kalerkantho


রুবি ভিলার মালিকের ‘উদাসীনতায়’ সন্দেহ

এস এম আজাদ   

১৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রুবি ভিলার মালিকের ‘উদাসীনতায়’ সন্দেহ

ঢাকায় এবং দেশের অন্যত্র আগের সব অভিযানে জঙ্গিদের আলাদা ভাড়া বাসায় বা ফ্ল্যাটে থাকতে দেখা গেলেও রাজধানীর নাখালপাড়ার রুবি ভিলায় মেসে অন্য ভাড়াটিয়াদের সঙ্গেই বসবাস করছিল সন্দেহভাজন তিন জঙ্গি। তেজগাঁওয়ের পশ্চিম নাখালপাড়ার ওই ভবনে আগে দুই দফায় এবং পাশের ভবনে এক দফায় অভিযানের পরও মালিকপক্ষ সতর্ক না হওয়ার বিষয়টিকেও সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।

গতকাল শনিবার সরেজমিনে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভবনটির নিরাপত্তাব্যবস্থা বলতে তেমন কিছুই ছিল না। ভবনের মালিক শাহ মো.সাব্বির হোসেন বিমানের ফ্লাইট পারসার হওয়ায় বেশির ভাগ সময়ই বাড়ির বাইরে থাকতেন। বাড়িতে এসেও তিনি স্ত্রীর সঙ্গে নয়, আলাদা ফ্ল্যাটে থাকতেন। বাড়ির নিচতলায় একজন কেয়ারটেকার থাকলেও তিনি গেটে ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করতেন না। কে কখন ঢুকত আর বের হতো, এর কোনো হিসাব ছিল না। ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র নেওয়া হতো না। আর এ সুযোগেই পঞ্চম তলার মেসে ছদ্মপরিচয়ে তিন জঙ্গি অস্ত্র-বিস্ফোরক নিয়ে ঢুকে পড়ে বলে অনেকের ধারণা। বাড়ির ‘নিরাপত্তা গলদ’ কাজে লাগিয়ে জঙ্গিরা ঢুকেছে, নাকি সেখানে তাদের আশ্রয়দাতা আছে, তা খতিয়ে দেখছে র‌্যাব।

গতকাল পর্যন্ত বাড়ির মালিক, মেস ব্যবস্থাপক রুবেল, মেসে খাবার সরবরাহকারী শীতল ও মেসের সদস্য তৌহিদকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলেন তদন্তকারীরা। তবে জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে কারো সংশ্লিষ্টতা মেলেনি এখনো। নিহত তিন জঙ্গির ব্যাপারে কিছু তথ্য মিললেও পরিচয় নিশ্চিত হতে পারেনি র‌্যাব। অভিযানের ব্যাপারে গতকাল তেজগাঁও থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

র‌্যাব-৩-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল এমরানুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাড়িটিতে নিরাপত্তা বা সতর্কতামূলক কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এর আগে র‌্যাব এই বাড়িতে দুইবার অভিযান চালিয়ে নাশকতায় জড়িত কয়েকজনকে ধরেছে। ডিএমপির পক্ষ থেকে ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম পূরণ করতে বলা হয়েছে। এর পরও সতর্ক হয়নি মালিকপক্ষ। এটি কি শুধুই অসতর্কতা, নাকি ভেতরের কেউ একই মতাদর্শের, তা যাচাই করে দেখছি।’ তিনি বলেন, ‘এখনো নিহত তিনজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। কিছুটা ক্লু ধরে কাজ করছি। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করা হচ্ছে।’ র‌্যাব-৩-এর প্রধান জানান, বাড়ির মালিক সাব্বির হোসেনসহ চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে এখনো কারো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। অভিযানের ঘটনায় তেজগাঁও থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এতে নিহত তিন জঙ্গি ছাড়া আর কাউকে আসামি করা হয়নি।

গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ন্যাম ভবনের পেছনে পশ্চিম নাখালপাড়ার ১৩/১ নম্বর রুবি ভিলা ভবনে অভিযান চালায় র‌্যাব। বাড়ির পঞ্চম তলার একটি মেসে র‌্যাবের সঙ্গে গোলাগুলিতে নিহত হয় জেএমবির তিন জঙ্গি। সেখান থেকে তিনটি গ্রেনেড, দুটি পিস্তলসহ বেশ কিছু অস্ত্র-বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলে একই ছবি থাকা দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র মেলে। এর একটিতে ‘জাহিদ’ নাম লেখা, যার বাবার নাম জুবায়ের এবং বাড়ি কুমিল্লায়। অন্যদিকে সজীব নামের অন্য পরিচয়পত্রের বাড়ির ঠিকানা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এবং বাবার নাম জামান হোসাইন।

সূত্র জানায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট পারসার সাব্বির অভিযানের সময় বাড়িতে ছিলেন না। গত শুক্রবার তিনি বিমানে দায়িত্ব পালন শেষে বাড়িতে আসেন। এরপর র‌্যাব তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। তবে তিনি নিহত তিন জঙ্গির ব্যাপারে কিছুই বলতে পারেননি। তিনি ভাড়াটিয়াদের চেনেন না বলেও দাবি করেন। সব প্রশ্নে মেসের ব্যবস্থাপক রুবেলের কাছে জানতে পরামর্শ দেন।

বাড়িতে বেশি ভাড়ায় মেস চালানোর জন্য ব্যবস্থাপক রুবেলকে বিনা ভাড়ায় থাকার অনুমতি দেন সাব্বির। ‘জাহিদ’ নামের নিহত ব্যক্তির কাছে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায় কক্ষ ভাড়া দেওয়াসহ আগের কোনো যোগাযোগ ছিল কি না, সে ব্যাপারে রুবেলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মেসের খাবার সরবরাহকারী শীতল ও সদস্য তৌহিদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল কি না, তা-ও যাচাই করা হচ্ছে। সূত্র মতে, বাড়ির পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলায় মেসে থাকা ২১ জনের মধ্যে বেশির ভাগই ছাত্র। তবে পঞ্চম তলার মেসের সদস্যরা বেশির ভাগ চাকরিজীবী। ‘জাহিদ’ তেজগাঁওয়ে একটি সিরামিক কারখানায় কাজ করেন বলে জানিয়েছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনজন দাবি করেন, নিহত তিন ব্যক্তি কক্ষের দরজা আটকে রাখত। অন্যদের সঙ্গে তেমন কোনো কথাই বলত না।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাড়ির নিচে গ্যারেজের পাশের কক্ষে সাইফুল নামে একজন স্ত্রীসহ থাকেন। তিনি সাব্বিরের বাসার কাজকর্ম করতেন। পাশাপাশি গেটের দিকেও ‘নজর’ রাখতেন। তাঁর স্ত্রীও সাব্বিরের বাসায় কাজ করেন। সাইফুল ময়মনসিংহে সাব্বিরের গ্রামের বাড়ির দূর সম্পর্কের আত্মীয়। দুই মাস আগে তাঁকে আনা হয়।

সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ১৪ আগস্ট এবং ২০১৩ সালে র‌্যাব দুই দফায় রুবি ভিলার মেস থেকে জামায়াত-শিবিরের এক ডজন কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছিল। তারা নাশকতার ঘটনায় জড়িত বলে অভিযোগ করা হয়। গত বছর পাশের ৭৪ নম্বর বাড়ির একটি মেসে একই ধরনের অভিযান চালায় পুলিশ। এসব অভিযানের পর মালিকপক্ষকে বাসা ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।

গতকাল সকালে রুবি ভিলায় গিয়ে র‌্যাবের পাহারা দেখা গেছে। বাড়ির গেটে কয়েকজন ভাড়াটিয়ার সঙ্গে কথা বললে তারা জানায়, মেসের কয়েকজনকে আটক করেছে র‌্যাব। বাকিরা চলে গেছে। তৃতীয় থেকে পঞ্চম তলার ভাড়াটিয়াদের অনেকে বাসা ছাড়ছে। তৃতীয় তলার ভাড়াটিয়া এম এম মতিনের স্ত্রী সাহেরা মতিন বলেন, ‘বাড়িতে নিরপত্তাব্যবস্থায় ঘাটতি আছে। দেড় মাস আগে এখানে একজনকে এনেছে। তবে সব সময় দারোয়ান থাকে না। মালিকরা খেয়াল না রাখলে এমনই হয়! আমরাও চলে যাব।’ পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে আরেক ভাড়াটিয়া বলেন, ‘বাড়ির মালিক ও তাঁর স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক নেই। মালিক বাড়িতে এলে তৃতীয় তলার আলাদা ফ্ল্যাটে একা থাকেন। তাঁর স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে দ্বিতীয় তলায় থাকেন। ভোটার আইডি নেওয়া ছাড়াই বাসা ভাড়া দেন। এখানে অনেক বছর ধরেই মেস চলছে।’ তিনি আরো জানান, সাব্বিরের ঢাকাতেই আরো একটি বাড়ি আছে। তাঁর শাহরিয়ার নামে একটি ছেলে আছে।

নিরাপত্তা সমস্যার কারণে রুবি ভিলা ছেড়ে চলে গেছেন এমন এক ভাড়াটিয়া বলেন, বাড়ির নিচতলায় একজন থাকেন, যিনি বাড়িওয়ালার স্ত্রীর বাসায় কাজ করতেন। তিনি গেটে খেয়াল রাখতেন না। আর নিরাপত্তা বলতে তাঁরা বুঝতেন শুধু রাত ১১টা বাজলেই গেটে তালা। এরপর জরুরি প্রয়োজনেও গেট খোলার লোক পাওয়া যেত না। র‌্যাবের একাধিক কর্মকর্তাও জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে তাঁরা পরিচয় দিয়ে দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেও বাড়ির ভেতরে ঢুকতে পারছিলেন না। একপর্যায়ে দরজার পাশের একটি অংশ ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। কাজটি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ ওই সময় জঙ্গিরা টের পেয়ে গেলে বড় ধরনের বিপদ হতে পারত।

গুলিতেই মৃত্যু : এদিকে সন্দেহভাজন তিন জঙ্গির মৃত্যু গুলিতে হয়েছে বলেই নিশ্চিত করেছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক। গতকাল ময়নাতদন্ত শেষে সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক এ এম সেলিম রেজা বলেন, ‘তিনজনের শরীরেই বুলেটের চিহ্ন আছে। একজনের শরীরে একটি বুলেট পাওয়া গেছে। গুলিতেই তাদের মৃত্যু হয়েছে।’


মন্তব্য