kalerkantho

ঐতিহ্য

নগরে বৈশাখী মেলা

নওশাদ জামিল   

১৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



নগরে বৈশাখী মেলা

বাংলা একাডেমির মেলায় দেশীয় ঐতিহ্যের ছোঁয়া। ছবি : কালের কণ্ঠ

মাঝারি আকারের একটি কাঠের বাক্স। লাল-সবুজ রঙের বাক্সটির চারদিকে ছোট ছোট খোপ। তাতে চোখ রাখলেই দেখা যাচ্ছে জাদুর খেলা। দেশের ঐতিহ্যবাহী নানা স্থাপনা যেমন দেখা যাচ্ছে, তেমনি দেখা যাচ্ছে দেশ-বিদেশের ছবি, আলোকচিত্রসহ নানা কিছু। এটি গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্যবাহী বায়োস্কোপ। বায়োস্কোপ যিনি দেখাচ্ছেন তাঁর নাম আব্দুল জলিল মণ্ডল। হাতে ডুগডুগি বাজিয়ে এক সুরে বলে চলেছেন, ‘বায়োস্কোপ দেখে যাও/আনন্দ নিয়ে যাও।’ শিশু-কিশোররা জনপ্রতি ২০ টাকার বিনিময়ে লাইন ধরে দেখছে বায়োস্কোপ।

বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত বৈশাখী মেলায় শুধু বায়োস্কোপ নয়; পুতুলনাচ, নাগরদোলাসহ হরেক দেশজ পণ্য নিয়ে রয়েছে এক জমজমাট আয়োজন। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) বাংলা একাডেমির সহযোগিতায় আয়োজন করেছে ১০ দিনের এই মেলা।

বাংলা নতুন বছর শুরুর দিনটিতে দেশের নানা স্থানে বৈশাখী মেলার আয়োজন বাঙালির সুদীর্ঘকালের ঐতিহ্য। মেলার শুরুটা গ্রামকেন্দ্রিক। তবে ধীরে ধীরে তা মফস্বল ও জেলা শহর ছাড়িয়ে বিভাগীয় এমনকি রাজধানী  ঢাকায়ও জায়গা করে নিয়েছে। ইট-পাথরের নগর রাজধানীতে আয়োজন করা হচ্ছে বৈশাখী মেলার। বাংলা একাডেমির সবুজ প্রাঙ্গণে অনেক বছর ধরেই বৈশাখের প্রথম দিনে শুরু হয় ভিন্নধর্মী বৈশাখী মেলা। এর ধারবাহিকতায় ছেদ পড়েনি এবারও।

বাংলা একাডেমি এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত মেলা শুরু হয়েছে গত শনিবার পহেলা বৈশাখ বিকেলে। গতকাল সোমবার বিকেলে একাডেমি প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, চারদিকে ছোট-বড় শতাধিক স্টল। প্রতিটি স্টলে থরে থরে সাজানো দেশজ নানা পণ্য। পাশেই কয়েকটি স্টলে বিক্রির জন্য রাখা মাটির তৈরি নানা পণ্য। এক স্টলে দেখা গেল তালপাতার হরেক রকম পাখা। নকশা করা প্রতিটি পাখার দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। আরেক স্টলে বাঁশের তৈরি বিভিন্ন পণ্য। পাশের স্টলে বিক্রি হচ্ছে পাটের তৈরি নানা ধরনের ব্যাগ। একাডেমির আমগাছের ছায়ায় বসে বাঁশের চালুনি তৈরি করছেন এক কুটির শিল্পী।

হাতে তৈরি বাঁশ ও বেতের পণ্য, মৃিশল্প, শখের হাঁড়ি, পটচিত্র, শোলার পণ্য, পিতলের পণ্য, পাটপণ্য, নকশি কাঁথা, মুখোশ, চাদর, কুশন, শতরঞ্চি, মাটির গয়না, রকমারি চুড়ি, ফিতা, তাঁত ও জামদানি শাড়ি, থ্রিপিস, পুঁতির মালা—কী নেই এই আয়োজনে! মেলায় রয়েছে নানা রকম খাদ্যপণ্য—মুরালি, মোয়া, কদমা-বাতাসা, মিঠাই, নানা ধরনের আচার ও মিষ্টান্ন।

ছোট্ট একটি স্টল ‘বিন্যাস’। তাতে দেখা গেল মাটির গয়না, রকমারি চুড়ি, ফিতা, মালার নানা সম্ভার। মাটি, পাট, কড়ি, কাগজ, রুদ্রাক্ষ দিয়ে তৈরি নানা গয়না। চাহিদাও ব্যাপক। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার জোবায়দা লাবণী বলেন, ‘দেশজ উপরকণ দিয়ে আমরা গয়না তৈরি করি। দিন দিনই চাহিদা বাড়ছে।’

বর্ধমান হাউসের সামনেই স্থাপন করা হয়েছে নাগরদোলা। সেখানে শিশু-কিশোরদের উপচে পড়া ভিড়। নাগরদোলায় চড়তে মূল্য ৩০ টাকা। পাশেই রয়েছে ‘হৃদয় ঝুমুর ঝুমুর পুতুলনাচ’। ৪০ টাকার টিকিট কেটে দেখা যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাচ।

কোনো কোনো স্টলে দেখা গেল কাঠের তৈরি নানা বাদ্যযন্ত্র—একতারা, দোতারা, খঞ্জনি, বাঁশি ও ঢোল। অন্দরসাজের নানা উপকরণও রয়েছে। বিভিন্ন সাইজের একতারার দাম ১০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা, খঞ্জনি ১০০ টাকা, দোতারা এক হাজার ৫০০ টাকা, ঢোল ১৫০ থেকে দুই হাজার টাকা। অন্দরসাজের উপকরণের মধ্যে রয়েছে সিরামিকসের শোপিস, কার্পেট, পাপোশ, ওয়াল র‌্যাক, শিকা, কাগজের ফুল ও পুতুল, শোলার তৈরি পাখি, মাটির ঘড়া, সরাচিত্র, লক্ষ্মীর ঝাঁপি, টেপা পুতুল, তামার থালা, ঘটিসহ নানা পণ্য।

মেলায় রয়েছে রকমারি দেশজ পোশাকের সম্ভার। ঢাকাই জামদানি ও তাঁতের শাড়ির পাশাপাশি কাঁথা স্টিচ, ব্লক-বাটিকের থ্রিপিস, টু পিস, ওয়ান পিসসহ নানা পোশাক। ভালো বিক্রি হচ্ছে নকশি কাঁথা, অ্যাপ্লিকের চাদর ও ওড়নাও। কাপড়ের তৈরি বাহারি সাইজের ব্যাগ আর পুঁতির মালাও বিক্রি হচ্ছে মেলায়।

মেলায় মৌসুমি ফলের শরবত আর দেশীয় খাবারের স্বাদ নিতে দেখা গেল অনেককে। তৃপ্তি আচার ঘর স্টলে রয়েছে ১৮ রকম আচার। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আবদুল্লাহ বলেন, ‘আচারের চাহিদা বেশ। গ্রাম থেকে নানা ফল সংগ্রহ করে আমি নিজেই আচার বানাই ও বিক্রি করি। আম, জলপাই, তেঁতুল, আমলকী, রসুন, চালতাসহ নানা আচারের বিক্রিও মন্দ নয়। ১০০ গ্রাম আচারের দাম ৪০ টাকা।’

মেলার সমাপনী দিন ২৩ এপ্রিল। মেলা চলবে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। প্রতিদিন সন্ধ্যায় থাকছে সাংস্কৃতিক আয়োজন। সব মিলিয়ে নগরজীবনে গ্রামীণ মেলার এক ভিন্নধর্মী স্বাদ।

 



মন্তব্য