kalerkantho


বিশুদ্ধ ইফতারি

যাত্রীর হাতে হঠাৎ প্যাকেট

শওকত আলী   

২৭ মে, ২০১৮ ০০:০০



যাত্রীর হাতে হঠাৎ প্যাকেট

স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে ইফতারসামগ্রী প্যাকেটজাত করছেন আহ্ছানিয়া মিশনের কর্মীরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

গুলিস্তান-ধামরাই রুটের একটি বাসে গুলিস্তানের দিকে যাচ্ছিলেন আহসান কবীর। রাস্তায় যানজট খুব একটা ছিল না, তবে সিগন্যালগুলোতে কিছু সময় করে থামতে হচ্ছিল। বাসটি যখন ২৭ নম্বরের ঠিক আগে তখন ইফতারের বাকি প্রায় ২৫ মিনিট। তিনি চিন্তা করছিলেন ইফতারের আগে গুলিস্তান পৌঁছতে পারবেন কি না। না পারলে কি বাস থেকে কোথাও নেমে গিয়ে ইফতার করবেন! মনের মধ্যে এমন ভাবনা যখন তখন বাসটি শুক্রাবাদ বাসস্ট্যান্ডে যাত্রী ওঠানো-নামানোর জন্য দাঁড়ায়। এ সময় বস্তা হাতে দুজন ওঠেন বাসে। তাঁরা জানান, রোজাদারদের জন্য ইফতার নিয়ে এসেছেন। অনেক বাসযাত্রীর সঙ্গে তিনিও সেই ইফতার গ্রহণ করেন।

এভাবেই কালের কণ্ঠ’র কাছে এই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন আহসান কবীর। তিনি জানান, সেই ইফতারিও ছিল তেল-ঝাল ছাড়া বিশুদ্ধ ইফতার। ঢাকা

আহ্ছানিয়া মিশনের বিতরণ করা এই ইফতারের প্যাকেটে ছিল চারটি খেজুর, একটি রুটি, আধালিটারের এক বোতল পানি আর ছোট এক প্যাকেট বিস্কুট।

আহসান কবীর বলেন, ‘ঢাকার রাস্তায় গন্তব্যে কখন পৌঁছানো যাবে তার সঠিক হিসাব কেউ করতে পারবে না। যেহেতু রোজার দিন, তাই সন্ধ্যাবেলা হলে একটু বাড়তি টেনশনে থাকতে হয় ইফতার করা নিয়ে। এর মধ্যে কেউ যদি এ রকম ইফতারসামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করে তবে সেটা অবশ্যই ভালো একটি কাজ।’

প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিন বছর (চলতি রমজানসহ) ধরে বিনা মূল্যে ইফতার বিতরণের কাজটি করছে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন। গত বছর নিউ মার্কেট, শুক্রাবাদ, ফার্মগেট, শাহবাগ ও মহাখালীতে ইফতার বিতরণ করা হলেও এ বছর একটু পরিবর্তন আনা হয়েছে। শুধু শাহবাগ ও শুক্রাবাদে ইফতার বিতরণ করা হচ্ছে। কারণ এই দুটো জায়গায় বিতরণ করলেই মূলত ফার্মগেট ও নিউ মার্কেট রুটে যাতায়াতকারী মাঝারি-দূরপাল্লার গাড়িগুলো পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটির চিন্তাও এ রকমই, মোটামুটি দূরের যেসব গাড়ি ঢাকায় পৌঁছাচ্ছে বা ঢাকা থেকে বের হচ্ছে সেগুলোতেই রোজাদারদের হাতে ইফতার তুলে দেওয়া। আর এভাবে তারা প্রতিদিন দুই হাজার প্যাকেট ইফতারি সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে বিতরণ করে বলে জানা গেছে।

আহ্ছানিয়া মিশনের কর্মী মো. হাবিবুর রহমান। প্রতিদিনই ইফতার বিতরণ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বেশির ভাগ সময় বাসে উঠে যাত্রীদের মাঝে ইফতার বিতরণ করি। ইফতারের সময় ঘনিয়ে এলে তখন বাইরে থেকে জানালা দিয়ে যাত্রীদের ইফতার দেওয়া হয়।’ তিনি অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ‘অনেকে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নেন। আবার অনেকে ফিরিয়ে দেন। কেউ কেউ মনে করেন, আমরা ইফতার বিক্রি করছি। কিন্তু আমরা যখন বলি এটা একদম ফ্রি, তখন সবাই নেন।’

প্রতিদিন সকাল ১০টায় ধানমণ্ডিতে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়ে ইফতার প্যাকেট করার কাজ শুরু হয়। দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যেই প্যাকেট করে তা বস্তায় ভরে রাখা হয়। ইফতারের ঘণ্টাখানেক সময় হাতে থাকতেই শুরু হয় বিতরণ করার কাজ। রাস্তার মাঝে বিতরণের সময় ট্রাফিক পুলিশ এবং নির্ধারিত স্থানে পুলিশ কর্মকর্তারা থাকলে তাঁরাও ইফতার বিতরণে সহযোগিতা করেন বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

উদ্যোগটা ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের হলেও এখন অনেকেই ইফতার দিয়ে সহযোগিতা করছে। চলতি বছর আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশন থেকে এক টন খেজুর এবং চট্টগ্রামের মোস্তফা হাকিম ফাউন্ডেশন ইফতারসামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করেছে। আহ্ছানিয়া মিশনের কনসালট্যান্ট মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যারা অফিস শেষ করে বা অন্য কাজ শেষ করে বাসায় বা গন্তব্যে ফিরছে, ইফতারের সময় যাতে তাদের হাতে কিছু খাবার থাকে তার জন্যই এই ব্যবস্থা। কারণ ঢাকার রাস্তায় একজন কখন গন্তব্যে পৌঁছবে তার সঠিক কোনো ধারণা রাখা কষ্টকর।’ তিনি বলেন, ‘মানবিক সেবার অংশ হিসেবেই কাজটি করা হয়; যার জন্য প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্ট সব সময় উত্সাহিত করেন।’

উল্লেখ্য, খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লাহ ১৯৫৮ সালে আহ্ছানিয়া মিশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি এই উপমহাদেশে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সংস্কারক হিসেবে পরিচিত। 


মন্তব্য