kalerkantho


প্রদর্শনী

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আনা ফ্রাংক

রেজাউল করিম   

২১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আনা ফ্রাংক

আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে প্রদর্শিত আনা ফ্রাংকের ডায়েরি দেখছেন অতিথিরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঠিক তেরো বছর বয়সে ডায়েরি লিখতে শুরু করেছিল এক কিশোরী। এরপর দুই বছর দুই মাস। পনেরো বছর দুই মাস বয়সী কিশোরী শেষ আঁচড় টেনেছিল তার ডায়েরির পাতায়। এর ঠিক সাত মাস পর এই পৃথিবীর জল-মাটি-হাওয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছিল সেই কিশোরীর। কিন্তু এক ডায়েরির কারণে সে আজও বেঁচে মানুষের হৃদয়ে। তার দুই বছর দুই মাসের এই দিনলিপি সারা বিশ্বে আজও এক নামে পরিচিত—‘আনা ফ্রাংকের ডায়েরি’। আনার স্বপ্ন ছিল লেখক হওয়ার। কিন্তু পনেরো বছর বয়সেই স্বপ্নের সঙ্গে সঙ্গে জীবনেরও ইতি টানতে হয় তাকে। কিন্তু আনা তার মতো কিশোরীদের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়ে গেছে। শিখিয়ে গেছে প্রাণবন্ত হয়ে বেঁচে থাকার পথ।

গতকাল শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে শুরু হয়েছে আনার সেই ডায়েরির প্রদর্শনী। সাত দিনব্যাপী চলমান এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী ও বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত লিওনি কুলেনার। নেদারল্যান্ডস ও বাংলাদেশ দূতাবাসের অর্থায়নে এবং বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও কাউন্টার ফটোর সহযোগিতায় এ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। আনা ফ্রাংকের ডায়েরি ও ছবি নিয়ে বিশ্বব্যাপী ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে এটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা বাংলাদেশে দ্বিতীয়বার।

জাদুঘরের পঞ্চম তলায় এই প্রদর্শনী চলছে। ২৯টি পোস্টারের ওপর আনার ডায়েরির পাতাগুলো তুলে ধরা হয়েছে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায়। ওই পোস্টারগুলোতে আনার ব্যক্ত করা সব কথা উঠে এসেছে। এই প্রদর্শনী শুরুর আগে আনার জীবনী নিয়ে একটি ভিডিও চিত্র দেখানো হয়।

পোস্টারগুলোতে তুলে ধরা আনার ডায়েরির পাতায় উল্লেখ করা হয়, আনার বাবার নাম অটো ফ্রাংক। জার্মানির বাসিন্দা তাঁরা, ধর্মে ইহুদি। আনার জন্ম ১৯২৯ সালের ১২ জুন।

ঠিক তখনি জার্মানির মাটিতে মাথা তুলেছেন হিটলার, সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে তাঁর নািস বাহিনী। ইহুদি উচ্ছেদের জোরালো ঘোষণা দিয়েছে তারা। অনেক ইহুদি জার্মানি ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্য কোনো দেশে, নিরাপদ অশ্রয়ের সন্ধানে। আনা ফ্রাংক তখন চার বছরের শিশু। এর ছয় বছর পর শুরু হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। বিশ্ব দখলের স্বপ্নে বিভোর হিটলার। আনার পরিবারও আশ্রয় নিল নেদারল্যান্ডসে।

ডায়েরিতে উঠে এসেছে, নেদারল্যান্ডসের অশ্রয় আর নিরাপদ রইল না। ১৯৪১ সালে হিটলারের নািস বাহিনী নেদারল্যান্ডস দখল করল। শুরু হলো ইহুদিদের ওপর অকথ্য নির্যাতন। অসংখ্য ইহুদিকে পাঠানো হলো বন্দিশিবিরে। ১৯৪২ সালে সমন এলো আনার বাবা অটো ফ্রাংকের নামে। সেই ডাকে সাড়া দিলেন না। এক গোপন আস্তানায় আশ্রয় নিলেন সপরিবারে। সঙ্গে রইল আরেকটি পরিবার। আনা ফ্রাংক তখন ১৩ বছর এক মাসের কিশোরী। ২৫ মাস পর ১৯৪৪ সালের ৪ আগস্ট আনাদের গোপন আস্তানায় হানা দিয়েছিল নািস বাহিনী। আনার পরিবারের সদস্যসহ আটজনকে আটক করে হিটলারের বাহিনী। জার্মানির আউশভিৎস বন্দিশিবিরে ১৯৪৫ সালের ৬ জানুয়ারি মারা যান আনার মা। আনা, তার বড় বোন ও বাবাকে পাঠানো হয় আরো দূরবর্তী বন্দিশিবিরে। বড় বোনের মৃত্যুর পর বন্দিশিবিরে মারা যায় আনা ফ্রাংক। তখন তার বয়স হয়েছিল ১৫ বছর ৯ মাস। বাবা অটো ফ্রাংকই শুধু বেঁচে যান? তাঁর উদ্যোগেই ১৯৪৭ সালে প্রথমে ডাচ ভাষায় গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয় আনা ফ্রাংক ডায়েরি?

১৯৫২ সালে যুক্তরাষ্ট্রেও ইংরেজিতে প্রকাশিত হয় বইটি। এ পর্যন্ত ৬০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে ‘দ্য ডায়েরি অব আনা ফ্রাংক’? এই ডায়েরির মাধ্যমে বহু মানুষের হৃদয়ে আজও বেঁচে আছে আনা ফ্রাংক।

১৯৪৪ সালের ৪ আগস্ট যখন আনাদের গোপন আস্তানার সবাই গ্রেপ্তার হয়, তখন মৃত্যু যেন আগে থেকে নির্ধারিতই ছিল। তারও এক বছর পর যখন শুধু আনার বাবা অটো ফ্রাংক বাদে বাকিদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত, তখন অটো ফ্রাংক তাঁর মেয়ের ডায়েরিটি পান। অটো ফ্রাংকের হাত ধরেই আনা ফ্রাংকের ডায়েরি বই আকারে প্রকাশিত হয়।

‘১৯৪৪ সালে মৃত্যুর প্রায় ৭০ বছর পরও আনা ফ্রাংক কী আশ্চর্য প্রাসঙ্গিক’ এ কথা উল্লেখ করে গতকালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, দুনিয়াজুড়ে এখন ১৫ জুলাই, ডায়েরি আর আনা ফ্রাংক যেন সমার্থক। আনা ফ্রাংক নামের দূর ইউরোপের এই কিশোরী পরিচিতি পেয়েছে বাংলাদেশজুড়েও। স্কুলপড়ুয়া ছেলে-মেয়েরাও জানে আনার কথা। গোপন আস্তানায় পালিয়ে থাকার সময় আনার একমাত্র বন্ধু হয়ে উঠেছিল তার প্রিয় ডায়েরিটি।


মন্তব্য