kalerkantho


মধু মেলা

উৎসবমুখর সাগরদাড়ি

নূরুল ইসলাম খান, কেশবপুর (যশোর)   

২২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



উৎসবমুখর সাগরদাড়ি

মধু মেলায় নানা উপকরণের পসরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

উৎসবে মেতেছে সাগরদাঁড়ি। বিশাল মাঠজুড়ে বসেছে নানা ধরনের পণ্যের পাঁচ শতাধিক স্টল। এতে সাজানো রয়েছে বাহারি আকারের দানাদার, মুড়কি, গজা, জিলাপিসহ নানা মিষ্টান্ন। পাশাপাশি রয়েছে ভাজা, চটপটি, সনপাপড়ি, ভাপা পিঠা, তন্দুরের স্টল। স্থান পেয়েছে গৃহস্থালি নানা জিনিসও। আর সেসব স্টল ঘিরে ভিড় জমিয়েছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। পুরো আয়োজন মুখর শিশু-কিশোরদের আনন্দ-কোলাহলে।

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্ম ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি, যশোরের কেশবপুরের সাগরদাড়িতে। সে হিসাবে তাঁর ১৯৪তম জন্মবার্ষিকী আগামী ২৫ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার। দিনটিকে উপলক্ষ করে প্রতিবছরই এখানে আয়োজন হয়ে আসছে মধু মেলা। ব্যতিক্রম হয়নি এবারও। সাগরদাঁড়িতে বসেছে ছয় দিনব্যাপী মেলা। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত এই মেলা গতকাল রবিবার উদ্বোধন করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

সারা দেশ থেকে কবির ভক্ত-অনুরাগীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আসছে মুধ মেলায়। তারা ঘুরে ঘুরে দেখছে মহাকবির স্মৃতিবিজড়িত নানা স্থান আর স্থাপনা। ভিড় জমাচ্ছে মেলা প্রাঙ্গণে। এর মধ্য দিয়ে শুরুর দিনই এই আয়োজন রূপ নিয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের প্রাণের মেলায়।

মেলার মাঠে মিষ্টির স্টল বসিয়েছেন সাতক্ষীরার তপন কুমার নন্দী। তাঁর স্টলে বাহারি দানাদার, গজা, জিলাপি, রসগোল্লা ও লম্বা ন্যালস্য নামীয় মিষ্টি কিনতে ক্রেতারা ভিড় করছে। তপন বলেন, সাধারণত মেলার শেষের দিকে মিষ্টিজাতীয় খাবার বেশি বিক্রি হয়ে থাকে। তবে এবার শুরুর দিনেও দেদার মিষ্টি বিক্রি হচ্ছে।

খুলনা থেকে এসে মেলার মাঠে পান্ডার স্টল বসিয়েছেন আল-আমীন। তাঁর স্টল ঘিরে শিশু-কিশোররা আনন্দে মেতেছে। ওই স্টলে কথা হয় কপোতাক্ষ নদের ওপার শার্শা গ্রাম থেকে আসা শিশু ইমন সিংহ, প্রিয়াম দাস, প্রিয়ান্ত দাস, সাগর হোসেন ও রাকিবের সঙ্গে। তারা জানাল, মেলা ঘুরে দেখে বিকেলে মধু মঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখে সবাই বাড়ি ফিরবে।

মেলার মাঠে কথা হলো কেশবপুর পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র শামিমের সঙ্গে। সে জানাল, মেলায় মধু মঞ্চের আলোচনা শোনার জন্য এসেছে সে। কপোতাক্ষের ওপারের শার্শা গ্রাম থেকে আসা গৃহবধূ রাখী রানী দাস বলেন, ‘মেলায় স্বাধীনভাবে ঘোরাঘুরি করা যাচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও খুবই ভালো। নানা ধরনের আয়োজন থাকায় মধু মেলা ব্যাপকভাবে টানছে মানুষকে। সার্কাস, মধু মঞ্চে উন্মুক্ত যাত্রা, নাটক, আবৃত্তিসহ সাংস্কৃতিক নানা অনুষ্ঠান যথেষ্টই উপভোগ্য। এ ছাড়া মেলায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় মধুকবির জীবন ও সাহিত্যের ওপর বিষয়ভিত্তিক আলোচনারও আয়োজন রয়েছে।’

কেশবপুরের মূলগ্রাম থেকে আসা লুৎফর রহমান জানালেন, মধু মঞ্চে অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান তাঁকে মুগ্ধ করেছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে যশোর সদর থেকে এসেছেন আকাম আলী। সঙ্গে আসা মিতু, ঋতু, জিনিফা, জিম ও জাকির বলেন, কবির স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থান ঘুরে খুব ভালো লেগেছে। তবে মেলায় জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি।

মেলায় বইয়ের স্টল বসেছে ১০টি। মধুসূদন দত্তের ম্যুরালের পাশে আমগাছতলায় বসা বইয়ের স্টলের মালিক মতিয়ার রহমান জানান, বইয়ের বিক্রি ভালো হচ্ছে। সাগরদাঁড়ি আবু শারাফ সাদেক কারিগরি বাণিজ্য মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) শ্যামল কুমার ঘোষ বলেন, ‘মেলাকে উপলক্ষ করে মধুভক্ত দর্শনার্থীর আগমনে সাগরদাঁড়ি মুখর হয়ে উঠেছে।’

সাগরদাঁড়ির মধুসূদন একাডেমির পরিচালক কবি খসরু পারভেজ বলেন, ‘মেলা উপলক্ষে মধু মঞ্চের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও রাতে উন্মুক্ত যাত্রাপালা আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। মধু মেলার পরিবেশ খুবই পরিচ্ছন্ন। আগত হাজারো ভক্ত মধুকবির স্মৃতিবিজড়িত কপোতাক্ষ নদের বিদায় ঘাট, বুড়ো কাঠবাদামগাছতলা, জমিদারবাড়ির আম্রকাননসহ মধুপল্লী ঘুরে যেন তাদের প্রিয় কবিকেই খুঁজে ফিরছেন।’

সাগরদাঁড়িতে জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর কেয়ারটেকার শাহাজাহান আলী বলেন, ‘সকাল থেকে ভক্ত-দর্শনার্থীরা সাগরদাঁড়িতে হাজির হয়ে আনন্দে মেতেছেন। কপোতাক্ষ নদের পারে গিয়ে দেখা যায়, অনেক ভক্ত সাম্পানে উঠে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কপোতাক্ষের বুকে।

সাগরদাঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুল ইসলাম মুক্ত জানান, মেলায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই ভালো। শুরুর দিনেই হাজার হাজার মধুভক্ত দর্শকের আগমন ঘটেছে সাগরদাঁড়িতে। আগামী ২৬ জানুয়ারি মেলার শেষ দিন পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা যায়।


মন্তব্য