kalerkantho


উন্নয়ন ফোরামের বৈঠকে বক্তারা

নীতির সংস্কার ও আয় বৈষম্য কমাতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নীতির সংস্কার ও আয় বৈষম্য কমাতে হবে

বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনে সঠিক পরিকল্পনা ও নীতির সংস্কার আনার পরামর্শ দিয়েছেন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা। তাঁরা এও বলেছেন, আয় ও সম্পদের বৈষম্য যেভাবে বাড়ছে, তাতে এখনই লাগাম টেনে ধরতে হবে। সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কতটুকু নিশ্চিত করা হচ্ছে, সেটি নিয়েও কথা বলেছেন কেউ কেউ। গতকাল বুধবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের (বিডিএফ) বৈঠকের প্রথম দিনের এক অধিবেশনে এসব মতামত তুলে ধরেন প্রতিনিধিরা। অধিবেশনে উঠে এসেছে আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়টি। এ ছাড়া শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে বলেছেন বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের চেয়ারম্যান স্যার ফজলে হাসান আবেদ।

অধিবেশন সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান, জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক মিয়া সিপো, ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি চিমিয়াও ফান, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়েনচাই ঝ্যাং, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত রেনসজে তারনিক প্রমুখ।

অধিবেশনে ‘সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এসডিজি বাস্তবায়ন, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শিরোনামের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম। প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, গত কয়েক বছরে দেশে সরকারি বিনিয়োগ বাড়লেও বেসরকারি বিনিয়োগ তেমন বাড়েনি। এটি এখনো মোট জিডিপির ২৩ শতাংশের মধ্যে। এটি বাড়ানো জরুরি।

চিমিয়াও ফান বলেন, বাংলাদেশে এক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। দারিদ্র্য বিমোচন হচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে অসমতা বাড়ছে। আশানুরূপ কর্মসংস্থানও হচ্ছে না। বেসরকারি বিনিয়োগের চিত্র সন্তুষ্ট হওয়ার মতো নয়। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রবৃদ্ধি অর্জন ও কর্মসংস্থানে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে নীতিতেও সংস্কার আনা জরুরি। পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, সেটিও কঠোর নজরদারিতে আনতে হবে। তিনি বলেন, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কিংবা জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আদায়ের হার বাড়াতে হবে বাংলাদেশকে। এর পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি বা পিপিপিকেও কার্যকর করতে হবে।

গত শনিবার বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডিও এক সংবাদ সম্মেলনে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে অসমতা কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছিল। সংস্থাটির মতে, বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেও ধনী-গরিবের বৈষম্য কমেনি। প্রবৃদ্ধির গুণগত মানের অভাবে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে বলেও অভিমত তাদের।

জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক মিয়া সিপোও তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে অসমতা কমিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন জনসংখ্যার বোনাসকাল ভোগ করছে। এই সুযোগ একবারই আসে। বাংলাদেশকে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে।

এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়েনচাই ঝ্যাং বলেন, প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চাইলে আঞ্চলিক যোগাযোগের কোনো বিকল্প নেই। আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়াতে এডিবি সহযোগিতা দিয়ে আসছে। ভবিষ্যতে আরো সহযোগিতা দেওয়া হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। নতুন নতুন প্রযুক্তির দিকে হাঁটতে হবে। ওয়েনচাই ঝ্যাং বলেন, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের চিত্র ভালো নয়। আর বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে হলে নীতির সংস্কারের পরামর্শ তাঁর।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত রেনসজে তারনিক বলেন, বাংলাদেশের জন্য এখন জরুরি পণ্যের বৈচিত্র্য আনা। রপ্তানি বাজারে শুধু পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকলে হবে না। পণ্যের নতুনত্ব আনতে হবে। একই সঙ্গে সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

ফজলে হাসান আবেদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, দেশে প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান এখনো অনেক পিছিয়ে। ক্লাসরুম, শিক্ষা পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।

সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান বলেন, ‘সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি (এপিএ) করা হচ্ছে। বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও আইন বিভাগ আলাদা স্বাধীনভাবে কাজ করছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে দুর্নীতি দমন কমিশন তাদের ভূমিকা রেখে চলেছে। মানবাধিকার কমিশনও তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে। সিএজি অফিস তাদের দায়িত্ব পালন করছে।’ সব মিলিয়ে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর বলেও জানান তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী নিজেও স্বীকার করে বলেন, ‘দেশে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে অসমতা প্রকট। এটা সিরিয়াস সমস্যা। শিক্ষায় গুণগত মান নিশ্চিতের বিষয়ে আবেদ সাহেব যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তাঁর সঙ্গে আমিও একমত। শিক্ষার মান বাড়াতে হবে।’ অর্থমন্ত্রী বলেন, পণ্যের বৈচিত্র্য আনা, জনসংখ্যার বোনাসকালকে কাজে লাগানো, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য সরকার ৯ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে।

বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানো নিয়ে দিনের আরেক অধিবেশনে বক্তারা বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো। আর বিনিয়োগ বাড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি। এ ক্ষেত্রে শুধু প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না, বিভিন্ন খাতে কার্যকর সংস্কার আনতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ তারেক, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী আমিনুল ইসলাম, পররাষ্ট্রসচিব মো. শহিদুল হক, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশনের সিনিয়র ইকোনমিস্ট ড. এম মাসরুর রিয়াজ ও মেট্রোপলিটন চেম্বারের সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবির।

ড. মোহাম্মদ তারেক বলেন, ‘অর্থনীতির একজন ছাত্র হিসেবে আমি বলতে পারি যে অর্থনৈতিক সার্বিক উন্নয়নে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ জরুরি। আর এই বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ব্যক্তিগত উদ্যোগ, মানবিক উন্নয়ন এবং সামাজিক উন্নয়ন জরুরি।’ তিনি বলেন, ‘বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য ওয়ানস্টপ সার্ভিস জরুরি।’


মন্তব্য