kalerkantho


১২ লাখের জন্য দুই কোটি টাকার বাড়ি দখল!

যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে মামলা নিচ্ছে না পুলিশ

এস এম আজাদ   

১৭ মে, ২০১৮ ০০:০০



১২ লাখের জন্য দুই কোটি টাকার বাড়ি দখল!

রাজধানীর পল্লবীর পলাশনগরে তিন ব্যক্তির কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিল একটি পরিবার। ওই টাকার লেনদেন মিটমাট করার কথা বলে পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানা সাড়ে পাঁচ কাঠা জমিসহ তাঁদের বাড়ি দখল করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। পল্লবী থানায় বারবার অভিযোগ করলেও পুলিশ মামলা নিচ্ছে না বলে জানান তাঁরা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জুয়েল রানা তাঁদের জিম্মি করে স্ট্যাম্পে সই নিয়ে নেন। সম্প্রতি নিজের নামে সাইনবোর্ড লাগিয়ে প্রায় দুই কোটি টাকার বাড়িটি দখল করে নিয়েছেন তিনি। সেখানে এখন তাঁর লোকজন পাহারা দিচ্ছে।

তবে অভিযুক্ত জুয়েল রানা বলছেন, তিনি ১২ লাখ টাকা পান, যে টাকা বাড়িটির বায়না হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। স্ট্যাম্পের শর্ত অনুযায়ী, ৬৫ লাখ টাকায় বাড়ির দলিল দিতে হবে মালিকপক্ষকে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পল্লবীর পলাশনগর সড়কঘেঁষা ৬ নম্বর প্লটে সাড়ে পাঁচ কাঠা জমির মধ্যে দোতলা বাড়িটি। এর বড় একটি অংশই খোলা জায়গা। পেছনে যুবলীগ নেতা জুয়েলের খালি প্লটে রিকশার গ্যারেজ।

পারিবারিক ওই সম্পত্তির মালিক কয়েকজন। অন্যতম অংশীদার মাহবুব হাসান জানান, স্থানীয় স্বপন, রিয়াদ ও বাবুর কাছ থেকে তাঁরা ১২ লাখ টাকা ঋণ করেছিলেন। ওই লেনদেন মেটানোর নামে জুয়েল রানা ঘোষণা দেন তিনি তিন পাওনাদারকে টাকা দিয়ে দেবেন। তিন ব্যক্তিকে মাহবুব হাসানদের কাছ থেকে টাকা না নিতে বলেন। একদিন অস্ত্র ঠেকিয়ে জুয়েল রানা ও তাঁর লোকজন মাহবুবকে হত্যার হুমকি দিয়ে সাদা স্ট্যাম্পে সই করিয়ে নেন।

ওই চুক্তিতে বলা হয়, ঋণের ১২ লাখ টাকার দায়দায়িত্ব জুয়েল রানার। তিনিই এই টাকা পরিশোধ করবেন। আর সুদ হিসেবে প্রতি মাসে দোতলার দুটি ও নিচতলার একটি রুমের ভাড়া আদায় করবেন ওই যুবলীগ নেতা।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী মাহবুব হাসান বলেন, ‘প্রভাব খাটিয়ে জুয়েল রানা আমাদের দুই কোটি টাকার সম্পদ দখল করে নিচ্ছে। এ জন্য টাকার লেনদেনের একটা নাটক তৈরি করেছে। আর লেনদেনের সমস্যা আমার সঙ্গে। পৈতৃক সম্পত্তি হওয়ায় জমির মালিক তো আরো কয়েকজন।’

তবে জুয়েল রানার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন ভিন্ন কথা। তাঁর ভাষ্য, ‘আমি সরাসরি তাঁদের কাছে ১২ লাখ টাকা পাই। এ নিয়ে অনেক সালিস-দরবার হয়েছে। টাকা দেয়নি। পরে স্ট্যাম্প দিয়েছে। তিন মাসের মধ্যে ১২ লাখ টাকা না দিতে পারলে ওই টাকা বাড়ির বায়না হবে। আর ৬৫ লাখ টাকায় জমির দলিল দিয়ে যেতে হবে!’

অন্যের পাওনা টাকা বাড়ি বিক্রির বায়না কী করে হয়—জানতে চাইলে জুয়েল রানা বলেন, ‘আমার কাছে সব প্রমাণ আছে। আমি জোর করে দখল করিনি। তাঁরা মিথ্যা বলছে।’

মাহবুব হাসানের স্ত্রী লিপি আক্তার বলেন, ‘জুয়েল রানা তার জমি বড় করতে টার্গেট করে আমাদের পারিবারিক সম্পত্তি দখল করেছে। আমার স্বামীকে পিস্তলের মুখে জিম্মি করে সাদা স্ট্যাম্পে সই করিয়ে নেয়। গত ১৮ মার্চ জুয়েল রানার লোকজন বাড়ির ভেতরে বালু দিয়ে ভরাট করে। ওই দিন পল্লবী থানায় অভিযোগ করলেও পুলিশ মামলা নেয়নি।’

লিপি জানান, গত রবিবার রাত ১২টার পর মেহেদী হাসান, রিয়াজ, বাবুসহ জুয়েলের কয়েকজন সহযোগী তাঁদের বাসার আসবাব লুটপাট করে ভেতরে বস্তির লোকজনকে তোলে। ওই সময় তারা কেউ বাড়িতে ছিলেন না। খবর পেয়ে তাঁরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন দিলে পুলিশ ও র্যাব ঘটনাস্থলে আসে। পুলিশ সাত-আট নারী-পুরুষকে সেখান থেকে আটক করলেও রাতেই ছেড়ে দেয়। এর পর থেকে গতকাল পর্যন্ত তাঁরা দফায় দফায় পল্লবী থানায় গেলেও পুলিশ মামলা নেয়নি অভিযোগ করেন লিপি।

সরেজমিনে গিয়ে দোতলা বাড়িটির ভেতরে লোকজন থাকতে দেখা গেছে। তবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা তিন-চার যুবক ভেতরে ঢুকতে বাধা দিয়েছে।

স্থানীয়রা জানায়, ভেতরে চারটি পরিবার বসবাস করছে, দখলের জন্য যাদের তোলা হয়েছে। কারণ জুয়েল বাড়িতে থাকতে বললেও তাদের ভাড়ার ব্যাপারে কিছু বলেননি। সামনে পাহারা দিচ্ছে জুয়েলেরই সহযোগীরা।

অভিযোগ না নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পল্লবী থানার ওসি দাদন ফকির বলেন, ‘ওই পক্ষের কাছে জুয়েল রানা ১২ লাখ টাকা পায়। এটা নিয়ে ঝামেলা। তারা স্ট্যাম্পে লিখে দিয়েছে বাড়ি দেবে। এর মধ্যে নাকি জুয়েলের লোকজন সেখানে গেছে। তারা থানায় আসছিল, তবে আমি ছিলাম না।’

ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা ও আইনগত সমাধানের ব্যাপারে জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘বাড়ি না দিলে টাকা দিয়ে দিলেই তো ঝামেলা শেষ হয়ে যায়!’


মন্তব্য