kalerkantho


মনোনয়ন আলোচনায় শেখ রেহানাও

প্রসূন মণ্ডল, গোপালগঞ্জ   

১৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



মনোনয়ন আলোচনায় শেখ রেহানাও

বিগত সংসদ নির্বাচনগুলোর ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাই বিপুল ভোটে জয়লাভ করে আসছেন। স্থানীয়ভাবে বলা হয়ে থাকে যে আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত জেলা হিসেবে পরিচিত এ জেলায় বিএনপি বা অন্য দলগুলো নিয়ম রক্ষার নির্বাচন করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উপজেলা সদরে অথবা রাস্তার মোড়ে মোড়ে কিছু ব্যানার-পোস্টার লাগিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়া ছাড়া তাঁদের কোনো প্রচারও দেখা যায় না। সে কারণে প্রার্থী নিয়ে দেশের অন্যান্য স্থানে যেমন আলোচনা-সমালোচনা বা লবিং হয়ে থাকে এখানে সেটা হয় না। অবশ্য আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোপালগঞ্জ-১ আসনে চমক দেখা যেতে পারে। আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী হতে পারেন এমন দুজনের নাম বেশি শোনা যাচ্ছে। তাঁরা হলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট মেয়ে শেখ রেহানা ও আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ্র ভাগ্নে ব্যারিস্টার আলী আসিফ খান। এ দুজনের মধ্য থেকে একজনকে প্রার্থী করা হলে বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খানের মনোনয়ন এ আসনে অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বলে দলের স্থানীয় নেতাদের সূত্রে জানা গেছে।

কাশিয়ানী উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন, মুকসুদপুর উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গোপালগঞ্জ-১ আসন গঠিত।

এই নির্বাচনী এলাকার মুকসুদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র আতিকুর রহমান মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের অন্যান্য আসনের তুলনায় রাজনৈতিক কারণে গোপালগঞ্জের আসনগুলো একটু ব্যতিক্রম। কারণ গোপালগঞ্জ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্থান। এ এলাকার মানুষ মনেপ্রাণে বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসে, ভালোবাসে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক নৌকাকে। আতিকুর রহমান বলেন, ‘গোপালগঞ্জ-১ আসনে কেন্দ্রীয়ভাবে যাঁকে মনোনয়ন দেবে আমরা তাঁর হয়েই কাজ করব। পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রচার হয়েছে যে এই আসনে জাতির জনকের কনিষ্ঠ কন্যা নির্বাচনে অংশ নেবেন। যদি তা-ই হয় তাহলে আমরা তাঁর জন্যই কাজ করব। আর যদি তা না হয় তাহলে আমরা বর্তমান এমপি মুহাম্মদ ফারুক খানের নামই তৃণমূল থেকে সুপারিশ করব। কারণ তিনি গত চারটি নির্বাচনে সংসদ সদস্য হয়ে এলাকায় যে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন, নেতাকর্মী বা সাধারণ মানুষের সঙ্গে যে সম্পর্ক বা যোগাযোগ রেখেছেন, তাতে তাঁর নামই উঠে আসে।’

গোপালগঞ্জের অন্য দুটি আসনে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড না থাকলেও এ আসনেই একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগ : এ আসনে আগামী সংসদ নির্বাচনে নৌকার কাণ্ডারি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মুহাম্মদ ফারুক খানের। তিনি চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিমান মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত করে থাকেন তিনি। প্রতি মাসে দুই-একবার তিনি তাঁর নিজ নির্বাচনী এলাকায় আসেন, যোগ দেন নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে। এসব কারণে তাঁর জনপ্রিয়তা অটুট রয়েছে। তা ছাড়া তাঁর নির্বাচনী এলাকায় রাস্তাঘাট নির্মাণ, ব্রিজ-কালভার্ট, বিদ্যুৎ ও স্কুল-কলেজের উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। এসব বিবেচনায় আওয়ামী লীগ ফারুক খানকেই আবার মনোনয়ন দেবে বলে মনে করছেন এখানকার ভোটার ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা।

তবে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার নতুন মুখ আসার খবর শোনাচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, আওয়ামী লীগ থেকে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানা নির্বাচন করতে পারেন। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য মুকুল বোস, সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য উম্মে রাজিয়া কাজল, যুবলীগ নেতা শেখ আতিয়ার রহমান দিপু, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের অর্থ সম্পাদক কে এম মাসুদুর রহমান ও ব্যারিস্টার আলী আসিফ খান এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের টিকিট পাওয়ার চেষ্টা করছেন।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানে যে দল থেকে যে ব্যক্তিই অংশ নেন না কেন নৌকা প্রতীকই শেষ ভরসা। নৌকার মাঝি যিনি হবেন, তিনি নদী পার হতে পারবেন। অন্যরা দৌড়ে অনেক পেছনে থাকবেন।

যুবলীগ নেতা শেখ আতিয়ার রহমান দিপু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি গোপালগঞ্জ-১ আসনে নির্বাচনে অংশ নিতে ইতিমধ্যে এলাকায় কার্যক্রম শুরু করেছি। বিভিন্ন সমাজিক কর্মকাণ্ড অবদান রাখার পাশাপাশি সভা-সমাবেশে যোগ দিচ্ছি। উন্নয়ন ও সমাজ গঠনে ভূমিকা রেখেছি। এসব কারণে ভোটারদের কাছে আমার একটা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। আশা করি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী আমাকে মূল্যায়ন করবেন। তা না হলে নেত্রী যাঁকে এই আসনে মনোনয়ন দেবেন আমি তাঁর হয়ে নৌকা প্রতীকে ভোট চাইব।’

ব্যারিস্টার আলী আসিফ বলেন, ‘আমি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আহত হয়ে আমার মা এখন পঙ্গু। তা ছাড়া জাতির প্রতি আমাদের একটা দায়বদ্ধতা রয়েছে। আমি মনে করি, রাজনীতিতে আইন পেশার মানুষ আসুক। সেই তাগিদে আমি নির্বাচনে অংশ নিতে চাই। দলের সভাপতি যদি আমাকে মনোনয়ন দেন তাহলে আমি নির্বাচন করব।’ তিনি আরো বলেন, ‘সংসদে তরুণ নেতা নেই বললেই চলে। সেই শূন্যতা একটু হলেও আমি পূরণ করতে চাই।’

মুকসুদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক মো. হায়দার হোসেন বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যতবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রায় ততবারই এ আসন থেকে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে রয়েছে। এ আসনে দলের টিকিটে গত চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মুহাম্মদ ফারুক খান। দীর্ঘদিন ধরে সংসদ সদস্য থাকায় তাঁর সঙ্গে এলাকার নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষের একটা নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

হায়দার হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে যাঁরা আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে চান তাঁরা এমন কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত নন যে নেত্রী এই আসনে তাঁদের মনোনয়ন দেবেন। আগে জনগণের সেবা করতে হবে, তারপর জনপ্রতিনিধি হতে হবে।’

বিএনপি : এ আসনে বিএনপির টিকিটে নির্বাচন করার জন্য বেশ কয়েকজন প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। কেন্দ্রীয় বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও দলের গোপালগঞ্জ জেলা শাখার নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ সেলিমুজ্জামান সেলিম, সাবেক সভাপতি এফ ই শরফুজ্জামান জাহাঙ্গীরের নাম আলোচনায় আছে। তবে সেলিমুজ্জামান সেলিম ছাড়া আর কোনো নেতা মাঠে নেই। তিনি প্রতি মাসে এলাকায় এসে ভোটারদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করেন। মাঝেমধ্যে ঈদ-পূজার শুভেচ্ছাস্বরূপ ব্যানার-ফেস্টুন টাঙিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, যদি বিএনপি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তাহলে গোপালগঞ্জ-১ আসনে প্রার্থী হব।’ ১০ বছর ধরে জনসংযোগ করে আসছেন উল্লেখ করে সেলিমুজ্জামান সেলিম আরো বলেন, নিজের বংশ ও আত্মীয়-স্বজন মিলে তাঁর নিজ গ্রাম কাশিয়ানীর মহেশপুরে রয়েছে চার-পাঁচ হাজার ভোটার। এ ছাড়া ছাত্রদল, যুবদলসহ বিএনপির অঙ্গসংগঠনের পাঁচ-ছয় হাজার নেতাকর্মী রয়েছে।

অন্যান্য : বিরোধী দল জাতীয় পার্টির বিভারাণী মজুমদার নির্বাচন করবেন বলে ভোটারদের মধ্যে আলোচনা আছে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মিজানুর রহমান প্রার্থী হতে পারেন—এমনটাই জানাচ্ছে এলাকার লোকজন। তারা বলছে, মিজানুর রহমান এলাকায় জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ ছাড়া বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) মোশায়েদ হোসেন ঢালী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ-ইনু) মুকসুদপুর উপজেলা শাখার সভাপতি আজম শরীফ ও জাসদের (আম্বিয়া) শহীদুল আলম বাবর নির্বাচন করবেন বলে শোনা যাচ্ছে।



মন্তব্য