kalerkantho


বাংলা সাহিত্য সম্মেলন
প্রণব মুখোপাধ্যায় বললেন

সাহিত্যিকরা ইতিহাস নির্মাণ করেন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সাহিত্যিকরা ইতিহাস নির্মাণ করেন

বাংলা একাডেমিতে সাহিত্য সম্মেলনে অন্য অতিথিদের সঙ্গে প্রণব মুখোপাধ্যায়। ছবি : কালের কণ্ঠ

কবি-সাহিত্যিক, শিল্পীরা শান্তিপূর্ণ নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেছেন, বীর বা রাজা-মহারাজারা নন, লেখক, কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীরা ইতিহাস নির্মাণ করেন।

গতকাল সোমবার বিকেলে ঢাকায় বাংলা একাডেমিতে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপ্রধান এসব কথা বলেন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে সহমর্মিতার হাত বাড়িয়েছিলেন বাংলাদেশের এই অকৃত্রিম বন্ধু। গতকাল মাত্র ১৯ মিনিটের বক্তব্যে তিনি তুলেন ধরেন তাঁর স্বপ্ন ও ভালোবাসার কথা, ফুটিয়ে তোলেন শিল্প-সাহিত্যের প্রতি তাঁর অনুরাগের কথা।  

প্রণব মুখোপাধ্যায় আরো বলেন, ‘এখন পরিবেশ দূষণের চেয়ে বড় দূষণ রয়েছে মানুষের মনে ও চিন্তায়। এ কারণে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দূষণ মানুষেরই সৃষ্টি। হিংস্রতার সেই দূষণ থেকে পৃথিবীকে জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানও মুক্ত করতে পারবে না। ভয়াবহ এই দূষণের হাত থেকে বাঁচানোর দায়িত্ব স্রষ্টাদের। সাহিত্যিক, কবি ও লেখকরাই নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করবেন।’ 

ভারতের সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘যুগ যুগ ধরে মানব সভ্যতার ইতিহাস এ কথা বলে গেছে যে হিটলার, মুসোলিনিরা নয়, সভ্যতার ইতিহাস নির্মাণ করে গেছেন প্রফেট, ক্রাইস্ট ও বুদ্ধা। দিগ্বিজয়ী বীরেরা নয়, সভ্যতার ইতিহাসের দিক নির্মাণ করেছেন লেখক-কবি-সাহিত্যিক তথা শিল্পীরা।’

প্রণব মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘পরীক্ষা পাসের জন্য দিগ্বিজয়ী বীরদের নিয়ে পড়াশোনা করা যায়, পাসের পর তা বেমালুম ভুলে যাই। কিন্তু শিল্পীর ছবি, কবির কবিতা বা প্রিয় উপন্যাস কখনো ভোলা যায় নাকি? যে গান, সানাই বা সরোদের সুর আমাদের প্রিয়, তা কখনো ভুলতে পারি আমরা?’

এই সাহিত্য সম্মেলনে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে প্রণব মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘যখন এ সাহিত্য সম্মেলনে আসার আমন্ত্রণ পাই, তখন মনে প্রশ্ন এলো—আমি তো লেখক নই, আমি পাঠক। আমি কেন? আমি তো স্রষ্টা নই। আমি তো দর্শক। তাহলে এই সাহিত্য সম্মেলনে আমি কেন? সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল, যখন একটা বড় বাড়ি তৈরি হয়, তখন অনেক মানুষ কাজ করে। একজন রাজমিস্ত্রি থাকেন। তাঁকে নানা কিছুর জোগান দিতে হয়। সেই হিসেবে বাংলা সাহিত্য সম্মেলনে আমি একজন জোগালি। সেই জোগালি হিসেবে, পাঠক হিসেবে এ সম্মেলনে উপস্থিত হয়েছি।’

নিজের পাঠক পরিচয় তুলে ধরে প্রণব মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে পড়াশোনার সময় বেশি পাইনি। চার দশক সংসদ সদস্য ছিলাম। ২৫ বছর মন্ত্রী ছিলাম। কাজের চাপে পড়ার সময় খুব একটা পাইনি। রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়ে দেখলাম প্রাসাদসম বিশাল ভবন। পরিসংখ্যানবিদদের মতে, ৩৩০টি কক্ষবিশিষ্ট এমন ভবন বিশ্বে আর কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের নেই। রাষ্ট্রপতি হলে কাজ করার সুযোগ কম। কাজ তো করেন প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা। রাষ্ট্রপতির কাছে প্রধানমন্ত্রী মাঝে মাঝে পরামর্শ চাইবেন। বছরে একবার সংসদ সদস্যদের ডেকে বক্তৃতা করব। ভারতে সরকার তৈরি হয় মানুষের ভোটে। দলও প্রধানমন্ত্রী ঠিক করে। রাষ্ট্রপতির কাজ হলো নৈবেদ্যর মণ্ডার মতো বসে থাকা। বছরে এক দিন বক্তৃতা করেন রাষ্ট্রপতি, যার ফুলস্টপ থেকে কমা পর্যন্ত পুরোটাই মন্ত্রিসভার তৈরি করে দেওয়া।’

প্রণব মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘তবে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিজেই একটি কাজ খুঁজে পেলাম। প্রচুর বই রয়েছে রাষ্ট্রপতি ভবনে। প্রচুর কাগজ, দলিল-দস্তাবেজও সেখানে। আছে ইতিহাসের প্রচুর উপাদান। যেসব পড়তে তিনটি প্রেসিডেন্সিয়াল টার্ম লাগবে। তো অত দিন তো সময় পাওয়া যাবে না। এর আগেই ঈশ্বর আমাকে ডেকে নেবে। বলবেন, এসো আমার কাছে। তাই আমি দেরি না করে পড়তে শুরু করলাম। রাষ্ট্রপতি হওয়ার সুযোগে অনেক বই পড়ার সুযোগ পেলাম।’

বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ববাংলা) মানুষ রক্ত দিয়ে বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে উল্লেখ করে প্রণব মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘শুধু একুশে ফেব্রুয়ারি নয়, যারা আন্দোলন করে বাংলা ভাষাকে রক্ষা করেছেন তাঁদের আমরা শ্রদ্ধা জানাই। গর্বের বিষয় একুশে ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পেয়েছে।’

ভাষা আন্দোলনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রণব মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের সেই শহীদদের কাছে আমরা ঋণী। আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসকে তাঁরা রক্ষা করেছেন। তাঁরাই এ দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে রক্ষা করেছেন। তাঁরা আগ্রাসনকারীদের হাতে ইতিহাসকে লুট হয়ে যেতে দেননি। সেই বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ভাষা সাহিত্য সম্মেলন হবে না তো কোথায় হবে?’

লেখক-সাহিত্যিকদের উদ্দেশে প্রণব মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘আসুন এই সংকল্প করি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা হিংস্রতার সব বিষবাষ্প থেকে বাঁচাব। এই হোক আজকের অঙ্গীকার।’

গতকাল বিকেল ৩টায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন প্রণব মুখোপাধ্যায়। তাঁকে অভ্যর্থনা জানান আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের আহ্বায়ক ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, প্রধান সমন্বয়ক নাসির উদ্দীন ইউসুফ ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান।

পরে প্রণব মুখোপাধ্যায় অনুষ্ঠান মঞ্চে আসীন হয়ে কৃতাঞ্জলিপুটে গ্রহণ করেন অভ্যাগতদের সংবর্ধনা। তাঁর সঙ্গে মঞ্চে আসেন বিশেষ অতিথি সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও ভারতের বরেণ্য চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, শামসুজ্জামান খান, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, ঝাড়খণ্ডের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী সরযূ রাই প্রমুখ।

সমাপনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে উপজীব্য করে লেখা স্বরচিত কবিতা ‘১০ জানুয়ারি ১৯৭২’ পাঠ করেন কবি কামাল চৌধুরী। এ মঞ্চ থেকে সম্মেলনের ঢাকা ঘোষণা পাঠ করেন সম্মেলনের সমন্বয়কারী নাসির উদ্দীন ইউসুফ। প্রণব মুখোপাধ্যায়কে উত্তরীয় পরিয়ে দেন সাহিত্য সম্মেলনের আরেক সমন্বয়কারী এ এস এম সামছুল আরেফিন। আর প্রণব মুখোপাধ্যায় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন।


মন্তব্য