kalerkantho


বিডিএফ বৈঠক শুরু আজ

প্রতিশ্রুতি পূরণের চিত্র উন্নয়ন সহযোগীরা জানতে চাইবে

আলোচনায় আসবে সুশাসন ও মানবাধিকার

আরিফুর রহমান   

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



তিন বছর আগে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের (বিডিএফ) বৈঠকে উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থগুলোর সঙ্গে সরকার যে যৌথ ইশতেহার ঘোষণা হয়েছিল, সেখানে উল্লেখ ছিল, ধীরে ধীরে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের দিকে হাঁটবে সরকার। বলা হয়েছিল, সরকার প্রতিবছর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেটে বরাদ্দ বাড়াবে। কিন্তু বাস্তবতা দিচ্ছে ভিন্ন চিত্র। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বাজেট তো বাড়েইনি; উল্টো কমেছে। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশেই স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ সবচেয়ে কম। এমন বাস্তবতায় তিন বছর পর আবার উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছে সরকার। রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে দুই দিনব্যাপী বিডিএফ বৈঠক শুরু হবে আজ। সভার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৩৬ দেশের ৭০০ প্রতিনিধি যোগ দিচ্ছেন এবারের বৈঠকে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে কি না, সেসব বিষয়ে জানতে চাইবে উন্নয়ন সহযোগীরা।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অতিরিক্ত সচিব মনোয়ার আহমেদ বলেন, ‘অগ্রগতি বেশ ভালো। যৌথ ইশতেহারে উল্লেখ করা বিষয় সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিডিএফ বৈঠকে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মধ্যবর্তী মূল্যায়ন তুলে ধরা হবে’। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছেন, এবারের বিডিএফ বৈঠকে জাতিসংঘ ঘোষিত ১৫ বছর মেয়াদি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি বাস্তবায়নে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে সহযোগিতা চাইবে বাংলাদেশ। তাঁর মতে, এসডিজি বাস্তবায়নে অর্থায়নই প্রধান চ্যালেঞ্জ।

পরিকল্পনা কমিশনের গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০৩০ সাল নাগাদ এসডিজি (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস-টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) বাস্তবায়নে স্থিরমূল্যে বাড়তি ৯২৮ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে।

বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ সাত লাখ কোটি টাকারও বেশি। বিশাল এই চাহিদার মধ্যে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ১৫ শতাংশ অর্থ চাইছে বাংলাদেশ। তবে এসডিজিতে অর্থায়নের বিষয়ের বাইরে আরো অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনার আভাস মিলেছে ইআরডি থেকে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সূত্র বলছে, এবারের বৈঠকে আলোচনায় উঠে আসবে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি। ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সড়ক কতটা উন্নতি হয়েছে; আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার অবস্থা, দুর্নীতি দমন বিষয়ে হওয়া অগ্রগতি—সরকারি বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি কতটা কার্যকর—এসব বিষয় জানতে চাইবে উন্নয়ন সহযোগীরা। সুশাসন কতটুকু নিশ্চিত হয়েছে, দুর্নীতি কতটা কমেছে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে বিভিন্ন কর্ম অধিবেশনে। সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে শোভন চাকরি, বাল্যবিয়ে বন্ধ, নারীদের প্রতি সহিংসতা কতটা বন্ধ হয়েছে তা নিয়েও জানতে চাইবে উন্নয়ন সহযোগীরা।

তবে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত অর্থায়ন মেলেনি এমন অভিযোগ আছে সরকারি কর্মকর্তাদের তরফ থেকে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় উন্নয়ন সহযোগীরা যতটুকু সহায়তা দেওয়ার কথা সেটিও দেয়নি।

২০১৫ সালের বিডিএফ বৈঠকে নারীর ক্ষমতায়নের দিকে বিশেষ নজর দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। গত তিন বছর নারীর ক্ষমতায়ন যে হয়নি, তা স্বীকার করেছেন অর্থমন্ত্রী নিজেও। দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা দিন দিন বাড়ছে। শহর কিংবা গ্রামে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে অহরহ। নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ জানিয়ে আসছে আইন ও সালিশ কেন্দ্রসহ অনেক বেসরকারি সংস্থা।

উন্নয়নকর্মীদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে নারীদের প্রতি সহিংসতা বন্ধ হচ্ছে না। শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি রয়েছে সরকারের। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ বলছে, দেশে এখন মাত্র ৩৫.৬ শতাংশ নারী শ্রমশক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত। কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ আশানুরূপ হারে বাড়ছে না। সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল শেষ বিডিএফ বৈঠকে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে কার্যকর ভূমিকা রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল সে সময়ে।

সরকার দুই বছর আগে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শতভাগ বেতন বাড়িয়েছে। সরকার আশা করেছিল, দুর্নীতি কিছুটা কমবে। কিন্তু দুদকের জালে প্রতিদিন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী যেভাবে জড়াচ্ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে দুর্নীতির মাত্রা বরং বেড়েছে। বেতন বাড়ানোর পরও যে দুর্নীতি বেড়েছে, সে বিষয়ে নজরে এসেছে অর্থমন্ত্রীর।

ইআরডি বলছে, বৈঠকে আটটি কর্ম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে— প্রতিদিন চারটি করে। প্রথম দিন কৃষি খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ ও বেসরকারি খাতকে আরো বেশি করে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে কী করণীয় সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা তাঁদের মতামত জানাবেন। দ্বিতীয় দিনে নারী নির্যাতন রোধ, নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা, নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন, শহরমুখী গ্রামীণ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণে প্রতিবন্ধকতা এবং এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে অর্থায়ন নিশ্চিত ও অংশীদারত্বকে শক্তিশালীকরণ নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হবে।


মন্তব্য