kalerkantho


রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হচ্ছে

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

২৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হচ্ছে

ফাইল ছবি

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করা যাচ্ছে না। আজ মঙ্গলবার থেকেই রোহিঙ্গাদের প্রথম দলের মিয়ানমারের উদ্দেশে বাংলাদেশ ছাড়ার কথা ছিল। তবে প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়ায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হতে কিছুটা দেরি হবে। শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁরা কাজ শুরু করেছেন। প্রকৃত প্রত্যাবাসন শুরু করতে আরো সময় লাগবে।

আবুল কালাম বলেন, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে তিনটি ধাপে ভাগ করা হলে প্রথম ধাপেই থাকবে চুক্তি বা কাঠামো সৃষ্টি করা। সেটি ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপের কাজটি হলো কাঠামো অনুযায়ী মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি। গত ১৬ জানুয়ারি এ বিষয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে সমঝোতার পর এখন প্রস্তুতি চলছে। তৃতীয় ধাপ হলো প্রকৃত প্রত্যাবাসন বা রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়া শুরু করা। দ্বিতীয় ধাপ শেষে সেটিও শুরু হবে।

মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের কাছে একটি তালিকা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

গত সপ্তাহে নেপিডোতে বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডাব্লিউজি) প্রথম বৈঠক শেষে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছিল, তারা ২২ জানুয়ারিই প্রথম দফায় ৭৫০ জন মুসলমান ও ৫০৮ জন হিন্দু রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে চায়। মিয়ানমার সরকার ইতিমধ্যে তাদের তথ্য যাচাই-বাছাই করেছে। প্রত্যাবাসনের জন্য প্রথম দলে তাদের রাখতে মিয়ানমার বাংলাদেশকে অনুরোধ করেছিল।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গত সপ্তাহে মিয়ানমারের সঙ্গে সমঝোতা অনুযায়ী বাংলাদেশ এ দেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের পরিবারভিত্তিক তালিকা তৈরি করে নেপিডোকে দেবে। মিয়ানমার সেগুলো যাচাই-বাছাই করে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেবে। নতুন করে রোহিঙ্গারা যাতে বাংলাদেশে না আসে সে বিষয়ে উদ্যোগ নেবে বলেও মিয়ানমার গত সপ্তাহের বৈঠকে অঙ্গীকার করেছে।

ঢাকায় বিদেশি কূটনীতিকরা গত রবিবার স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের তাগিদ দিয়েছেন। জাতিসংঘ মনে করে, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফেরার মতো অনুকূল পরিবেশ এখনো সৃষ্টি হয়নি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীও বলেছেন, কাউকে জোর করে ফেরত পাঠানো হবে না। আজ মঙ্গলবার সীমান্তের শূন্য রেখায় থাকা রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হতে পারে।

জানা গেছে, ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে গত বছরের ২৪ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। গত বছরের ২৫ আগস্ট নতুন করে হামলা শুরুর পর থেকে এ যাবৎ আশ্রয় নিয়েছে ছয় লাখ ৮৮ হাজার রোহিঙ্গা। ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসের আগে থেকে বাংলাদেশে মিয়ানমারের তিন লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছিল। সে হিসাবে বাংলাদেশে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখের বেশি হলেও এবার প্রত্যাবাসনের আগ্রহ প্রকাশ করতে পারবে প্রায় সাত লাখ ৭৫ হাজার রোহিঙ্গা। তাদের মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার শিশু আছে যারা অনাথ বা বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা জাতিসংঘ দূতের : রোহিঙ্গাদের ফেরার মতো অনুকূল পরিস্থিতি মিয়ানমারে নেই বলে মনে করেন মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতিবিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার (বিশেষ দূত) ইয়াংহি লি। প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ জানানোর পাশাপাশি তিনি আগামী কয়েক মাসে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে মানবিক পরিস্থিতিরও অবনতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। গত রবিবার কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা শিবিরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ আশঙ্কা ও উদ্বেগ জানান।  ইয়াংহি লি বলেন, ‘প্রথমত, তারা (রোহিঙ্গারা) কোথায় ফিরে যাবে? তারা তাদের জীবিকা, ফসল ও ফসলি জমি হারিয়েছে।’

ইয়াংহি লি বলেন, ‘তাদের সব ধান অন্যত্র বিক্রি করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। তারা তাদের বাড়িঘর হারিয়েছে। তাই পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়াটিও হবে বিশাল। আর জনগণকে আরেকটি শিবিরের মতো পরিস্থিতিতে থাকতে বাধ্য করা উচিত হবে না।’

বালুখালী রোহিঙ্গা শিবির প্রসঙ্গে ইয়াংহি লি বলেন, ‘বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুম আসছে। লোকজনে ঠাসা এ শিবিরটি ভূমিধসের শিকার হবে এবং এর ফলে আমাদের বিপুলসংখ্যক লোকের হতাহত হওয়াও দেখতে হতে পারে।’

সু চির নয়াদিল্লি সফরেও রোহিঙ্গা ইস্যু : আসিয়ান-ভারত স্মারক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চিসহ আসিয়ান নেতারা ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি যাচ্ছেন। আগামী বৃহস্পতিবার ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি পরদিন শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেবেন তিনি।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, সম্মেলনের ফাঁকে সু চির সঙ্গে অন্য নেতাদের আলাদা বৈঠকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সাধারণত এ ধরনের বৈঠকে নেতারা গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকারমূলক আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেন। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আসিয়ান সদস্য দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তারা যেমন এ সংকটের বিষয়ে জানতে চাইতে পারেন, তেমনি মিয়ানমারও সংকট সমাধানে তাদের প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরতে পারে।

ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো ভারত সফর শেষে বাংলাদেশে আসবেন। দুই দিনের সফরে আগামী শনিবার তাঁর ঢাকায় পৌঁছার কথা রয়েছে। ওই সফরেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার প্রচেষ্টার পাশাপাশি রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে। তিনি রোহিঙ্গা শিবিরও পরিদর্শন করতে পারেন।


মন্তব্য