kalerkantho


বর্ষবরণ

বটমূলে ‘শিকড়ের সন্ধান’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



বটমূলে ‘শিকড়ের সন্ধান’

ছবি: কালের কণ্ঠ

ভোর থেকেই পথে নেমেছিল রাজধানীর উৎসবমুখর মানুষের ঢল। বেশির ভাগের পরনেই ছিল বৈশাখের রঙিন পোশাক। সবার গন্তব্য যেন হয়ে উঠেছিল রমনা বটমূল। বরাবরের নিয়ম ধরে এখানে ছিল বর্ষবরণে ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী প্রভাতি সংগীতানুষ্ঠান। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে স্বাগত জানানো হয় ১৪২৫ বঙ্গাব্দকে। সুরে সুরে উচ্চারিত হয় মাটি ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা।

নববর্ষের দিনে শনিবার রমনা বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতি অনুষ্ঠানটি ছিল উৎসবের কেন্দ্র। ষাটের দশকের মাঝামাঝি পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠীর বাঙালি সংস্কৃতি দমনের চেষ্টা প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের ডাক দিয়ে ছায়ানট শুরু করেছিল নববর্ষে প্রভাতি অনুষ্ঠান। সেই থেকে এ আয়োজন হয়ে ওঠে বাঙালির ঐতিহ্য অন্বেষণের উৎসভূমি। এবার ছায়ানট আয়োজন করে ৫১তম বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।

রমনা বটমূলে বর্ষবরণ শুরু হয় বাঁশিতে ভোরের রাগালাপ দিয়ে। ছিল একক আর সম্মেলক গান। ছিল আবৃত্তিও। দেড় শতাধিক শিল্পীর দুই ঘণ্টার কিছু বেশি ব্যাপ্তিকালের প্রভাতি এই আয়োজন শুরু হয় ভোর সোয়া ৬টায়। বিশ্বমানব হওয়ার আগে শাশ্বত বাঙালি হওয়ার প্রত্যয়ে এবার বর্ষবরণের বিষয় নির্ধারণ করা হয় ‘বিশ্বায়নের বাস্তবতায় শিকড়ের সন্ধান’। সেই প্রত্যাশায় শিল্পীরা সুরে সুরে ও কথামালায় তুলে ধরেন শিকড়ের প্রতি ভালোবাসা।

অশ্বত্থ ছায়াবীথিতলে হাঁটু মুড়ে বিশাল মঞ্চে বসে পরিবেশনায় অংশ নেন প্রায় দেড় শ শিল্পী। মেয়ে শিল্পীরা পরেন নানা রঙের পাড়যুক্ত অফ হোয়াইট রঙের শাড়ি, ছেলে শিল্পীরা পরেন সিদ্ধ জলপাই রঙের পাঞ্জাবি। তাঁরা পরিবেশন করেন ১২টি সম্মেলক ও ১৬টি একক গান। এ ছাড়া ছিল আবৃত্তি পরিবেশনা।

প্রভাতি আয়োজনে ছায়ানট সভাপতি সন্জীদা খাতুন বলেন, ‘যে মাটি আমাদের পায়ের তলায় আশ্রয়, জন্মের শুভক্ষণে সেই মাটিতেই ভূমিষ্ঠ হয়েছি আমরা। জন্মসূত্রে এই মাটি আমাদের একান্ত আপন। সে মাটির বুকে শিকড়ের মতো পা ডুবিয়ে মাটি-মাতাকে জানব আমরা। এমন স্বভাবসম্মত প্রক্রিয়ায় বেড়ে উঠে আত্মপরিচয়ে প্রত্যয়ী আর প্রতিষ্ঠিত হব আমরা বাংলাভূমির সর্বজন।’

মর্তুজা কবিরের বাঁশিতে রাগ আহীর ভাঁয়রো পরিবেশনার মধ্য দিয়ে রমনা বটমূলে শুরু হয় জমকালো বর্ষবরণ আয়োজন। একক ও সম্মেলক কণ্ঠে সংগীত পরিবেশনা আর কবিতার পংক্তিমালায় ছায়ানটের শিল্পীরা স্বাগত জানান পহেলা বৈশাখকে। বাঁশির সুর শেষ হতেই একক সংগীত পর্বে অভয়া দত্ত পরিবেশন করেন ‘শুভ প্রভাতে পূর্ব গগনে’ গানটি। এরপর ছিল সুমা রানী রায়ের কণ্ঠে ‘প্রথম আলোর চরণধ্বনি’; খায়রুল আনাম শাকিলের ‘জাগো অরুণ ভৈরব’; সত্যম কুমার দেবনাথের ‘প্রাণের প্রাণ জাগিছে তোমারি প্রাণে’; সেঁজুতি বড়ুয়ার ‘তোমার হাতের রাখীখানি’। ফাঁকে ফাঁকে চলে ছায়ানটের শিশু ও বড়দের দলের সম্মেলক গানের পরিবেশনা।

এরপর সুস্মিতা দেবনাথ শুচি ‘আজি গাও মহাগীত’, মাহমুদুল হাসান ‘গঙ্গা সিন্ধু নর্মদা কাবেরী যমুনা ঐ’, লাইসা আহমেদ লিসা ‘জল বলে চল’, শামীমা নাজনীন ‘পৃথিবীজোড়া গান’, সেমন্তী মঞ্জরী ‘মালা হতে খসে পড়া’, এ টি এম জাহাঙ্গীর ‘তোমার দ্বারে কেন আসি’, শামীমা পারভিন শিমু ‘শ্যামলা বরণ বাংলা মায়ের’, মঈদুল ইসলাম ‘ধূলি পিঙ্গল জটাজুল মেলে’, নুসরাত জাহান রুনা ‘ও আমার বাংলাদেশের মাটি’ পরিবেশন করেন।

সম্মেলক গান পর্বে ছায়ানটের ‘বড়দের দল’ পরিবেশন করে ‘পূর্ব গগনভাগে দীপ্ত হইল সুপ্রভাত’, ‘ওই পোহাইল তিমিররাতি’, ‘শুভ সমুজ্জ্বল হে চির নির্মল’, ‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে’, ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন’, ‘ও আমার দরদী আগে জানলে’ গানগুলো। ‘ছোটদের দল’ পরিবেশন করে ‘প্রভাত বীণা তব বাজে’, ‘আজি নূতন রতনে’, ‘মেঘবিহীন খর বৈশাখে’, ‘এলো এলো রে বৈশাখী ঝড়’, ‘বাঁধন ছেঁড়ার সাধন হবে’ গান।

আবৃত্তিশিল্পী হাসান আরিফ পরিবেশন করেন হুমায়ুন আজাদের ‘শুভেচ্ছা’ কবিতাটি। প্রভাতি আয়োজনের একেবারে শেষ অংশে ছোট ও বড়দের দল যৌথভাবে পরিবেশন করে ‘ওরে আইল বৈশাখ নয়া সাজে’ গানটি। সংগীত ও আবৃত্তি শেষে রীতি অনুযায়ী জাতীয় সংগীত পরিবেশনায় শেষ হয় ছায়ানটের বর্ষবরণ আয়োজন।

 


মন্তব্য