kalerkantho


আওয়ামী লীগ-বিএনপিতে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী

মোখলেছুর রহমান মনির, ভালুকা (ময়মনসিংহ)    

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আওয়ামী লীগ-বিএনপিতে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী

দুই দশকের বেশি সময় ধরে ভালুকা সংসদীয় আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে। এ সময় একাধিকবার প্রার্থী বদল করেও বিএনপি আসনটি দখল করতে পারেনি। একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে ভালুকা নির্বাচনী এলাকাটি ময়মনসিংহের ১১ নম্বর আসন। আগামী নির্বাচনেও এখানে ভোটযুদ্ধ সীমাবদ্ধ থাকবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে।

জাতীয় সংসদের ১৫৬ নম্বর নির্বাচনী এলাকা ভালুকা আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে ভোটের রাজনীতিতে এখানে বিএনপিও রয়েছে শক্ত অবস্থানে। সংগঠন বিবেচনায় দুই দলের অবস্থানগত পার্থক্য হলো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে আছে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই, আর বিএনপিতে রয়েছে প্রকাশ্য বিরোধ।

এ আসনে ১৯৯৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত টানা চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মোহাম্মদ আমানউল্লাহ। আগামী নির্বাচনেও তিনি দলের মনোনয়ন চান। তিনি ছাড়াও আরো অন্তত ১০ জন ক্ষমতাসীন দল থেকে মনোনয়ন চান বলে আলোচনা রয়েছে। তাঁরা নিজেরাও নির্বাচন করার বিষয়ে আগ্রহের কথা জানিয়েছেন।

অন্যদিকে বিএনপির মনোনয়ন চান—এমন চার নেতার নাম শোনা যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, দশটি সংসদ নির্বাচনে ভালুকায় আওয়ামী লীগ জয়লাভ করেছে পাঁচবার। দুইবার করে বিএনপি ও মুসলিম লীগ, একবার জাতীয় পার্টির প্রার্থী জিতেছেন এখানে।

আওয়ামী লীগ : বর্তমান সংসদ সদস্য আমানউল্লাহ এর আগে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। চারবার নির্বাচিত হয়ে এলাকায় গ্রামীণ অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন জানিয়ে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভালুকাবাসী প্রতিবারই আমাকে আগেরবারের চাইতে বেশি ভোটে নির্বাচিত করেছে। আগামী নির্বাচনেও দলীয় মনোনয়ন পাওয়া এবং জয়ের বিষয়ে আমি শতভাগ আশাবাদী।’

এ আসনে আওয়ামী লীগের আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী গোলাম মোস্তফা। তিনি বর্তমানে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। এ দায়িত্বে থেকে তিনি এলাকার যোগাযোগব্যবস্থার যথেষ্ট উন্নয়ন করেছেন বলে জানান। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সহায়তা দেওয়া, বাল্যবিয়ে, মাদক প্রতিরোধসহ বিভিন্ন কাজ করার কথা জানিয়ে গোলাম মোস্তফা বলেন, দল মনোনয়ন দিলে ভোটাররা তাঁকে বিপুল ভোটে জয়ী করবে—এমনটাই আশা করছেন তিনি।

ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়নপ্রার্থীদের তালিকায় আছেন উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কাজিম উদ্দিন আহমেদ ধনু। তিনি বলেন, গত সংসদ নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন তাঁকেই দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি নির্বাচনে না আসায় পরে প্রার্থী পরিবর্তন করে দলের হাইকমান্ড। কাজিম উদ্দিন বলেন, ‘জনমতের বিচারে ইনশাআল্লাহ আমিই মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।’

বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটির কিডনি রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কে বি এম হাদিউজ্জামান সেলিমও মনোনয়ন চান। তিনি বলেন, ‘এলাকায় মেডিক্যাল ক্যাম্প করে মানবতার সেবা দিচ্ছি, উঠান বৈঠক করছি।’ মনোনয়নের ক্ষেত্রে বিষয়গুলো দল বিবেচনায় আনবে বলে তিনি আশা করেন।

আওয়ামী লীগের মনোনয়নের প্রত্যাশা জানিয়ে ভালুকা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম পিন্টু বলেন, ‘আমি সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। মানুষের জন্য কাজ করছি। কথায় নয়, কাজে মূল্যায়ন করলে ইনশাআল্লাহ আমিই মনোনয়ন পাব।’

অপর মনোনয়নপ্রত্যাশী উপজেলা পরিষদের দুইবারের নির্বাচিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মনিরা সুলতানা মনি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণ-আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকা এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তাঁর বাবার অবদানের কথা উল্লেখ করেন তিনি। মনি বলেন, দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে এসব বিষয় বিবেচিত হবে বলে তিনি আশা করেন।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন দলের ময়মনসিংহ জেলা শাখার নেতা এম এ ওয়াহেদ। দলের সাধারণ কর্মী থেকে শুরু করে হাইকমান্ড পর্যন্ত যোগাযোগ রাখছেন তিনি।

ওয়াহেদ বলেন, ‘মানুষের সেবায় আমি নিজেকে উৎসর্গ করতে চাই। আর সে জন্যই আমি আমার নিজস্ব তহবিল থেকে বিশ বছর ধরে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদরাসা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের উন্নয়নে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। এলাকার দুস্থ অসহায় মানুষকে সেবা দিচ্ছি। আওয়ামী লীগ অবশ্যই সব দিক বিবেচনা, জনমত যাচাই ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই মনোনয়ন দিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে আমি মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।’

শাহ্ মো. আশরাফুল হক জর্জ বর্তমানে কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এলাকায় বিশেষ পরিচিতি ছাড়াও তৃণমূলের নেতাকর্মী ও জনসাধারণের সঙ্গে গভীর যোগাযোগ রয়েছে তাঁর। তিনি বলেন, ‘আমি সব ধরনের গ্রুপিংয়ের ঊর্ধ্বে এবং একজন ক্লিন ইমেজের মানুষ হিসেবে নিজেকে সবার গ্রহণযোগ্য বলে মনে করি। সব দিক বিবেচনায় দল আমাকে মনোনয়ন দিবে বলে আশা করি।’ 

কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুজ্জামান বিপ্লবও আগামী নির্বাচনে দলের প্রার্থী হতে চান। দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে তিনি শতভাগ আশাবাদী।   

এ ছাড়া ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক মহিউদ্দিন আহম্মেদ এবং দলের আরেক নেতা মো. রফিকুল ইসলামও মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে।

বিএনপি : সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন দলের উপজেলা শাখার সভাপতি ফখরউদ্দিন আহম্মেদ বাচ্চু। এর আগে ২০০৮ সালে তিনি নির্বাচন করেছিলেন। আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে তিনি যথেষ্ট জনপ্রিয়। তিনি বলেন, ‘২০০৯ সালে দলের দায়িত্ব পাওয়ার পর ভালুকায় দলকে সুসংগঠিত করে ওয়ার্ডভিত্তিক সাংগঠনিক কার্যক্রমের প্রচলন করি। ফলে বর্তমানে উপজেলার প্রতিটি ওয়ার্ডে বিএনপির চার-পাঁচ শ সক্রিয় কর্মী রয়েছে।’

সরকারবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে নিজে ও দলের নেতাকর্মীদের নানা ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা তুলে ধরে ফখরউদ্দিন আহম্মেদ বাচ্চু বলেন, ‘নবম সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহের অন্য সব আসনে ৩০-৪০ হাজার করে দলের ভোট কমলেও ভালুকায় বেড়েছিল ২০ হাজার ভোট। সুতরাং মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে আমিই সর্বোচ্চ দাবিদার।’

উপজেলার হবিরবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ভালুকা বিএনপির শিল্পবিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ মোর্শেদ আলমও দলের মনোনয়নপ্রার্থী। তিনি বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ ফোরামের নির্বাচিত মহাসচিব ছিলেন। তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভালুকার ১০৮টি কেন্দ্রের মধ্যে ৭৩টি কেন্দ্রে জয়লাভ করলেও বিতর্কিত ফলাফলে চার হাজার ভোটের ব্যবধানে আমাকে ফেল করানো হয়।’ তাঁর দাবি, বছরের পর বছর ধরে দলীয় নেতাকর্মী ও তৃণমূলের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার পাশাপাশি মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠে আছেন তিনি। সুতরাং মনোনয়নের ক্ষেত্রে বিষয়গুলো মূল্যায়িত হবে বলে আশা করছেন মোর্শেদ আলম।

বিএনপির অপর সম্ভাব্য প্রার্থী জেলা বিএনপি নেতা আনোয়ার আজিজ টুটুল। ছাত্রদল ও বিএনপির জেলা পর্যায়ে নানা পদে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপির মনোনয়ন চান।

অপর সম্ভাব্য প্রার্থী মো. আবুল হোসেন কেন্দ্রীয় জিয়া ব্রিগেড সভাপতি ও জেলা বিএনপির নির্বাহী সদস্য। পুলিশে কর্মরত থাকা অবস্থায় জাতিসংঘের শান্তি পদক পাওয়া এই নেতা বলেন, তিনি কর্মজীবন থেকেই সমাজ উন্নয়ন কাজে হাত দেন। এলাকায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সামাজিক সাংস্কৃতিক উদ্যোগেও নিজেকে সম্পৃক্ত করার কথা জানান তিনি। পরে চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেওয়া আবুল হোসেন বলেন, আগামী নির্বাচনে ভালুকা আসনে তিনি বিএনপির মনোয়ন চাইবেন। দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে তিনি শতভাগ আশাবাদী।


মন্তব্য