kalerkantho


আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর ‘নির্বাচনী যুদ্ধ’

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর   

১৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর ‘নির্বাচনী যুদ্ধ’

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ফরিদপুর-৪ (ভাঙ্গা, চরভদ্রাসন ও কৃষ্ণপুর ইউনিয়ন বাদে সদরপুর উপজেলা) আসনে গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হবে বলে মনে করছে সাধারণ ভোটাররা।

এ আসনটি বরাবরই আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। কিন্তু দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী কাজী জাফর উল্যাহকে হারিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী মজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ, বর্তমান স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জেলা বিএনপির সভাপতি জহিরুল হক শাহজাদা মিয়া, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইয়াসমিন আরা হক, জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সহসভাপতি শাহরিয়া ইসলাম শায়লা ও ভাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার ইকবাল হোসেন সেলিম আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইয়াসমিন আরা হক জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাদার সহধর্মিণী। তিনি বিএনপি আমলে দুইবার সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন।

এ আসনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) দলীয় কাস্তে প্রতীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ইতিমধ্যে জোরেশোরে মাঠে নেমে পড়েছেন ভাঙ্গা উপজেলা সিপিবির সভাপতি আতাউর রহমান কালু।

আগামী নির্বাচনে জাকের পার্টির চেয়ারম্যান পীরজাদা মোস্তফা আমীর ফয়সাল নির্বাচন করতে পারেন বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া জাতীয় পার্টি থেকে চরভদ্রাসন উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল হোসেন মাস্টার নির্বাচন করতে পারেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগ : নির্বাচন সামনে রেখে ব্যাপক গণসংযোগ করছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ। তিনি দলীয় মনোনয়ন পাবেন—এটা নিশ্চিত বলে মনে করছে দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জাফর উল্যাহ নিয়মিত এলাকায় আসছেন, গণসংযোগ করছেন। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। এ আসনটি পুনরুদ্ধারের জন্য তিনি জোরেশোরে প্রচারে নেমেছেন। আর আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনে ভালো অবস্থানে রয়েছেন তিনি।

দশম সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে মজিবুর রহমান ওরফে নিক্সন চৌধুরী আওয়ামী লীগ প্রার্থী কাজী জাফর উল্যাহকে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করেছিলেন। ক্ষমতাসীন দলের বেশির ভাগ নেতাকর্মীর ধারণা, সংসদীয় এলাকায় আওয়ামী লীগে দ্বিধাবিভক্তি এবং  বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় নিক্সন চৌধুরী জয়লাভ করেছিলেন। আগামী নির্বাচনের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে সুবিধা পাবেন কাজী জাফর উল্যাহ। পাল্টে যাবে ভোটের হিসাব।

আওয়ামী লীগের একাংশের নেতাকর্মীরা মনে করছে, কাজী জাফর উল্যাহ ও নিক্সন চৌধুরী একই ঘরানার লোক। নিক্সন চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মীয়। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের ভোট দুই ভাগ হচ্ছে।

গত নির্বাচনের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে কাজী জাফর উল্যাহ ও তাঁর অনুসারীরা নির্বাচনী এলাকার তিন উপজেলার প্রতিটি ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন চষে বেড়াচ্ছে। এমন কোনো দিন নেই যে জাফর উল্যাহ এলাকায় সভা-সমাবেশ, উঠোন বৈঠক বা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন না। তিনি যাচ্ছেন উপজেলা সদর থেকে পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদের চরাঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামে। দলের বিভক্তি মেটাতে কাজ করছেন, অভিমানী নেতাকর্মীদের কাছে টেনে নিয়েছেন।

ভাঙ্গা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি দীপক মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ আসনটি আওয়ামী লীগের। গত নির্বাচনে নানা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াত একজোট হয়েছিল। নৌকার বিজয় ঠেকাতে তাদের ভোট স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে দিয়েছিল। আমাদের ভেতরের কেউ কেউ হাত মিলিয়েছিল তাদের সঙ্গে। এর ফলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়েছিল। এ জন্য নৌকার বিজয় হয়নি। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আমরা নৌকার মাঝি ঠিক করে ফেলেছি। তিনি হলেন আমাদের নেতা কাজী জাফর উল্যাহ।’ তিনি আরো বলেন, ‘এ আসনে দলে কোনো বিভক্তি নেই। সবাই মিলে নৌকার বিজয় সুনিশ্চিত করতে মাঠে কাজ করছে নেতাকর্মীরা। আগামী নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীকে বিজয়ীকে করে আসনটি পুনরুদ্ধার করতে আমরা সচেষ্ট রয়েছি।’

কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, ‘এ আসনটি সব সময় নৌকারই ছিল। আমি আগে এ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। গত নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী নিজেকে শেখ হাসিনার আত্মীয় পরিচয় দিয়েছিলেন। একক নির্বাচন হওয়ায় নৌকার বিজয় ঠেকাতে তারা বিএনপি-জামায়াতসহ সবাই মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। এবার সবার অংশগ্রহণে ভোট হবে। এর ফলে যার যার ভোট তার তার থাকবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘নৌকার অবস্থা ভালো হয়েছে। আমি দিন-রাত পরিশ্রম করছি। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করছে। আর মানুষের মোহভঙ্গ হয়েছে। স্বতন্ত্র এমপি কতটুকু কমিটমেন্ট রাখতে পেরেছেন তা মানুষ বিবেচনা করবে।’

কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, এ আসনের তিনটি উপজেলার মানুষই শান্তিপ্রিয়। কিন্তু সেখানে বেআইনি অস্ত্র ও মাদক ঢোকানো হয়েছে। পরিবেশ নষ্ট করা হয়েছে। মানুষ বিরক্ত এসব কাজে। মানুষ এখন অনেক সচেতন হয়েছে। তাদের আর বিভ্রান্তিতে ফেলা যাবে না। তিনি বলেন, ‘নৌকার বিজয়ের ব্যাপারে আমরা শতভাগ আশাবাদী।’

স্বতন্ত্র : বর্তমান স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরীর অন্যতম অনুসারী ভাঙ্গা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন বলেন, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে মানুষ আবারও নিক্সন চৌধুরীকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে। কেননা নিক্সন চৌধুরী তাঁর কমিটমেন্ট রেখেছেন। গত ৪০ বছরে যা উন্নয়ন হয়নি, নিক্সন চৌধুরী চার বছরে তার চেয়ে অনেক বেশি করেছেন। মানুষের ভালোবাসার প্রতিদান দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।’

শাহাদাত হোসেন বলছিলেন, ‘নির্বাচনী এলাকার তিন উপজেলার নারী ও তরুণ ভোটাররা আমাদের সমর্থক। তাদের ভোট নিশ্চিতভাবে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে থাকবে।’ তিনি দাবি করেন, কোনো ধরনের অপপ্রচারে মানুষ বিভ্রান্ত হবে না। তিন উপজেলায় আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ নেতাকর্মী স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য নিক্সন চৌধুরীর সঙ্গে রয়েছে। সুতরাং নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার ব্যাপারে তাঁরা শতভাগ আশাবাদী।

বিএনপি : সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি নেতাকর্মীরা মনে করছে, যদি দল ঐক্যবদ্ধ থাকে তাহলে নির্বাচনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারবে। সে কারণে নির্বাচনকে সামনে রেখে জোরেশোরে মাঠে নেমেছে বিএনপি নেতাকর্মীরা।

তারা মনে করছে, তিন উপজেলায় বিএনপি ভোটে এগিয়ে রয়েছে। গত নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ায় তাদের সব ভোট স্বতন্ত্র প্রার্থী পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। এবার তারা নির্বাচন করলে তাদের ভোট বিএনপির মনোনীত প্রার্থী পাবেন।

এরই মধ্যে এলাকায় প্রচারে রয়েছেন জাসাসের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি শাহরিয়া ইসলাম শায়লা, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও  ফরিদপুর জেলা বিএনপির সভাপতি জহিরুল হক, ইয়াসমিন আরা হক ও ভাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার ইকবাল হোসেন সেলিম।

দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে শতভাগ আশাবাদী জানিয়ে শাহরিয়া হোসেন শায়লা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি এর আগে উপজেলা নির্বাচন করে জনসমর্থন পেয়েছি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আমি নিয়মিত এলাকায় প্রচারে অংশ নিচ্ছি। দলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের পাশে সব সময় রয়েছি।’ সব বাধা উপেক্ষা করে দলীয় কর্মসূচি পালন করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দুর্দিনে অনেকেই দল ছেড়েছেন। পদে থেকেও কেউ কেউ দলের বিরুদ্ধে নানা কৌশলে ষড়যন্ত্র করছেন। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের পাশে থেকে সব সময় এসবের প্রতিবাদ করেছি। আমার কর্মকাণ্ড দলের হাইকমান্ড অবহিত আছে। সুতরাং আমার সার্বিক কর্মকাণ্ড বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আমাকে মনোনয়ন দেবে বলে আমি আশাবাদী।’

অন্যদিকে মনোনয়নপ্রত্যাশী ভাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার ইকবাল হোসেন সেলিম বলেন, ‘দেশে নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হলে বিএনপি অবশ্যই নির্বাচনে অংশ নেবে। আর সাধারণ ভোটাররা ভোট দিতে পারলে বিএনপির প্রার্থী বিপুল ভোটে জয়লাভ করবেন।’

ফরিদপুর জেলা বিএনপির সভাপতি জহিরুল হক শাহজাদা মিয়া ও ইয়াসমিন আরা হক এলাকায় নিয়মিত গণসংযোগ করছেন। তাঁরা উভয়েই দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।

অন্যান্য : এ আসনে জাকের পার্টির চেয়ারম্যান পীরজাদা মোস্তফা আমীর ফয়সাল নির্বাচন করতে পারেন বলে জানিয়েছেন দলটির জেলা শাখার সভাপতি মশিউর রহমান জাদু মিয়া। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা জনগণের পাশে রয়েছি। নির্বাচনে অংশ নিতে প্রচার চালাচ্ছি। শিগগিরই জাকের পার্টির চেয়ারম্যান নিজে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেবেন।’

এ ছাড়া সিপিবির মনোনয়নে একাদশ সংসদ নির্বাচন করতে চন দলের ভাঙ্গা উপজেলা শাখার সভাপতি ও কৃষক নেতা আতাউর রহমান কালু। নিজের মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছি।’


মন্তব্য