kalerkantho


তিস্তা চুক্তি ঝুলে আছে ভারতের রাজনীতিতেই

মেহেদী হাসান   

১৮ মে, ২০১৮ ০০:০০



তিস্তা চুক্তি ঝুলে আছে ভারতের রাজনীতিতেই

ভারতের রাজনৈতিক মহলেই ঝুলে আছে প্রস্তাবিত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনো চুক্তি সইয়ের ব্যাপারে রাজি নন। অন্যদিকে তাঁকে রাজি করাতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষ কোনো উদ্যোগও দৃশ্যমান নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ সফরের প্রাক্কালে বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সূত্রগুলো এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

ভারতীয় সূত্রগুলো বলছে, তিস্তা চুক্তির ক্ষেত্রে এখনো ‘ভেটো’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। চুক্তির বিষয়টি এখন কূটনৈতিক পর্যায়ে নেই। এটি আছে রাজনৈতিক পর্যায়ে। রাজনীতিকরা সিদ্ধান্ত দিলেই কূটনৈতিক পর্যায়ে তা বাস্তবায়ন করা হবে।

অন্যদিকে বাংলাদেশি সূত্রগুলো বলছে, তিস্তা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এমন কথা ভারতের শীর্ষ পর্যায়কে সাম্প্রতিক সময়ে জানানো হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে আগামী নির্বাচনের প্রাক্কালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখানোর জন্য তিস্তা চুক্তি সইয়ের জোর চেষ্টা রয়েছে। চুক্তি সইয়ের জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুত। এখন ভারতের উদ্যোগের ওপরই এটি নির্ভর করছে।

গত বছর এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের পর গত ১৯ এপ্রিল লন্ডনে কমনওয়েলথ সরকারপ্রধান পর্যায়ের সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তিনি বৈঠক করেন। এর প্রায় পাঁচ সপ্তাহ পর আগামী ২৫ মে পশ্চিমবঙ্গে বৈঠকে বসছেন তাঁরা। ওই বৈঠক উপলক্ষে দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিব, হাইকমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও পশ্চিমবঙ্গে সমবেত হচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির মধ্যে বৈঠকটি শান্তিনিকেতনে নবনির্মিত বাংলাদেশ ভবনে অনুষ্ঠিত হবে। ওই ভবন নির্মাণে বাংলাদেশ সরকার ২৫ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। বৈঠকের আগে দুই প্রধানমন্ত্রী যৌথভাবে বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধন করবেন।

শেখ হাসিনা-নরেন্দ্র মোদি বৈঠকে তিস্তা চুক্তি ইস্যুতেও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। তবে ওই বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উপস্থিত থাকবেন না বলে জানা গেছে। মমতার সঙ্গে শেখ হাসিনার আলাদা বৈঠক হবে কি না তাও নিশ্চিত নয়। ধারণা করা হচ্ছে, তিস্তা ইস্যু এড়াতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে যোগ দিচ্ছেন না। 

ভারতীয় কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন বৈঠকগুলো থেকে কী ফল আসবে সে বিষয়ে আগে থেকে আঁচ করার সুযোগ নেই। তবে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে বারবার বলা হয়েছে, তিস্তা চুক্তি সই না হলেও পানিপ্রবাহে কোনো বাধা দেওয়া হচ্ছে না।

দুই প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন বৈঠকে সমসাময়িক ইস্যু হিসেবে রোহিঙ্গা সংকটও বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শেখ হাসিনার পশ্চিমবঙ্গ সফরের আগে গত সপ্তাহে মিয়ানমার সফর করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। সেখানে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

বাংলাদেশি কূটনীতিকরা বলছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত তার অবস্থান বদলেছে। বর্তমানে ভারতের যে অবস্থান তা বাংলাদেশের অবস্থানের কাছাকাছি। বিশেষ করে ভারতও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছে। ভারত স্পষ্ট বলেছে, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে এ সংকট সমাধান হতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি : জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ২৫ মে সকালে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে কলকাতায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছবেন। প্রায় একই সময়ে নয়াদিল্লি থেকে সেখানে আসবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এরপর তাঁরা দুজনই হেলিকপ্টারযোগে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বোলপুরে যাবেন। সেখানে তাঁরা শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তনে অংশগ্রহণের পর নবনির্মিত বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধন করবেন।

২৫ মে দুপুরে বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধনের পর সেখানে সভাকক্ষে বৈঠক করবেন শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি। শান্তিনিকেতন থেকে নয়াদিল্লি ফিরে যাবেন নরেন্দ্র মোদি। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিন বিকেলে শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় ফিরবেন। পথিমধ্যে তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বাসভবন এবং জাদুঘর পরিদর্শন করবেন। ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী সেদিন সন্ধ্যায় কলকাতায় তাজ বেঙ্গল হোটেলে ইফতার পার্টির আয়োজন করেছেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যোগ দেবেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও এতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ইফতারের পর প্রধানমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্ভাবনা বিষয়ে বৈঠক করবেন।

প্রধানমন্ত্রী আগামী ২৬ মে পশ্চিম বর্ধমানের অন্ডালে কাজী নজরুল ইসলাম বিমানবন্দরে যাবেন। সেখান থেকে তিনি সড়কপথে আসানসোলে গিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে যোগ দেবেন। ওই সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে সম্মানসূচক ডি-লিট দেবে বিশ্ববিদ্যালয়টি। অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী কলকাতায় ফিরবেন। সেখানে তিনি জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে যাবেন। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা শেষে সেদিন রাতেই তাঁর ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে।


মন্তব্য