kalerkantho


হকার উচ্ছেদ নিয়ে দ্বন্দ্ব

নারায়ণগঞ্জে আইভী সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষ আহত অর্ধশতাধিক

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি   

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নারায়ণগঞ্জে আইভী সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষ আহত অর্ধশতাধিক

নারায়ণগঞ্জে হকার বসানোকে কেন্দ্র করে নগর সংস্থার মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীর সমর্থকদের সঙ্গে উচ্ছেদকৃত হকারদের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী নিজে তাঁর সমর্থকদের নিয়ে হকার উচ্ছেদকালে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

এ সময় হকারদের ওপর পুলিশ গুলি করলে সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সমর্থকরা হকারদের পক্ষ নেয়। তখন ত্রিমুখী সংঘর্ষে পুরো বঙ্গবন্ধু সড়ক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। একপর্যায়ে পুলিশ শামীম ওসমানপন্থীদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। তখন সংসদ সদস্য শামীম ওসমান নিজেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।

বিকেল সোয়া ৪টা থেকে নগরীর বঙ্গবন্ধু সড়কের ২ নম্বর রেলগেট এলাকা থেকে চাষাঢ়া পর্যন্ত সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলা এ সংঘর্ষের সময় বঙ্গবন্ধু সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ সংঘর্ষ চলাকালে শতাধিক রাউন্ড রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে। সংঘর্ষে সাংবাদিক, হকারসহ উভয় পক্ষের কমপক্ষে অর্ধশত আহত হয়েছে।

সংঘর্ষের পর নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে গিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে মেয়র আইভী অভিযোগ করেছেন, তাঁকে হত্যা করতে শামীম ওসমানের নির্দেশে তাঁর লোকজন এ হামলা করেছে। তিনি নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বলেছেন, ‘প্রশাসনের পূর্ণ সহায়তায় এই হামলা হয়েছে।’

অন্যদিকে সংসদ সদস্য শামীম ওসমান বলেছেন, ‘প্রশাসন যদি আমার পক্ষে হতো তাহলে প্রশাসন হকারদের ওপর গুলি ছুড়ত না। আমি দৌড়ে গেছি একটাই কারণে, আমার পার্টির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আমাকে ফোন করে বলেছেন পরিস্থিতি শান্ত করতে। আমি না গেলে গণ্ডগোল আরো বড় হতো।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি পাগলও না, ছাগলও না। আর আমি বিএনপি দ্বারাও প্রভাবিত না। কারণ মেয়রের ডানে-বামে বিএনপিপন্থী কাউন্সিলররা ছিলেন। আমি সরকারি দলের সংসদ সদস্য। যদি এ রকম কিছু করার থাকে তাহলে আমি সরকারের ওপর মহলে কথা বলব।’

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ নিয়ে কয়েক দিন ধরেই সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। সর্বশেষ সোমবার বিকেলে সমাবেশ করে শামীম ওসমান ঘোষণা দেন, হকারদের পুনর্বাসনের আগে আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মঙ্গলবার বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত হকার বসবে। শামীম ওসমানের এই ঘোষণার পাল্টা জবাব দিতে গতকাল বিকেল ৪টার দিকে মেয়র আইভী নগর ভবন থেকে বের হয়ে পুলিশ বেষ্টনীর মধ্যে নগরীর বঙ্গবন্ধু রোডের ফুটপাত ধরে হাঁটতে শুরু করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ও মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মাকসুদুল আলম খন্দকার, ঠিকাদার ও জেলা আওয়ামী লীগের নেতা আবু সুফিয়ান, শহীদুল্লাহ, নগর সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কয়েক শ সমর্থক। শহরের ডিআইটি থেকে গ্রিন্ডলেজ মোড় পর্যন্ত ফুটপাতে হকাররা বসার প্রস্তুতি নিলে আইভী সমর্থকরা লাঠিসোঁটা নিয়ে তাদের পিটিয়ে তাড়িয়ে দিতে থাকে। একপর্যায়ে আইভী ও তাঁর সমর্থকরা নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে এসে ফুটপাতে বসা হকারদের ধাওয়া দিলে উচ্ছেদকৃত হকাররা একত্রিত হয়ে আইভী সমর্থকদের ধাওয়া দেয়।

ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার একপর্যায়ে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা হকারদের ওপর গুলিবর্ষণ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করেন। এই সুযোগে যুবদল নেতা কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার ও বিএনপি নেত্রী প্যানেল মেয়র বিভা হাসানের নেতাকর্মীরা ও আইভী সমর্থকরা হকারদের ওপর চড়াও হয়। এ সময় জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সুফিয়ানকে মেয়র আইভীর সামনেই হকারদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে দেখা গেছে। হকাররা এ সময় পিছু হটে শহরের চাষাঢ়া শহীদ মিনার এলাকায় অবস্থান নেয়। ওই সময় যুবলীগ নেতা নিয়াজুল ইসলামকে একা পেয়ে আইভী সমর্থকরা তাঁকে বেদম মারধর করে তাঁর লাইসেন্স করা অস্ত্র  ছিনিয়ে নিয়ে যায়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি জুয়েল হোসেন গেলে তাঁকেও মারধর করে আইভীপন্থীরা।

এ খবর ছড়িয়ে পড়লে আওয়ামী লীগের মহানগর কমিটির যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম, সাংগঠনিক সম্পাদক জাকিরুল আলম হেলাল, শহর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন সাজনুসহ যুবলীগ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছুটে এসে হকারদের পক্ষে অবস্থান নেয়। শুরু হয় দফায় দফায় সংঘর্ষ। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের জ্যেষ্ঠ নেতারাসহ কয়েক শ নেতাকর্মী চাষাঢ়া গোলচত্বরে অবস্থানকালে সেখানে উপস্থিত জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান কোনো কারণ ছাড়াই তাদের ওপর প্রায় ২৫-৩০ রাউন্ড গুলি ছোড়েন।

এ ঘটনার পর অদূরে থাকা রাইফেলস ক্লাব থেকে নেমে গোলচত্বরে চলে আসেন শামীম ওসমান। তাঁকে আসতে দেখে পুলিশ সরে যায়। তিনি লোকজন নিয়ে চাষাঢ়ায় হক প্লাজার সামনে অবস্থান নেন। তখন হকার ও লোকজন ঘটনার বিষয়ে শামীম ওসমানের কাছে নালিশ দিতে থাকে।

শামীম ওসমান তখন বলেন, ‘আমি এর বিচার আল্লাহকে দিব। আমাদের  নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছে। আমাদের প্রচুর লোকজনকে মেরে আহত করা হয়েছে। আমরা আইন নিজের হাতে তুলে নিই নাই।’

নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শরফুদ্দিন বলেন, মেয়র আইভী সমর্থকদের সঙ্গে হকারদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফাঁকা গুলি ছুড়েছে।


মন্তব্য