kalerkantho


দিনাজপুর কোতোয়ালি থানা

একসঙ্গে চার সালিস বৈঠক

এমদাদুল হক মিলন, দিনাজপুর   

১৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



একসঙ্গে চার সালিস বৈঠক

একসময় দিনাজপুর কোতোয়ালি থানা সম্পর্কে একটি উক্তি চালু ছিল, ‘যত রাত তত মজা।’ অবশ্য সময় বদলেছে। এখন আর থানাটি সম্পর্কে এই উক্তি খাটে না। গত রবিবার রাতে সরেজমিনে গিয়ে তার কিছু নমুনা পাওয়া গেল।

যেমন : একসঙ্গে চারটি সালিস বৈঠক চলছিল সেই রাতে। থানাহাজতে ছিলেন মাদক মামলার তিনজন আসামি। কর্তব্যরত কর্মকর্তা মাদকসংক্রান্ত মামলা নথিভুক্ত করছিলেন। ওসি তাঁর কক্ষে বসে ক্লোজড সার্কিট (সিসি) টিভি মনিটরিং করছিলেন। থানায় কোনো তদবিরকারী নেই, যেন এক অচেনা থানা।

অথচ দিনাজপুর কোতোয়ালি থানা পুলিশের কর্মকাণ্ডের কারণে একসময় আলোচিত-সমালোচিত ছিল। ১৯৯৫ সালে কোতোয়ালি থানার একটি টহলদল ইয়াসমিন নামের এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যা করে। এ ঘটনায় প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হলে পুলিশ গুলি চালায়, যাতে নিহত হয় সাতজন। এরপর দিনাজপুরের সব থানা, ফাঁড়ি, আদালত ও পুলিশ লাইনের পুলিশ সদস্যদের একযোগে প্রত্যাহার করা হয়।

রবিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে থানা প্রাঙ্গণে ঢুকতেই চোখে পড়ল, থানার গোলঘরে সালিস বৈঠক চলছে। থানা ভবনের ভেতরে দেখা গেল, পরিদর্শক (তদন্ত) ফখরুল ইসলাম তাঁর কক্ষে আরেকটি সালিস বৈঠক করছেন। আরেক কক্ষে সালিস বৈঠক করছিলেন উপপরিদর্শক (এসআই) মোস্তাফিজুর রহমান। আর ওসি রেদওয়ানুর রহিম বসে আছেন তাঁর কক্ষে। থানার ভেতর থেকে বাইরে এসে দেখা গেল গোলঘরে তখনো বৈঠক করছিলেন  সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আসাদুজ্জামান। সদর উপজেলার ঝানজিরা গ্রামের অভিযোগকারী ফায়জার আলী, বিবাদী রফিকুল ইসলাম এবং তাঁদের লোকজনকে নিয়ে বিরোধ মীমাংসায় বসেছেন তিনি। রাত ৮টার দিকে বাদী-বিবাদী উভয়ে হাসতে হাসতে বের হয়ে এলেন। কারণ তাঁদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে।

কথা হয় বাদী ফায়জার আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘উকিল মুহুরি, কোর্ট-কাছারি, পুলিশের পেছনে দীর্ঘদিন ধরে ঘুরতে ঘুরতে টাকা-পয়সা খরচ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম।’ তিনি জানালেন, সমস্যার সমাধান হয়ে যাওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট।

রাত ৯টায় এক যুবককে ব্যাগ ঘাড়ে থানায় ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেল। জানতে চাইলে তিনি বললেন, তাঁর নাম মো. নাফিস হাসনাইন। তিনি পেশায় একজন পোশাক ব্যবসায়ী। বাড়ি শহরের ক্ষেত্রিপাড়ায়। তিনি থানায় এসেছেন জমিসংক্রান্ত বিবাদ নিয়ে একটি চিঠি পৌঁছে দিতে। ১৯৮২ সালে তাঁর বাবা উপশহর ১০ নম্বর ব্লকের ১১৬ নম্বর প্লটটি কেনেন। সেই প্লটের সামনে রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে তিনটি পরিবার বাড়ি করে বসবাস করছে। তাদের উচ্ছেদ চেয়ে মামলা করেছেন। চার বছর ধরে সেই মামলা চলছে।

নাফিস হাসনাইন আরো জানালেন, দিনাজপুর সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) জমি মাপজোখ করার আদেশ দিয়েছে, যাতে কোতোয়ালি থানা পুলিশের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। সেই চিঠি পৌঁছে দেওয়ার জন্য থানায় এসেছেন তিনি। পুলিশ সহযোগিতা করতে চেয়েছে কি না জানতে চাইলে নাফিস বলেন, ওসি রেদওয়ানুর রহিম সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। তার পরও তিনি নিশ্চিত নন যে পুলিশ তাঁকে সহযোগিতা করবে। সেটা নিশ্চিত করার জন্যই থানায় ঘোরাঘুরি করছেন। কোনো টাকা-পয়সা চেয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পুলিশ দুর্নীতিমুক্ত নয়।’

রাত সাড়ে ১০টার দিকে থানায় দেখা হয় এসআই মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে। থানা চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এসে তিনি এ প্রতিবেদকের কাছে জানতে চাইলেন, থানায় কী কাজে এসেছি? সালিস প্রসঙ্গে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। এসআই মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শহরের মুদিপাড়া মহল্লার সুলতান আহম্মেদের সঙ্গে তাঁর প্রতিবেশী মোস্তফা ও আসিফের জমি নিয়ে বিরোধ ছিল। সেটা নিষ্পত্তি করলেন। এ ছাড়া পরিদর্শক (তদন্ত) ফখরুল ইসলাম একটি পারিবারিক কলহ মীমাংসা করেন। মোট চারটি সালিস বৈঠক হয়েছে।

রাত যত গভীর হতে থাকে থানা ততই ফাঁকা হতে থাকে। রাত ১১টার দিকে এএসআই আসাদুজ্জামানের কাছে কয়টি মামলা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি জানান, পাঁচটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে চোলাই মদ, ফেনসিডিল ও জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে মামলা রয়েছে। এরই মধ্যে থানা থেকে একে একে রাত্রিকালীন টহলে পুলিশের চারটি দল ও পাঁচটি বিশেষ টহলদল বেরিয়ে যায়। থানায় একটি দলকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে কোনো খবর পেলেই ছুটে যাবে।

জানা গেল, সন্ধ্যায় মাদকদ্রব্য বিক্রির সময় দুজন ও ফেনসিডিলসহ একজন এবং রাতে টহলদল চুরির অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

রাত সাড়ে ১১টার পর থানায় পুলিশ ছাড়া জনসাধারণকে আসতে দেখা যায়নি। কাউকে তদবিরে আসতেও দেখা যায়নি। এ যেন এক অচেনা থানা।

রাত ২টা ১০ মিনিটে থানা চত্বর নীরব। ওসি রেদওয়ানুর রহিম বসে আছেন তাঁর চেয়ারে। বসে বসে সিসিটিভি মনিটরিং করছেন। এরই ফাঁকে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বললেন, দিনাজপুর কোতোয়ালি থানায় মামলার সংখ্যা কমে গেছে। যেসব মামলা হচ্ছে সেগুলোর বেশির ভাগই মাদকের মামলা। শীতের দিন হওয়ায় থানায় লোকজনের আসা-যাওয়াও কম। তবে জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধ ও পারিবারিক কলহ এবং ছেলে-মেয়েদের প্রেমসংক্রান্ত ঘটনায় অভিযোগ খুব বেশি। প্রতিদিন চার-পাঁচটি সালিস বৈঠক করতে হচ্ছে। ফলে মামলার চাপ কমেছে।

এরপর রাত আড়াইটায় ওসি রেদওয়ানুর রহিম তাঁর চেয়ার ছেড়ে থানা চত্বরের বাসায় চলে যান। ভোর ৫টার দিকে টহলদলগুলোকে ফিরে আসতে দেখা যায়। গ্রেপ্তার হয়েছে এক পেশাদার চোর, যার বিরুদ্ধে পরোয়ানা ছিল।


মন্তব্য