kalerkantho


কামাল মজুমদার আশাবাদী দুই দলে কয়েকজন তৎপর

তোফাজ্জল হোসেন রুবেল ও শফিক সাফি   

২১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



কামাল মজুমদার আশাবাদী দুই দলে কয়েকজন তৎপর

রাজধানীর মিরপুর, কাফরুল, ভাসানটেক ও শেরেবাংলানগর থানার আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৫ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের কামাল আহমেদ মজুমদার। টানা দুই মেয়াদে এমপি হিসেবে এলাকায় রাস্তাঘাট এবং শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন করেছেন তিনি। আগামী নির্বাচনেও কামাল আহমেদ মজুমদার দলের মনোনয়ন পাবেন বলে মনে করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের অনেক নেতা। কামাল মজুমদার নিজেও এ বিষয়ে আশাবাদী। তবে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে তৎপর রয়েছেন আরো কয়েকজন নেতা। তেমনি বিএনপির একাধিক নেতা এ আসনে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী।

কামাল মজুমদার ছাড়া আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গাজী মেসবাউল হক সাচ্চু, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগ সভাপতি মাঈনুল হোসেন খান নিখিল এবং মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক সাইফুল্লাহ সাইফুল।

এ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী হলেন দলের যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন হাসান। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক দল লেবার পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরানও মনোনয়নপ্রত্যাশী।

বর্তমান এমপি কামাল আহমেদ মজুমদার ১৯৬৯-৭০ মেয়াদে পুরান ঢাকার সলিমুল্লাহ ডিগ্রি কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস ছিলেন। এরপর ১৯৭২-৭৩ মেয়াদে ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সহসভাপতি নির্বাচিত হন। পরে তিনি তিনবার মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ ১৯৯৬ সালে প্রথমবার তৎকালীন ঢাকা-১১ (মিরপুর, পল্লবী ও কাফরুল) আসনে বিএনপির প্রার্থী এখলাস উদ্দিন মোল্লাকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী উইং কমান্ডার (অব.) হামিদুল্লাহ খানকে ৪৪ হাজার ৩০৮ ভোটে পরাজিত করে সংসদ সদস্য হন কামাল মজুমদার। সর্বশেষ ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এখলাস উদ্দিন মোল্লা। তবে কামাল মজুমদারের কাছে তিনি ২৬ হাজার ৭৮৬ ভোটে হেরে যান।

কামাল আহমেদ মজুমদার মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ এলাকায় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। বিভিন্ন সেবা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে এলাকার রাস্তাঘাট উন্নয়নসহ বেশ কিছু কাজ করিয়েছেন তিনি। আগারগাঁও থেকে পীরেরবাগ হয়ে মিরপুর-২ পর্যন্ত রাস্তা (৬০ ফুট রাস্তা নামে পরিচিত) নির্মাণ এবং ওয়াসার ১০৫টি পাম্প বসানোর কাজে ভূমিকার কারণে তিনি এলাকায় সুনাম কুড়িয়েছেন।

ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের কার্যকরী সদস্য মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘আমরা এমপি কামাল মজুমদারকে নিয়ে এলাকায় যে কাজ করেছি এতে আশা করছি আগামী সংসদ নির্বাচনে তাঁকে জনগণ ভোট দিবে। তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর দলীয় নেতাকর্মীদেরও মূল্যায়ন করেছেন। আশা করছি আগামী নির্বাচনেও দল তাঁর কাজের মূল্যায়ন করে মনোনয় দিবে।’

সংসদ সদস্য আলহাজ কামাল আহমেদ মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জননেত্রী শেখ হাসিনার আদর্শের রাজনীতি করি। দীর্ঘ সময় ধরে দলের সঙ্গে আছি। জনগণের সুখে-দুঃখে এখনো পাশে দাঁড়াই। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মী ও জনগণ আমার কাছে এসে তাদের অভাব-অভিযোগ বলে। আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করি মানুষের সমস্যা সমাধান করার।’ তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি বড় রাজনৈতিক দল। সেখানে অনেক নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী হবেন এটাই স্বাভাবিক। তবে রাজনৈতিক মাঠে তৎপরতা চালানোর কাজটি শালীনভাবে হওয়া উচিত।’

এক প্রশ্নের জবাবে কামাল আহমেদ মজুমদার বলেন, ‘আমি শারীরিভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ। গত ৭ মার্চের জনসভায় নিজে কর্মীদের সঙ্গে মিছিল নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়েছি। ১৭ মার্চ আমার নির্বাচনী এলাকায় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছি। এখনো ১৮ ঘণ্টা কাজ করি। তবে কিছু লোক আমার ব্যাপারে নানা কথা ছাড়ানোর চেষ্টা করে, তা সঠিক না।’

এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গাজী মেসবাউল হক সাচ্চু। তিনি ১৯৯১ সালে বৃহত্তর ক্যান্টনমেন্ট থানা ছাত্রলীগের সভাপতি হয়েছিলেন। এরপর ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি হিসেবেও দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে তিনি আশাবাদী।

ডিএনসিসির ১৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজি নূরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা গাজী মেসবাউল হক সাচ্চুর বিকল্প দেখছি না। সাচ্চু এরই মধ্যে সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মন জয় করে নিয়েছেন। তাঁকে দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হলে বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন বলে বিশ্বাস করি।’

গাজী মেসবাউল হক সাচ্চু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজনীতির মাধ্যমে মূলত আমরা মানুষের সেবা করে থাকি। দীর্ঘ সময় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আছি। এখন যদি নেত্রী মনে করেন আমাকে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দিবেন তাহলে আমি প্রার্থী হতে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত আছি।’ দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা তাঁর সঙ্গে আছে—উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি মূলত আমার দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে সব সময় কাজ করি। এ কাজ করতে গিয়ে সাধারণ জনগণের সঙ্গেও একটা সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আমাকে মনোনয়ন দিলে নৌকা মার্কা নিয়ে বিপুল ভোটে বিজয়ী হতে পারব বলে বিশ্বাস করি।’

আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী মাঈনুল হোসেন খান নিখিল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি দীর্ঘ সময় ধরে এ এলাকায় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। প্রথমে যুবলীগ উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলাম। পরে সাধারণ সম্পাদকও ছিলাম। এখন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এলাকায় মানুষের সেবায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি বিধায় মানুষও চায় আমি নির্বাচন করি। আমার সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। দল থেকে মনোনয়ন পেলে নির্বাচন করব।’

২০০৮ সালের নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন উইং কমান্ডার (অব.) হামিদুল্লাহ খান। তাঁর মৃত্যুর পর থেকে এই আসনে বিএনপির নিশ্চিত কোনো প্রার্থী নেই। সে ক্ষেত্রে সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এই আসনে নির্বাচন করতে পারেন। আলালের ঘনিষ্ঠজনরা জানান, দলের হাইকমান্ড থেকে তাঁকে এ আসনে কাজ করতে বলা হয়েছে। তিনিও প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে আলালকে বরিশাল-২ (বানারীপাড়া ও উজিরপুর) আসনে মনোনয়ন দেওয়ার বিকল্প চিন্তাও রয়েছে বিএনপির। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে ওই আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। আলাল বরিশাল-২ আসনে মনোনয়ন পেলে এখানে দলের প্রার্থী হতে পারেন যুবদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন হাসান। বিএনপির এই দুজন ছাড়াও ২০ দলীয় জোটের শরিক দল লেবার পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সরকারবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে দুই শতাধিক মামলার আসামি হয়েছেন মামুন হাসান। ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি থেকে ধাপে ধাপে উঠে এসেছেন তিনি। ছিলেন যুবদলের ওয়ার্ড-থানার সভাপতি, মহানগরের প্রচার সম্পাদক ও মহানগর উত্তর যুবদলের সভাপতি।

মামুন হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ হচ্ছে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা। এরপর হাসিনা সরকার হটাব। তারপর নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে বাধ্য করেই আমরা নির্বাচনে যাব।’ তিনি বলেন, ‘দলের সিনিয়র নেতাদের অনুমতি নিয়ে আমি অনেক আগে থেকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছি। কিন্তু দলীয় প্রধান, দল ও দেশের মানুষের এই অবস্থায় নির্বাচন নিয়ে ভাবার সময় মিলছে না।’

লেবার পার্টির একাংশের প্রধান ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, ‘বিএনপি জোটের সঙ্গে এক যুগ ধরে আছি। সরকারি দলের বহু মামলা-হামলার শিকার হয়েছি। একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়ে জেল খেটেছি। জোটের পক্ষ থেকে আমি এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছি। জোট যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় তাহলে আমি আসনটি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হব।’

সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কারাগারে থাকায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

 


মন্তব্য