kalerkantho


বাংলা সাহিত্য সম্মেলন

লেখকদের মিলনমেলা

নওশাদ জামিল   

১৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



লেখকদের মিলনমেলা

বাংলা একাডেমিতে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনে বইয়ের স্টলে দর্শনার্থীরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাংলা একাডেমি চত্বরজুড়ে উৎসবের সাজ। ইতিহাসের সাক্ষী বর্ধমান হাউস ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা আমগাছের নিচে ছোট-বড় কিছু স্টল। প্রতিটিতে বই। যেন বইমেলার চিরচেনা দৃশ্য। অবশ্য এটি বইমেলা নয়। বইয়ের লেখকদের নিয়ে উৎসব। শুধু লেখক-সাহিত্যিক নন, সংস্কৃতির আরো কিছু শাখা সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্রসহ নানা আয়োজন। দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে তিন দিনের আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন। তিন শতাধিক বাংলাভাষী লেখকের সম্মিলনে গোটা আয়োজন হয়ে উঠেছে বাংলা সাহিত্যের অনন্য এক মিলনমেলা।

‘বিশ্ব মানব হবি যদি কায়মনে বাঙালি হ’ প্রতিপাদ্যে তিন দিনের এই সম্মেলনের সূচনা হয় গতকাল শনিবার। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মেলন উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিকেল ৫টার পর নানা আয়োজন শুরু  হয়  বাংলা একাডেমির আঙিনায়। প্রথম দিনের আয়োজনে ছিল নাটক ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। বর্ণিল আলোয় সাজানো একাডেমির উন্মুক্ত চত্বরে বসেছে বই বিতান। দেশের ছয়টি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে এতে যুক্ত হয়েছে কলকাতার দৈনিক পত্রিকা আজকাল এবং কলকাতার পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলারস গিল্ড। লালন মঞ্চে পরিবেশিত হয়েছে রবীন্দ্রসংগীতের সুরসুধা। একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তন ও কবি শামসুর রাহমান মিলনায়তনের সঙ্গে  বহিরাঙ্গনে রবীন্দ্র, নজরুল মঞ্চসহ ‘অনেক আকাশ’ নামের তাঁবুতে বহুমাত্রিক আয়োজনে সাজানো হয়েছে সম্মেলন। সম্মেলনটির আয়োজক আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন পরিষদ। সহযোগিতায় নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন ও ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ।

বিকেল ৫টা থেকে বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় সর্বসাধারণের জন্য। রাত ৯টা পর্যন্ত চলে প্রথম দিনের আয়োজন। এদিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলা সাহিত্যের সমকালীন ছোটগল্প’ শীর্ষক গল্প পাঠ ও আলোচনা পর্বটি। এর বাইরে একাডেমির বহিরাঙ্গনে প্রদর্শিত হয় দর্শক সমাদৃত দুই চলচ্চিত্র মসিহ্উদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী নির্মিত ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ এবং গৌতম ঘোষ নির্মিত ‘পদ্মা নদীর মাঝি’। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে সন্ধ্যা ৭টায় মঞ্চস্থ হয় ম্যাড থেটারের নাটক নদ্দিউ নতিম। এ ছাড়া সন্ধ্যায় ছিল বাংলাদেশ ও ভারতের কবি-সাহিত্যিকদের প্রীতি সম্মেলন।

সন্ধ্যা ৬টায় কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় ‘বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলা সাহিত্যের সমকালীন ছোটগল্প’ শীর্ষক আলোচনা। এ অধিবেশনে প্রাণবন্ত আলোচনার পাশাপাশি স্বরচিত তিনটি গল্প পাঠ করেন বদরুন নাহার, জাহেদ মোতালেব ও মোজাফফর হোসেন। লেখক পারভেজ হোসেনের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক ও আহমাদ মোস্তফা কামাল এবং ভারতের কথাসাহিত্যিক অভিজিৎ সেন ও স্বপ্নময় চক্রবর্তী।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলা ছোটগল্পের তুলনামূলক আলোচনায় আনিসুল হক বলেন, সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হকের মতো লেখকদের সৃষ্টিকর্মগুলো আন্তর্জাতিক মানের। কোনো এক অজানা পৃথিবীর মানুষ সেসব রত্নের খোঁজ রাখল না। সাহিত্যকর্মকে যেকোনো উপায়েই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে হবে। অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হয়ে উঠলে বাংলাদেশও সাহিত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসবে।

আহমাদ মোস্তফা কামাল বলেন, দেশভাগের মধ্য দিয়ে সীমানাকে দুই ভাগে ভাগ করা হলেও সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতিতে বিভাজন রেখা টানা যায় না। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ মূল বাংলা সাহিত্যের উত্তরাধিকার বহন করে।

অনেক আকাশ তাঁবুতে ছিল ‘সাহিত্যের পরাগায়ণ ও বাংলা সাহিত্য’ শীর্ষক উন্মুক্ত আড্ডা। এতে আলোচনায় অংশ নেন কুমার চক্রবর্তী, জুয়েল মাজহার ও রায়হান রাইন। সঞ্চালনা করেন চঞ্চল আশরাফ।

রাতে লালন মঞ্চে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন ভারতের কণ্ঠশিল্পী শ্রাবণী সেন। 

আজকের সম্মেলন : আজ রবিবার সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চলবে ‘বাংলা সাহিত্যে দেশ ভাগের অভিঘাত’ শীর্ষক সেমিনার। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিতব্য সেমিনারে কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন গোলাম মুস্তাফা। আলোচনায় অংশ নেবেন সেলিনা হোসেন, ইমদাদুল হক মিলন, বীথি চট্টোপাধ্যায়, শাহীন আখতার প্রমুখ।

একই মিলনায়তনে দুপুর ২টায় অনুষ্ঠিত হবে ‘সাহিত্য ও চলচ্চিত্র’ শীর্ষক সেমিনার। ভারতের বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষের সভাপতিত্বে এ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন সাজেদুল আওয়াল। আলোচনায় অংশ নেবেন চলচ্চিত্র নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল, জাহিদুর রহিম অঞ্জন প্রমুখ। 

এদিন বিকেলে অনুষ্ঠিত হবে ‘বাংলা সংবাদ ও সাময়িকপত্রের ২০০ বছর’ শীর্ষক সেমিনার। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ পাঠ করবেন স্নেহাশীস সুর। আলোচনায় অংশ নেবেন আবুল হাসনাত, মনজুরুল আহসান বুলবুল, শ্যামল দত্ত প্রমুখ। বিকেল ৫টায় শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে ‘সাম্প্রতিক বাংলা উপন্যাসের গতি ও গন্তব্য’ শীর্ষক আলোচনা। আলোচনায় অংশ নেবেন ভারতের কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, বাংলাদেশের কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক, আহমাদ মোস্তফা কামাল প্রমুখ। একই দিন বিকেলে রবীন্দ্র চত্বরে কবিতা পাঠের সঙ্গে আবহমান বাংলা গানের সুরে শ্রোতা-দর্শকদের হৃদয় রাঙাবেন বাংলাদেশ ও ভারতের কবি-শিল্পীরা।



মন্তব্য