছরই বাংলাদেশে প্রায় অর্ধ লাখ রোহিঙ্গা শিশু জন্ম নেবে। মিয়ানমার যুগ যুগ ধরে রাখাইনে বসবাস করে আসা রোহিঙ্গাদেরই ওই দেশের নাগরিক বা বৈধ অধিবাসী হিসেবে স্বীকার করে না। এ অবস্থায় নতুন করে জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুদের পরিচয় যাচাই প্রক্রিয়াটি আরো কঠিন হতে পারে। মিয়ানমার সরকার ২০১১ সালে বাংলাদেশে অবস্থানরত দুই হাজার ৪১৫ জন রোহিঙ্গাকে নিজের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করেও ফিরিয়ে নেয়নি। তাদের বেশির ভাগের জন্ম বাংলাদেশে হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আইনি জটিলতা রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বড় অংশই শিশু। তাদের সঙ্গে অভিভাবক নেই। আবার আশ্রিত রোহিঙ্গা নারীদের উল্লেখযোগ্য অংশই মিয়ানমারে নিরাপত্তা বাহিনীর ধর্ষণের শিকার হয়েছে। গত ২৩ নভেম্বর সই হওয়া প্রত্যাবাসন চুক্তিতে বলা হয়েছে, ‘অযাচিত ঘটনায়’ (আনওয়ারেন্টেড ইনসিডেন্ট) জন্ম নেওয়া শিশুদের মিয়ানমারে ফিরে যেতে বাংলাদেশের আদালতের সনদ প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ এমন রোহিঙ্গা শিশুদের ফেরার বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে।

 


মন্তব্য