kalerkantho


সুন্দরবনে পাঁচ বছরে আট নৌযানডুবি

কয়লাবোঝাই কার্গোর উদ্ধারকাজ শুরু হয়নি

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



কয়লাবোঝাই কার্গোর উদ্ধারকাজ শুরু হয়নি

ফাইল ছবি

মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলের হারবাড়িয়া এলাকায় ডুবে যাওয়া কয়লাবোঝাই জাহাজ উদ্ধারে গতকাল সোমবার বিকেলেও কোনো ধরনের তৎপরতা দেখা যায়নি। শনিবার গভীর রাতে চরে আটকে কাত হয়ে ডুবে যাওয়ার পর রবিবার দুপুরে শুধু জাহাজটির ডুবে যাওয়া স্থানটিতে মার্কিং স্থাপন করা হয়। তবে কার্গো জাহাজটি মূল চ্যানেলের বাইরে ডোবায় এ নৌপথ দিয়ে দেশি-বিদেশি জাহাজসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

গত পাঁচ বছরে সুন্দরবনের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের আটটি ছোট-বড় নৌযানডুবির ঘটনা ঘটেছে। সুন্দরবনের মধ্যে নৌযানডুবির ঘটনায় পরিবেশবিদরা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য নিয়ে নানা আশঙ্কার কথা বলে আসছেন।

কার্গোটি এরই মধ্যে ডুবে যাওয়া স্থান থেকে নদীর ভেতরের দিকে কয়েক ফুট সরে গেছে। পলিমাটিতে চাপা পড়তে শুরু করেছে। জোয়ারের সময় কার্গোটির ওপর দিয়ে কয়েক ফুট উচ্চতায় পানি প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল পরিবেশ অধিপ্তরের কর্মকর্তারা কার্গোটির স্থান থেকে পরীক্ষার জন্য নমুনা হিসেবে পানি সংগ্রহ করেছেন।

সুন্দরবনের অভ্যন্তরে এই কয়লাবোঝাই কার্গোডুবির ঘটনায় রবিবার বিকেলে মোংলা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন বন বিভাগের চাঁদপাই স্টেশন কর্মকর্তা কামরুল হাসান। চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শাহিন কবিরকে সোমবারের মধ্যে কার্গোডুবির ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে বন বিভাগের বাগেরহাট বিভাগীয় বন কর্মকর্তার দপ্তরে।

পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মাহামুদুল হাসান বলেন, প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি গতকাল দুর্ঘটনাকবলিত স্থান ঘুরে দেখেন। মাহমুদুল হাসান জানান, ভাটার সময় কার্গোটির পেছনের অংশ সামান্য দেখা গেলেও জোয়ারের সময় সাত থেকে আট ফুট উচ্চতায় কার্গোর ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। আর ওই পানি সুন্দরবনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। সোমবার বিকেল পর্যন্ত মালিকপক্ষ কার্গোটি উত্তোলনের কোনো কাজ শুরু করেনি।

তিনি আরো জানান, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে পশুর নদ। আর মোংলা বন্দরে জাহাজ চলাচলের জন্য মূল চ্যানেল হচ্ছে পশুর নদ। হারবাড়িয়া থেকে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে পশুর নদের পথে মোংলা বন্দরে জাহাজ চলাচল করে। আর সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নৌযান চলতে গিয়ে মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব নৌযানডুবির কারণে ক্ষতির মুখে পড়ে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মাহমুদ হোসেন বলেন, কয়লায় সালফার এবং ভারী ধাতব পদার্থ রয়েছে, যা ইকোসিস্টেমের জন্য ক্ষতিকর। সুন্দরবনের মধ্যে কয়লাবোঝাই কার্গো ডুবে থাকলে জলপ্রতিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এভাবে নৌযান ডুবে থাকলে চ্যানেলের গতিপথ পরিবর্তন হতে পারে। দেখা দিতে পারে নদীভাঙন। আর অনেক দিন ধরে নৌযান ডুবে থাকলে পলিমাটি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে পড়ে। তিনি দুর্ঘটনা এড়াতে নৌযানের ফিটনেস, দক্ষ চালক এবং নৌযানের ধারণক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই করার পরামর্শ দেন।

তবে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার কমান্ডার এম অলিউল্লাহ বলেন, ডুবে যাওয়া জাহাজে যে কয়লা আছে তা ‘নো সালফার’ কয়লা। এতে পানিদূষণ হবে না। মালিকপক্ষ সাত দিনের মধ্যে জাহাজটি উত্তোলন করতে পারবে বলে নিশ্চয়তা দিয়েছে। তাদেরকে দুর্ঘটনার পর থেকে ১৫ দিনের মধ্যে কার্গো জাহাজটি উত্তোলনের জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তারা এ নোটিশ কিংবা নির্দেশনা উপেক্ষা করলে আইনগত ব্যবস্থাসহ কার্গো মালিকানা বাতিল করে অন্য উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান দিয়ে ‘নো লস, নো প্রফিট’ চুক্তি ভিত্তিতে এটি অপসারণ করা হবে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কমোডর এ কে এম ফারুক হাসান বলেন, ডুবে যাওয়া নৌযানটি উদ্ধারে মালিকপক্ষ প্রয়োজনীয় ক্ষমতাসম্পন্ন বার্জসহ অন্যান্য মালামাল সংগ্রহ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই উদ্ধার তৎপরতা শুরু করবে বলে জানিয়েছে। এ ছাড়া জাহাজটি থেকে যাতে কোনো ধরনের বর্জ্য ছড়িয়ে পড়তে না পারে সে জন্য সদ্য ক্রয়কৃত বন্দরের নিজস্ব বর্জ্য অপসারণকারী জাহাজ পশুর ক্লিনার-০১-কে সেখানে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আশা করছি কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই জাহাজটি দ্রুত উত্তোলন করা সম্ভব হবে।’

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের তথ্য অনুসারে ২০১৩ সালের ১৪ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সুন্দরবনের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের আটটি নৌযানডুবির ঘটনা ঘটে। ২০১৩ সালের ১৪ মার্চ এমভি মোতাহার, ২০১৪ সালের ২৪ নভেম্বর এমভি শাহীদূত, একই বছরের ৯ ডিসেম্বর ফার্নেস অয়েলবাহী ট্যাংকার এমভি সাউদান স্টার-৭, ২০১৫ সালের ৬ মে এমভি জাবালে নুর, একই বছরের ২৮ অক্টোবর এমভি জিয়া রাজ, ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ এমভি সি হর্স-১, ২০১৭ সালের ১৩ জানুয়ারি এমভি আইজগাথী এবং সর্বশেষ ১৪ এপ্রিল এমভি বিলাস ডুবে গেল। পশুর চ্যানেলের হারবাড়িয়া-০৬ নম্বর অ্যাংকোরেজে (নোঙর) থাকা বিদেশি জাহাজ এমভি অবজারভেটর থেকে প্রায় ৭৭৫ টন কয়লা বোঝাই করে কার্গো জাহাজ এমভি বিলাস শনিবার দুপুর ২টার চ্যানেলের তীরের কাছাকাছি গিয়ে অবস্থান নেয়। রবিবার গভীর রাতে (৩টায়) ভাটার সময় এটি চরে আটকে কাত হয়ে ডুবে যায়।

আবারও কয়লাবাহী জাহাজডুবিতে সিপিবির উদ্বেগ সুন্দরবনের ভেতরে আবারও কয়লাবাহী জাহাজডুবির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। দলটির পক্ষ থেকে দ্রুত নদী থেকে কয়লা উদ্ধার ও দূষণ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।

গতকাল এক বিবৃতিতে সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম বলেন, ‘জনমত উপেক্ষা করে এমনিতেই সুন্দরবনের পাশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ, বড় বড় শিল্প-কলকারখানা গড়ে তোলা এবং বেআইনিভাবে লাল ক্যাটাগরির শিল্প স্থাপনাকে সবুজ দেখিয়ে ছাড়পত্র দেওয়াসহ নানাবিধ কারণে সুন্দরবন ধ্বংসের মুখে পড়েছে। এরপর নদী দিয়ে অবাধে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের কারণে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। একাধিকবার কয়লা ও তেলবাহী জাহাজডুবি পুরো সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সরকার মুখে সুন্দরবন রক্ষার কথা বললেও কার্যত সুন্দরবনকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে।’ প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য সরবরাহ করেছেন বাগেরহাট ও মোংলা প্রতিনিধি এবং নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা।

 


মন্তব্য