kalerkantho


বড় দুই দলের জন্য জোটের হিসাব-নিকাশ বড় চ্যালেঞ্জ

আহমেদ নূর, সিলেট   

১৭ মে, ২০১৮ ০০:০০



বড় দুই দলের জন্য জোটের হিসাব-নিকাশ বড় চ্যালেঞ্জ

সিলেট জেলার সীমান্তবর্তী দুই উপজেলা জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট নিয়ে সিলেট-৫ আসন গঠিত। এই আসন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের মনঃকষ্টের শেষ নেই। জোট-মহাজোটের কারণে নিজ দলের প্রার্থীদের বলি দিতে হয়েছে দুই দলকেই। তবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বলি হয়েছেন একবার আর বিএনপির প্রার্থী দুইবার। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে আর জোটের বলি হতে চায় না দুই দলের নেতাকর্মীরা। এবার তারা নিজেদের প্রতীকেই নির্বাচন করতে চায়। সে লক্ষ্যে দুই দলের নেতাকর্মীরা সমান তালে প্রচার চালাচ্ছে।

সিলেট-৫ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির সেলিম উদ্দিন, যিনি বর্তমানে সংসদে বিরোধীদলীয় হুইপ। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে এই আসনটি ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। একইভাবে অষ্টম ও নবম সংসদ নির্বাচনে শরিক জোট জামায়াতকে এ আসনটি ছেড়ে দিতে হয়েছিল বিএনপিকে।

একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এখন বড় দুই দলের কাছে জোটের হিসাব-নিকাশই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই আসনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রায় এক ডজন সম্ভাব্য প্রার্থী এখন মাঠে রয়েছেন। দল তিনটির অভ্যন্তরীণ কোন্দলও দিন দিন বাড়ছে। এই আসনে আওয়ামী লীগ বহু বলয়ে বিভক্ত। একই টানাপড়েনে আছে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। তবে সব কিছুর বাইরে এই আসনে জামায়াত একটা বড় ফ্যাক্টর। ২০০১ সালের নির্বাচনে জোটের প্রার্থী হিসেবে জামায়াত নেতা ফরিদউদ্দিন চৌধুরী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এবার জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হলেও তাদের প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। এর বাইরে কওমি মাদরাসাগুলোর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে এই আসনে।

আওয়ামী লীগ : নবম জাতীয় সংসদে এই আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন হাফিজ আহমদ মজুমদার। সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায়ই তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন ভবিষ্যতে আর নির্বাচন করবেন না। দশম সংসদ নির্বাচনে তাঁকে তাঁর প্রতিশ্রুতি থেকে ফিরিয়ে আনা যায়নি। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছিলেন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও জকিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাসুক উদ্দিন আহমদ। কিন্তু পরে জাতীয় পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগের ‘আসন ভাগাভাগির’ কারণে এ আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ফলে মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি আবারও দলের মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া এ আসনে দলের একাধিক আগ্রহী প্রার্থী মনোনয়ন চাইবেন। তাঁরা হলেন কেন্দ্রীয় যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আহমদ আল কবির, সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোস্তাক আহমদ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ও রমনা-শাহবাগ আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল মুনির চৌধুরী, কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের উপদেষ্টা আব্দুল মোমিন

চৌধুরী। তাঁদের মধ্যে আব্দুল মোমিন চৌধুরী ছাড়া বাকি সবাই জকিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা।

এই আসনে আওয়ামী লীগ নানামুখী কোন্দলে জর্জরিত। দীর্ঘদিন ধরে দুই উপজেলায় আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। আগামী নির্বাচনের আগে দলীয় কোন্দল নিরসন না হলে এর নেতিবাচক প্রভাব নির্বাচনে পড়তে পারে বলে নেতাকর্মীরা আশঙ্কা করছে। আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশের নেতাকর্মীরা মনে করে, এই আসনে আওয়ামী লীগের যোগ্য প্রার্থী হাফিজ মজুমদার। এলাকার শিক্ষা বিস্তারে তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করছেন। তাঁদের মতে, যেহেতু তিনি আর নির্বাচন করবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন এখন তাঁকে কিভাবে নিয়ে আসা যায়, সেটা দলকে ভাবতে হবে।

জকিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি লোকমান উদ্দিন চৌধুরীও বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘হাফিজ আহমদ মজুমদার সাহেব বলেছেন তিনি আর নির্বাচন করবেন না। এর পরও যদি তাঁকে কোনোভাবে নির্বাচনে আনা যায় তাহলে আওয়ামী লীগের জয় নিশ্চিত।’

আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চাওয়ার কথা স্বীকার করে মাসুক উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জননেত্রী শেখ হাসিনার ওপর আমার আস্থা আছে। গত নির্বাচনেও তিনি আমাকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। পরে দলের স্বার্থে আমি মনোনয়ন প্রত্যাহার করি।’ নিজেকে দলের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী দাবি করে তিনি বলেন, মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

কেন্দ্রীয় যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আহমদ আল কবিরের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, আগামী নির্বাচনে তিনি দলের মনোনয়ন চাইবেন। দল থেকে মনোনয়ন পেলে তিনি নির্বাচন করবেন। সে লক্ষ্যে তিনি কাজও করে যাচ্ছেন।

দলের নেত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী মাঠে কাজ করছেন উল্লেখ করে মোস্তাক আহমদ বলেন, ‘আমি অনেক আগে থেকেই দলের কাছে মনোনয়ন চাচ্ছি। এবারও মাঠে কাজ করছি।’

জকিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার খলিল উদ্দিনের মতে, স্থানীয় রাজনীতিতে হাফিজ মজুমদার ও মোস্তাক আহমদ বিতর্কের ঊর্ধ্বে রয়েছেন। এ ছাড়া অন্য কোনো প্রার্থীকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়া হলে স্থানীয় গ্রুপিং-কোন্দলের কারণে জয়লাভ কঠিন হবে।

বিএনপি : জাতীয় সংসদের অষ্টম ও নবম নির্বাচনে এই আসনে বিএনপির কোনো প্রার্থী ছিল না। চারদলীয় জোটের শরিক জামায়াতকে আসনটি ছেড়ে দিতে হয়েছিল বিএনপিকে। কিন্তু একাদশ নির্বাচনে কোনো ছাড় দিতে নারাজ দলের নেতাকর্মীরা। অবশ্য রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় এ ব্যাপারে তারা আরো বেশি আশাবাদী। এবার বিএনপির প্রার্থীই এই আসনে মনোনয়ন পাবেন বলে তারা বিশ্বাস করে। এখন পর্যন্ত এই আসনে দলের মনোনয়ন দাবিদার তিনজন। তাঁরা তিনজনই জেলা বিএনপির সহসভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন। আবার তিনজনেরই বাড়ি নির্বাচনী আসনের কানাইঘাট উপজেলায়। তাঁরা হলেন সাবেক সংসদ সদস্য আবুল কাহির চৌধুরী, খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর ভাই কানাইঘাট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন।

প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে আগ্রহের বিষয়ে আবুল কাহির চৌধুরী বলেন, ‘আমরা ধানের শীষ প্রতীকে জামায়াতের কোনো প্রার্থী চাই না। দলের নেতাকর্মীরা এই আসনে ধানের শীষ প্রতীক চায়।’ তিনি নিজে এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন উল্লেখ করে বলেন, দল থেকে মনোনয়ন পেলে অবশ্যই তিনি নির্বাচন করবেন।

অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের (চাকসু) সাবেক আপ্যায়ন বিষয়ক সম্পাদক মামুনুর রশিদ মামুন প্রায় একই সুরে বলেন, ‘অনেক দিন ধরে দলের প্রার্থী না থাকায় নেতাকর্মীরা হতাশায় ভুগছে। তা ছাড়া আমি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কাজ করছি। তাই আগামী নির্বাচনে দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে আগ্রহী।’ দল নির্বাচনে গেলে বিএনপি তাঁকেই মনোনয়ন দেবে বলে আশা করছেন তিনি।

জকিগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ইকবাল আহমদ বলেন, ‘দল যাঁকে মানোনয়ন দেবে আমরা তাঁকে বিজয়ী করতে কাজ করব। তবে দলের নেতাকর্মীরা আগামী নির্বাচনে এই আসনে ধানের শীষ প্রতীকেই ভোট দিতে চায়।’

জাতীয় পার্টি : দশম সংসদ নির্বাচনে এই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ছিলেন দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শাব্বির আহমদ। অন্যদিকে দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব সেলিম উদ্দিনের বাড়ি সিলেট-৬ আসনের বিয়ানীবাজার হলেও তিনি এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দাখিল করেছিলেন। পরে দলের সিদ্ধান্তে শাব্বির আহমদ মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন এবং সেলিম উদ্দিন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আগামী নির্বাচনে আবারও এই আসনে দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে চান সেলিম উদ্দিন। কিন্তু এবার তাঁকে ছাড় দিতে নারাজ শাব্বির আহমদ। তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছেন। এ ছাড়া দলের কেন্দ্রীয় সদস্য শিল্পপতি সাইফুদ্দিন খালেদও এই আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলার বিভিন্ন এলাকা নিয়মিত চষে বেড়াচ্ছেন। গণসংযোগ ও মতবিনিময় করছেন নেতাকর্মীদের নিয়ে। দল গোছানোর কাজেও মন দিয়েছেন দুই বছর ধরে। সাইফুদ্দিন খালেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ আসনে জাতীয় পার্টি নির্বাচিত হতে হলে জকিগঞ্জ-কানাইঘাটের বাসিন্দা এমন কাউকে প্রার্থী দিতে হবে।’

অন্যান্য দল : এই আসনে কওমি মাদরাসাগুলোর একটি বড় প্রভাব রয়েছে। ১৯৯১ সালে খেলাফত মজলিসের উবায়দুল হক উজিরপুরী এ আসন থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। আবার ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে জামায়াতের ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী এই আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আগামী নির্বাচনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা ফরিদ উদ্দীন চৌধুরী স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

সিলেট মহানগর জামায়াতের আমির এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘এই আসন বিএনপি জোটের শরিক জামায়াত পেয়ে আসছে। আগামী দিনেও এটি থাকবে বলে আশাবাদী।’ নিবন্ধন না থাকায় দলীয়ভাবে জামায়াত নির্বাচন করতে না পারলে স্বতন্ত্রভাবে দলের প্রার্থী নির্বাচন করবেন বলেও তিনি জানান।

এ ছাড়া ইসলামী অন্য দলগুলোও এ আসনে প্রার্থী দেবে বলে জানা গেছে। যুক্তরাজ্য খেলাফত মজলিসের যুগ্ম সম্পাদক এনামুল হাসানকে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। আবার জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক উবায়দুল্লাহ ফারুক, ইউরোপ জমিয়তের নেতা আবদুল হাফিজ ও সিলেট মহানগর জমিয়ত নেতা আবদুর রহমান সিদ্দিকীর নামও সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় রয়েছে। পাশাপাশি আঞ্জুমানে আল ইসলাহর সভাপতি হুসামুদ্দিন চৌধুরীও প্রার্থী হতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে।

 

 


মন্তব্য