kalerkantho


বাংলাদেশি হচ্ছেন সেই লুসি হল্ট

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বাংলাদেশি হচ্ছেন সেই লুসি হল্ট

৫৮ বছর ধরে এ দেশের মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই সহকর্মীরা ফিরে গেছেন জন্মভূমিতে। কিন্তু তিনি যাননি; জীবনের মায়া তুচ্ছ করে সেবা-শুশ্রূষা করেছেন যুদ্ধাহতদের। তাঁর দীর্ঘদিনের চাওয়া এ দেশের নাগরিক হয়ে এ দেশের মাটিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার। এ জন্য বেশ কয়েকবার আবেদন করেও বিফল হয়েছেন; তবু এ দেশ, মানুষ ও প্রকৃতি ভালোবেসে থেকে গেছেন। অবশেষে মানবদরদি সেই ব্রিটিশ নাগরিক লুসি হেলেন ফ্রান্সিস হল্টকে নাগরিকত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

৮৭ বছর বয়সী লুসি হল্ট বর্তমানে বরিশাল নগরের অক্সফোর্ড মিশনে দুস্থ শিশুদের অবৈতনিক শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। বরিশালের জেলা প্রশাসক মো. হাবিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে গতকাল সোমবার আন্ত মন্ত্রণালয় বৈঠকে লুসি হল্টকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। খুব দ্রুতই নাগরিকত্বের কাগজপত্র হাতে পাবেন তিনি।

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘বাংলাদেশে লুসির জন্ম নয়, নেই রক্তের কোনো বন্ধনও। তবু অদ্ভুত এক বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন বাংলাদেশের সঙ্গেই। ৫৮ বছর ধরে আছেন এ দেশে। হয়েছেন মহান মুক্তিযুদ্ধের নিভৃতচারী নীরব সাক্ষী। ভিনদেশি হলেও মন ও মননে যেন বাঙালি। বাঙালিদের মতোই শাড়ি পরেন। আর এ বিদেশিনী মরতেও চান বাংলাদেশে, বরিশালে।’

জেলা প্রশাসক আরো বলেন, ‘লুসির সঙ্গে একাধিকার দেখা হয়েছে, কথাও হয়েছে। সব সময়ই তিনি শেষ ইচ্ছার কথা বলতেন। যেটা আমার মানবিকতাকে বেশ নাড়া দিয়েছিল। সেই বিবেচনায় নিজ উদ্যোগে তাঁর ভিসা ফি মওকুফের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখেছি। তারা লুসির ১৫ বছরের ভিসা ফি মওকুফ করেছে। সেই ভিসা গত ৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরিশাল সফরে এসে লুসির হাতে তুলে দিয়েছেন। তখনো লুসি তাঁর শেষ ইচ্ছার কথা প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছিলেন।’

নাগরিকত্ব বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়ে অনুভূতি জানতে চাইলে লুসি হল্ট গতকাল বিকেলে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি খুবই খুশি। বিষয়টি আমার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। আমার শেষ ইচ্ছা এই দেশের মাটিতেই সমাহিত হওয়া। জন্ম-মৃত্যুর বিষয়ে ঈশ্বর ছাড়া কেউ জানেন না, তবে যে কদিন বাঁচব, সেই কদিন গরিবদের পাশে থেকে বাঁচতে চাই। এই সরকার আমার সকল দাবি পূরণ করেছে। এ জন্য আমি কৃতজ্ঞ।’

লুসি হল্টের জন্ম যুক্তরাজ্যের সেন্ট হ্যালেন্সে ১৯৩০ সালের ১৬ ডিসেম্বর। বাংলাদেশের বিজয় দিবসও ১৬ ডিসেম্বর; সালটা শুধু ভিন্ন, ১৯৭১। এ বিষয়ে লুসি বলেন, ‘কাকতালীয় হলেও বিষয়টি আমাকে খুব ভাবায়। হয়তো এটা ঈশ্বরেরই ইচ্ছা। বাংলাদেশের সঙ্গে আমার জীবনের একটা গভীর যোগসূত্র রয়েছে।’

লুসির বাবা জন হল্ট ও মা ফ্রান্সিস হল্ট। দুই বোনের মধ্যে ছোট লুসি। তাঁর বড় বোন রুৎ অ্যান রেভা ফেলটন; স্বামী ও তিন ছেলে নিয়ে ব্রিটেনেই বসবাস করেন। লুসি ১৯৪৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিক (দ্বাদশ) পাস করেন। ১৯৬০ সালে তিনি বাংলাদেশে আসেন এবং যোগ দেন বরিশাল অক্সফোর্ড মিশনে। এখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের পড়াতেন। সেই থেকে ৫৮ বছর ধরে ঘুরেফিরে তিনি কাজ করেছেন যশোর, খুলনা, নওগাঁ, ঢাকা ও গোপালগঞ্জে। ২০০৪ সালে অবসরে যান লুসি। ওই বছরই তিনি ফিরে আসেন বরিশালের অক্সফোর্ড মিশনে। বরিশাল অক্সফোর্ড মিশন প্রাঙ্গণে টিনের ছোট্ট একটি ঘর। পুরনো, জরাজীর্ণ। বারান্দার এক অংশে লুসির থাকার ব্যবস্থা। সেখানে আসবাব বলতে ছোট একটি কাঠের চৌকি, কাঠের ছোট দুটি টেবিল। পাশে একটি তাকে কিছু বই ও পুরনো ডায়েরি সাজিয়ে রাখা।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সিস্টার লুসি যশোর ক্যাথলিক চার্চে শিশুদের ইংরেজি পড়াতেন। যুদ্ধ শুরু হলে চার্চটি বন্ধ করে মিশনের সবাই খুলনায় নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। কিন্তু লুসি পালিয়ে যাননি। নিজের জীবন বিপন্ন হতে পারে জেনেও তিনি ছুটে যান পাশের ফাতেমা হাসপাতালে। সেখানে অসংখ্য আহত বেসামরিক নারী, পুরুষ, শিশুর কান্না-আহাজারিতে তাঁর হৃদয় কাঁদছিল। তিনি হাসপাতালে গেলেন এবং অসহায় মানুষকে সেবা দিতে চাইলেন। চিকিৎসকরা ভিনদেশি এক নারীর এমন আগ্রহ দেখে বিস্মিত হন এবং সানন্দে সম্মতি দেন। এর পর থেকে তিনি যুদ্ধাহত ব্যক্তিদের শুশ্রূষা দিতে থাকেন।



মন্তব্য