kalerkantho


প্রার্থী নিয়েই চ্যালেঞ্জে আ. লীগ সুযোগে বিএনপি-জাপা

শাহ ফখরুজ্জামান, হবিগঞ্জ   

২৭ মে, ২০১৮ ০০:০০



প্রার্থী নিয়েই চ্যালেঞ্জে আ. লীগ সুযোগে বিএনপি-জাপা

হবিগঞ্জ-৪ আসনটি সিলেট বিভাগের প্রবেশদ্বার চুনারুঘাট ও মাধবপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত। চা বাগানবেষ্টিত আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে আওয়ামী লীগের দখলে। এতে ভূমিকা রাখছে চা শ্রমিকদের ভোটব্যাংক। তাই এখানে নির্বাচনী লড়াইয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়ন।

আগামী সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন একাধিক নেতা। এতে চাপে রয়েছেন আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য মাহবুব আলী। আর আওয়ামী লীগের এ লড়াইয়ের সুযোগ নিতে চায় বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। বিএনপি থেকে বারবার মনোনয়ন পাওয়া দলের জেলা শাখার সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সল সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য আতিকুর রহমান আতিক হবিগঞ্জ-৩ আসনে নির্বাচন না করে এ আসনে নির্বাচন করতে চান।

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী প্রয়াত এনামুল হক মোস্তফা শহীদ ছয়বার এ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে দুইবার জাতীয় পার্টির সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার বিজয়ী হন। তিনি কৃষি প্রতিমন্ত্রীও ছিলেন। এ ছাড়া ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ মুহিবুল হাসান নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সল বিজয়ী হন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি না থাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ তানভীরের সঙ্গে খুব সহজেই জিতে যান আওয়ামী লীগের মাহবুব আলী।

আওয়ামী লীগ : দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতাসীন দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীদের বেশির ভাগ সংসদ সদস্য মাহবুব আলীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। দল থেকে মনোনয়ন পাওয়ার লড়াইয়ে আছেন মাধবপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির হোসেন চৌধুরী অসীম, দলের চুনারুঘাট উপজেলা শাখার সভাপতি সাবেক সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) এম আকবর হোসেন জিতু, মাধবপুর উপজেলা শাখার সভাপতি ও সাবেক মেয়র এস এম মুসলিম, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন, প্রয়াত এনামুল হক মোস্তফা শহীদের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের নেতা নিজামুল হক মোস্তফা শহীদ রানা, শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান (অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি) মো. আব্দুল হাইয়ের ছেলে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা আরিফুল হাই রাজিব, চুনারুঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. আবু তাহের।

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি চুনারুঘাট ও মাধবপুর উপজেলার মধ্যবর্তী স্থান সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে দলের দুই উপজেলার বিভিন্ন ইউনিটের নেতারা সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে এক সভা আয়োজন করেন। তাঁরা একাদশ সংসদ নির্বাচনে বর্তমান সংসদ সদস্য মাহবুব আলীকে মনোনয়ন না দিয়ে দলের অন্য যে কাউকে মনোনয়ন দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অনুরোধ জানান। এ সভার পর থেকে সেখানে আওয়ামী লীগে বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে যায়। এলাকায় ভালো মানুষ হিসেবে খ্যাতি থাকলেও বর্তমান সংসদ সদস্য মাহবুব আলীর বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকর্মীদের রয়েছে অনেক ক্ষোভ। তাদের অভিযোগ, সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ কিছু লোক ছাড়া কোনো পর্যায়ের নেতাকর্মীরই মূল্যায়ন নেই তাঁর কাছে। তাই দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও সংসদ সদস্যের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

চুনারুঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান এমপির সঙ্গে দলের কোনো নেতাকর্মী নেই। তিনি নিজেও ঢাকায় থেকে আইন পেশায় ব্যস্ত থাকেন। এলাকার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কম। তাঁকে ছাড়া যে কাউকে দলীয় প্রার্থী করা হলে দলের নেতাকর্মীরা মেনে নেবে। অন্যথায় এ আসনটি আওয়ামী লীগের জন্য ধরে রাখা কষ্ট হবে।’

এসব অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে সংসদ সদস্য মাহবুব আলী বলেন, ‘আগামী নির্বাচনেও আমি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাব। যে কেউ মনোনয়ন চাইতেই পারে। দলের নেতাকর্মীরাও আমার সঙ্গে রয়েছে।’

মাহবুব আলী জানান, তাঁর বাবা মওলানা আসাদ আলীও সংসদ সদস্য ছিলেন। আওয়ামী লীগের দুর্দিনে তিনি কাজ করেছেন। এর ধারাবাহিকতায় তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর সাধারণ মানুষসহ নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখেছেন এবং দুই উপজেলায় ব্যাপক উন্নয়নকাজ করেছেন। মনোনয়নপ্রত্যাশী কিছু নেতা তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার করে আসছেন। তৃণমূল নেতাকর্মী ও এলাকার মানুষের সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক রয়েছে বলেও দাবি করেছেন সংসদ সদস্য।

জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাকির হোসেন চৌধুরী অসীম বলেন, ‘আমি জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। বিপুল ভোটে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর ভালো কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের শ্রেষ্ঠ উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলাম। আমার চাচা দুলাল চৌধুরী ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক।’

তৃণমূল নেতাকর্মী ও এলাকার মানুষের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক রয়েছে জানিয়ে অসীম বলেন, মনোনয়ন পেলে এ আসনে নিশ্চিত জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।

আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী আকবর হোসেন জিতু জানান, এর আগেও তিনি দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। মনোনয়ন না পেলেও দলের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে কাজ করেছেন। এলাকার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ দলের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সব কর্মকাণ্ডে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং সহযোগিতা করেন। তাই আগামী নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।

সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি এলাকায় স্বেচ্ছাশ্রমে রাস্তা, সেতু সংস্কার, বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলায় অংশ নিয়ে এলাকায় চমক সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ তরুণ নেতৃত্বের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তাই নতুন প্রজন্মের একজন কর্মী হিসেবে দল আমাকেই মনোনয়ন দেবে।

নিজামুল হক (রানা) জানান, তাঁর বাবা সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী এনামুল হক মোস্তফা শহীদ এ আসনে ছয়বার নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি মন্ত্রী ছিলেন। কেন্দ্রীয়ভাবে তিনি সবুজ সংকেত পেয়েছেন।

নিজামুল হক যুক্তি দিয়ে বলেন, চুনারুঘাট থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হলে সহজেই জয়লাভ করা সম্ভব। কারণ চুনারুঘাটে আওয়ামী লীগের ভোট বেশি।

মনোনয়নপ্রত্যাশী শাহ মো. মুসলিম তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনিও মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।

বিএনপি : ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচন থেকে এ পর্যন্ত প্রায় সব নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পাচ্ছেন দলের জেলা শাখার সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সল। আগামী নির্বাচনেও তিনি দলের মনোনয়ন পাবেন বলে মনে করছে তৃণমূল নেতাকর্মীরা। তবে বিএনপির মনোনয়ন লড়াইয়ে আছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য শাম্মী আক্তার শিপা এবং জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান।

মাধবপুর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন আল রনি কালের কণ্ঠকে বলেন, আগামী নির্বাচনে সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সলকেই দলীয় প্রার্থী হিসেবে চায় দলের নেতাকর্মীরা। সৈয়দ ফয়সল প্রার্থী হলে এ আসনে তাঁরা জয়লাভ করবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। এর কারণ হিসেবে তিনি দলের শক্ত সাংগঠনিক অবস্থান এবং বিগত স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে দলের সফলতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের বিভক্তি তাঁদের অনুকূলে যাবে বলে মনে করেন তিনি।

জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও মাধবপুর উপজেলা চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. শাহজাহান বলেন, ‘বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি না, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ নিয়ে দল নির্বাচন কমিশন ও সরকারের কাছে বিভিন্ন দাবি পেশ করছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই মাধবপুর-চুনারুঘাটে তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপিকে সংগঠিত করে যাচ্ছি। এরই ধারাবাহিকতায় গত উপজেলা নির্বাচনে উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে আমরা বিজয়ী হয়েছি।’

শাম্মী আক্তার শিপা বলেন, ‘দেশে এখন সাধারণ মানুষের ভোটের অধিকার ও গণতন্ত্র নেই। গণতন্ত্রের মা খালেদা জিয়াকে অন্যায়ভাবে জেলে বন্দি করে রাখা হয়েছে। তাই আগামী নির্বাচন খালেদা জিয়াকে মুক্তি ছাড়া সম্ভব নয়। আমি হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজার আসনে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ছিলাম। আমি এমপি থাকাকালীন চুনারুঘাট-মাধবপুরে ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। তাই দল আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি এই আসনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হব।’

মিজানুর রহমান মিজান বলেন, ‘আমি ছাত্রদলের মাধ্যমে বিএনপির রাজনীতি শুরু করি। অনেকবার জেল-জুলুমেরও শিকার হয়েছি। এবারের নির্বাচনে দলের একজন পরীক্ষিত সৈনিক হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ার প্রত্যাশা করছি।’

এ ছাড়া বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামীর হবিগঞ্জ জেলা শাখার আমির কাজী মুখলিছুর রহমানের বাড়ি চুনারুঘাট উপজেলায়। তিনিও আগামী নির্বাচনে জোটের প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জোটের অন্য শরিক খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদেরের (বাচ্চু) বাড়ি মাধবপুর উপজেলায়। এ আসন থেকে তাঁরও প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জাতীয় পার্টি : বর্তমান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির মনোনয়নপ্রত্যাশী আতিকুর রহমান আতিক ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি এই নির্বাচনে জয়লাভের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 


মন্তব্য