kalerkantho


মনোনয়ন লড়াই বড় দুই দলেই

তৈমুর ফারুক তুষার ও শফিক সাফি    

১৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



মনোনয়ন লড়াই বড় দুই দলেই

পুরান ঢাকার লালবাগ, চকবাজার ও বংশাল থানার ১৩টি ওয়ার্ড নিয়ে ঢাকা-৭ সংসদীয় আসন। বরাবরই আসনটিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়ে আসছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখেও বড় এ দল দুটির বেশ কয়েকজন নেতা গণসংযোগ ও প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের প্রত্যেকেই নিজ দলের মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী।

এলাকা ঘুরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নানা উপলক্ষে টানানো পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন দেখা গেছে। স্থানীয় ও দলীয় সূত্রে জানা যায়, নির্বাচন সামনে রেখে ওই নেতারা বিভিন্ন দিবস ঘিরে পোস্টার, ব্যানারে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে নিজেদের প্রার্থী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা জানান দিচ্ছেন। কেউ কেউ কর্মিসভা, গণসংযোগের মাধ্যমে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাঁরা অনুসারী নেতাকর্মীদের নিয়ে শোডাউন করছেন। এলাকার রাস্তাঘাট-ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, এলাকার সৌন্দর্যবর্ধনের নানা পরিকল্পনার কথা বলে সাধারণ মানুষকে পক্ষে টানার চেষ্টা করছেন।

এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাজি মোহাম্মদ সেলিম। তবে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত। এবারও তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতাদের মধ্যে আরো আছেন দলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক এমপি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আখতার  হোসেন এবং বংশাল থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম মোস্তফা। বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আলোচনায় আছেন দলের সাবেক নেতা প্রয়াত নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনা, দলের কেন্দ্রীয় সহ-যুববিষয়ক সম্পাদক মীর নেওয়াজ আলী এবং আরো কয়েকজন। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক আলহাজ আবদুর রহমানও নির্বাচনী মাঠ গোছাচ্ছেন।

গত নির্বাচনে হাজি মোহাম্মদ সেলিম দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন। তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর আগে ১৯৯৬ সালে হাজি সেলিম আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি বিএনপির প্রার্থী নাসির উদ্দিন পিন্টুর কাছে হেরে যান। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বিএনপির পিন্টুকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য হন। পুরান ঢাকায় হাজি মোহাম্মদ সেলিমের একটি বড় কর্মী বলয় রয়েছে। তবে অসুস্থতার কারণে এবার তিনি কিছুটা বেকায়দায় আছেন। বিশেষ করে কথা বলার সমস্যায় ভুগছেন তিনি। এ কারণে তার মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী অন্য নেতারা।

হাজি মোহাম্মদ সেলিম অবশ্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কথা বলতে কিছুটা সমস্যা হলেও চলাফেরায় কোনো সমস্যা নেই আমার। ফলে আমি নির্বাচনের প্রস্তুতি পুরোদমে নিচ্ছি। নিয়মিত কর্মিসভাসহ বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছি।’

ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন এ আসনে মোট তিনবার আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। প্রথমে ১৯৯১ সালে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি পরাজিত হন। পরের দুই নির্বাচনে আর মনোনয়ন পাননি। এরপর ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি জয় পান। ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনে আবার দলের মনোনয়ন পেলেও ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হাজি মোহাম্মদ সেলিমের কাছে পরাজিত হন। আগামী নির্বাচনে তিনি আবারও দলের মনোনয়ন চাইবেন।

মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলেন—প্রথমে সহপ্রচার সম্পাদক এবং পরে স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক। বর্তমানে তিনি চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি। জাতীয় পর্যায়ে মোস্তফা জালালের এমন অবস্থানকে নির্বাচনী প্রচারে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন তাঁর অনুসারীরা।

মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি সংসদ সদস্য থাকাকালে এলাকায় বহু উন্নয়ন করেছি। এলাকার মানুষের কল্যাণে কাজ করেছি। আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য আমি গত কয়েক বছর ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছি, গণসংযোগ করছি।’

নির্বাচনের মাঠে সক্রিয় আছেন আওয়ামী লীগের তরুণ নেতা আখতার হোসেন। তিনি ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকার সময় ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এরপর কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি হন। একাধিকবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক হয়েছেন। এর আগে দুইবার তিনি দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন, তবে পাননি। এই আসনে মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের তিনবার পরাজিত হওয়া এবং হাজি সেলিমের অসুস্থতার কারণে স্থানীয় আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী আখতার হোসেনের পক্ষে কাজ করছে বলে জানা যায়।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আখতার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের সংকটকালীন নানা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া একজন কর্মী। আওয়ামী লীগের প্রতি, নেত্রীর প্রতি সব সময় অনুগত থেকেছি। দলের দুর্দিনে সক্রিয় থেকেছি, জুলুম-নির্যাতন সয়েছি। এলাকার মানুষের মধ্যে নিজের গ্রহণযোগ্যতা গড়ে তুলেছি। আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি, মানুষের সাড়াও পাচ্ছি।’

বংশাল থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম মোস্তফা বিভিন্ন এলাকায় দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এলাকায় গণসংযোগ করছি। দলের মনোনয়ন চাইব। আওয়ামী লীগের দুর্দিনে আমার ভূমিকা নিশ্চয়ই দল মূল্যায়ন করবে। নতুন প্রজন্মের নেতা হিসেবে আমি ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে কাজ করতে চাই।’

বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন দলটির সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনা। বর্তমানে তিনি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সহসভাপতি। স্বামী মারা যাওয়ার পরই আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে আসেন কল্পনা। এর আগে ২০০২ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনের সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। তবে তাঁকে নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা আছে এলাকার দলীয় নেতাকর্মীদের একাংশের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, এলাকাবাসীর সুখে-দুঃখে পিন্টুকে কাছে পাওয়া যেত, নেতাকর্মীদের বিপদেও পাশে থাকতেন তিনি। কিন্তু বর্তমানে দলের দুঃসময়ে কল্পনাকে খুব একটা পাওয়া যায় না।

নাসিমা আক্তার কল্পনা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দলের এই দুর্দিনে আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। রাজপথে থাকার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমার স্বামী এই আসনের এমপি ছিলেন। তিনি এলাকায় যথেষ্ট উন্নয়ন করেছেন। অল্প যেটুকু কাজ বাকি আছে সেটুকু শেষ করার সুযোগ দিলে আমি কৃতজ্ঞ থাকব।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর পরিবার, রাজনীতিসহ পারিপার্শ্বিক সব দিক একাই সামলাতে হচ্ছে। কিছুটা বিচ্যুতি হতে পারে। কিন্তু সেটি ক্ষণিকের জন্য। আশা করি সবাই তা বুঝবেন।’

ছাত্রদল ও যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-যুববিষয়ক সম্পাদক মীর নেওয়াজ আলীও দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী। তাঁর বড় ভাই মীর আশরাফ আলী আজম ঢাকা মহানগর বিএনপি নেতা এবং আরেক ভাই মীর শরাফত আলী সপু বিএনপির কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক।

মীর নেওয়াজ আলী বলেন, ‘দলের এই দুর্দিনে রাজপথে আমি অতীতের মতো এখনো সক্রিয়। পুরান ঢাকার প্রাণকেন্দ্র এই আসনটি বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে আমি মনোনয়নপ্রত্যাশী। আশা করি ধানের শীষ প্রতীকের মান রক্ষা করতে পারব।’ তিনি বলেন, ‘এক-এগারোর সময় থেকে রাজপথে সক্রিয়। কেন্দ্রীয় রাজনীতির পাশাপাশি এলাকায়ও কাজ করছি। এখন দলের হাইকমান্ডই বলতে পারবে তারা কাকে বেছে নেবে। তবে আমি আশাবাদী।’

এ ছাড়া ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আরিফুর রহমান নাদিম এবং সহসভাপতি মোশাররফ হোসেন খোকন নির্বাচনে আগ্রহী বলে স্থানীয় নেতারা জানান।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আলহাজ আবদুর রহমানও নির্বাচনী মাঠে আছেন। দল এরই মধ্যে তাঁকে মনোনীত করেছে। ২০১৫ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। অনিয়মের অভিযোগ তুলে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে নির্বাচন বয়কট করলেও তৃতীয় স্থান অর্জন করেন তিনি। আবদুর রহমান এলাকার প্রতিটি থানা ও ওয়ার্ডে নিয়মিত গণসংযোগ করছেন। গত ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে সদস্য সংগ্রহ কার্যকম চালিয়েছেন।

আবদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইসলামী আন্দোলন এরই মধ্যে আমাকে দলের মনোনয়ন দিয়েছে। আমি সাধারণ মানুষদের কাছে যাচ্ছি। এলাকার ভোটারদের ভালো সাড়া পাচ্ছি।’

এ আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন। তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গত নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। নিয়মিত তিনি গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। এলাকায় বিপুলসংখ্যক পোস্টার, ব্যানার টানিয়েছেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট হলে এই আসন জাতীয় পার্টিকে ছাড় দেওয়া হবে বলে আশাবাদী তিনি।

সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি বরাবরই এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি। এখনো নিয়মিত গণসংযোগ করছি। আশা করছি আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পাব।’


মন্তব্য