kalerkantho


আ. লীগে কামাল এগিয়ে, মিন্টু ফালু বিএনপিতে আলোচনায়

তৈমুর ফারুক তুষার ও শফিক সাফি    

১৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



আ. লীগে কামাল এগিয়ে, মিন্টু ফালু বিএনপিতে আলোচনায়

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকা তেজগাঁও এবং শেরেবাংলানগর ও রমনা থানার আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১২ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। আগামী নির্বাচনে এ আসনে দলের একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও আবার কামালের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করে স্থানীয় আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী। অন্যদিকে আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী কে হবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয় দলের নেতাকর্মীদের কাছে। বিএনপির প্রভাবশালী নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টু ও মোসাদ্দেক আলী ফালুর নাম আলোচনায় থাকলেও তাঁদের কেউই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেননি। এ ছাড়া মোসাদ্দেক আলী ফালু দল থেকে পদত্যাগও করেছেন।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আসন পুনর্বিন্যাসের ফলে ঢাকার আসনসংখ্যা বেড়ে যায়। ওই সময় তেজগাঁও ও রমনার আংশিক এলাকা নিয়ে ঢাকা-১১ আসন গঠিত হয়। ওই আসনে প্রথমবার মনোনয়ন পেয়ে আসাদুজ্জামান খান কামাল বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ শাহাবউদ্দিনকে পরাজিত করেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে পুনরায় আসনবিন্যাস করা হয়। ওই সময় তেজগাঁও, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা, শেরেবাংলানগর ও রমনার আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত হয় ঢাকা-১২ আসন। ওই নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান আসাদুজ্জামান খান কামাল। পরে তিনি মন্ত্রিসভায় স্থান পান। প্রথমে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং পরে একই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী হন তিনি।

আসাদুজ্জামান খান মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে থাকলেও আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী অন্য নেতাদের মাঠ গোছানোর কাজও থেমে নেই। এ আসনে যুবলীগের কেন্দ্রীয় দুই নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী। তাঁরা হলেন যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী ও ত্রাণবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম। এ দুই নেতাই যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী নিয়ে উপস্থিত হয়ে থাকেন।

আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে কামালকেই এগিয়ে রাখছে দলের স্থানীয় অনেক নেতাকর্মী। তাদের মতে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিজ নির্বাচনী এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন কামাল। ফার্মগেট, সাতরাস্তা, নাখালপাড়া, তেজকুনিপাড়া, মনিপুরীপাড়া, ইন্দিরা রোড, রাজাবাজারের বিভিন্ন স্থানে একসময় ব্যাপক ছিনতাই হলেও এখন তা প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে। এসব এলাকায় পানি, বিদ্যুতের সমস্যাও আগের মতো নেই।

তেজগাঁও থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শামীম হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের আসনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালই মনোনয়ন পাবেন। উনার কোনো বিকল্প নাই। উনি এখানকার স্থানীয়। এটা আমাদের জন্য ইতিবাচক। তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ হলো তিনি এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, যেকোনো বিপদে-আপদে তাদের পাশে দাঁড়ান। এর আগে আমাদের এই এলাকার মানুষ এমন এমপি পায়নি। আর দলের মধ্যেও তাঁর অবস্থান ভালো।’

যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইবেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনি দলীয় মনোনয়নের জোরালো দাবিদার ছিলেন। ওই নির্বাচনে তেজগাঁও থানা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যে তিনজনের নামের প্রস্তাব দলীয় মনোনয়ন বোর্ডের কাছে পাঠানো হয়েছিল, তাতে ১ নম্বরে ছিল মুজিবুর রহমানের নাম। আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে তিনি স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। মুজিবুর রহমান চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে এ এলাকায় সংগঠনকে শক্তিশালী করার কাজ করছি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আমাকেই প্রার্থী হিসেবে দেখতে চেয়েছিল। ওই সময় বর্তমান সংসদ সদস্যও আমাকে সমর্থন দিয়েছিলেন। আগামী নির্বাচনেও আমি দলের মনোনয়ন চাইব। এবার দল আমাকে বিবেচনা করবে বলে আশা করছি।’

এ আসনে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে এক ধরনের জটিলতার মধ্যে রয়েছে বিএনপি। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দলের নেতাকর্মীদের মুখে রয়েছে প্রভাবশালী দুই নেতার নাম। তাঁরা হলেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু এবং পদত্যাগকারী ভাইস চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক আলী ফালু। এ আসনের সাবেক এমপি ফালু নবম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেননি। সেবার মনোনয়ন পেয়েছিলেন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাহাবউদ্দিন। ফালুর ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনের বিষয়ে এখনো ঘনিষ্ঠমহলেও আগ্রহ দেখাননি ফালু। অন্যদিকে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে লড়াইয়ের আগ্রহ থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় হন এককালের ব্যবসায়ী নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টু। বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর কর্মিবান্ধব মনোভাব নিয়ে দলের সর্বস্তরে পেয়েছেন গ্রহণযোগ্যতা। তবে ঢাকা থেকে নির্বাচনের বিষয়ে এখনো ঘনিষ্ঠজনদের কাছে আগ্রহ প্রকাশ করেননি তিনি।

এর বাইরে এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেতে তৎপর রয়েছেন তিনজন। তাঁরা হলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় অর্থবিষয়ক সহসম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সহসভাপতি মোহাম্মদ শাহাবউদ্দিন, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ও সাবেক কমিশনার আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার এবং যুবদল সভাপতি সাইফুল আলম নীরব।

২০০৮ সালের নির্বাচনে হারলেও দলের কর্মকাণ্ডে সর্বদা সক্রিয় আছেন শাহাবউদ্দিন। এর ফলে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সহসভাপতির দায়িত্ব পান তিনি। সাইফুল আলম নীরব ছাত্রজীবন থেকেই তেজগাঁওয়ের স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ছাত্রদল থেকে যুবদলের মহানগর হয়ে এখন কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এ আসন থেকে নির্বাচন করার প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন। মহানগর বিএনপির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা তেজগাঁও বিএনপির সভাপতি আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ারও এ আসনে দলীয় প্রার্থী হতে চান।

মোহাম্মদ শাহাবউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ২০০৮ সালের নির্বাচনে আমাকে ধানের শীষ প্রতীক দিয়েছিলেন। তিনি আমাকে যে নির্দেশনা এবং দায়িত্ব দিয়েছেন সেভাবেই কাজ করে যাচ্ছি। দলের ঘোষিত কর্মসূচি পালনসহ কর্মী-সমর্থকদের সুখে-দুঃখে পাশে আছি। ঢাকা-১২ আসনের অধীন তেজগাঁও, শিল্পাঞ্চল, শেরেবাংলানগর ও রমনা থানা বিএনপি ও এর অঙ্গদলগুলোর নেতাকর্মীদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ নিবিড় এবং সম্পর্ক অত্যন্ত মজবুত। নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের অধীন বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল যে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবে সেই নির্বাচনের জন্য আমাদের নেতাকর্মীরা সব সময় প্রস্তুত।’ নিজের প্রার্থিতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দলের শীর্ষ নেতারা আমাকে কাজ করে যাওয়ার জন্য বলেছেন। সে অনুযায়ী কাজ করছি। চেয়ারপারসনই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।’

সাইফুল আলম নীরব বলেন, ‘আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা তেজগাঁওয়ে। শৈশব-কৈশোর কেটেছে বিজি প্রেস কলোনিতে, পড়েছি পলিটেকনিক স্কুলে। ১৯৮৩ সাল থেকে ছাত্রদলে যোগদানের পর তেজগাঁও থানার সাধারণ সম্পাদক, সভাপতির দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৯৩ সালে ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হয়েছি। ২০০৩ সালে অবিভক্ত ঢাকা মহানগর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ও ২০১০ সালে কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক পদের পর ২০১৭ সালে যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘দলের হাইকমান্ড চাইলে আমি এই আসন থেকে নির্বাচন করব।’

আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার আত্মগোপনে থাকায় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

এ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে তিনবার সাবেক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বর্তমানে বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) মান্নান। বিকল্পধারা থেকে তিনিও এ আসনে প্রার্থী হতে পারেন বলে জানা গেছে।


মন্তব্য