kalerkantho


নতুন শিল্পীর তুলিতে রঙিন ব্রাজিল

সনৎ বাবলা   

২৪ জুন, ২০১৮ ০০:০০



নতুন শিল্পীর তুলিতে রঙিন ব্রাজিল

বিশ্বকাপ শুরু হতেই হাওয়াটা কেমন বদলে গেল! আগে সেলেসাও ফুটবলের হাওয়াটা ছিল নেইমারকে ঘিরেই। সেই ধমকা হাওয়া দিক বদলে ব্রাজিল জুড়িয়ে দিচ্ছে কৌতিনিয়োকে। এই পালাবদলের ভাঙচুর হয়তো শোনা যাবে না, তবে মায়াবী ছন্দে পিল পিল করে এগোনোর সৌন্দর্যটা নিখাদ ফুটবলভক্তের জন্য উপভোগ্যই হওয়ার কথা।

ফিলিপে কৌতিনিয়োরও খুব অপছন্দ অত হই-হল্লা। সলজ্জ চেহারায় ‘লো-প্রোফাইলে’ চলতে ভালোবাসেন তিনি। তাই সুইজারল্যান্ড ও কোস্টারিকার বিপক্ষে দুটি গুরুত্বপূর্ণ গোল করেও এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের ওরকম লম্ফঝম্প নেই। নিজের সহজাত ভঙ্গিতেই তৈরি হচ্ছেন পরের ম্যাচের জন্য। সপ্তাহখানেক আগে রাশিয়ার সোচিতে সাংবাদিকরা ঘিরে ধরেছিল বার্সেলোনার এই মৃদুভাষী তারকাকে। সবাই জানতে চায়, তিনি নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার ভাবেন কি না? চেহারায় অস্বস্তি ফুটিয়ে কৌতিনিয়োর জবাব, ‘নিজেকে নিয়ে কিছু বলতে আমি পছন্দ করি না।’ এর পরও যখন ঘুরেফিরে একই প্রশ্ন তখন বলে দিলেন, ‘এসব নিয়ে আমি ভাবি না। অন্য কারো কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করুন। আমি বরং প্র্যাকটিসে মনোযোগ দিই, নিজের এবং দলের উন্নতির চেষ্টা করি।’

এই হলেন ফিলিপে কৌতিনিয়ো, নিজের সম্পর্কে বলতে যাঁর বাধো বাধো লাগে। যাঁর রুচিতে বাধে নিজেকে অন্যতম সেরা বলতে। তিনি হয়তো ভাবেন, আকাশে চাঁদ উঠলে তো সবাই দেখবেই। ঢোল পিটিয়ে বলতে হবে কেন!

অন্যরা এখন বলতে শুরুও করেছেন। দ্বিতীয় ম্যাচ জেতার পর কোস্টারিকার অধিনায়ক ব্রায়ান রুইজের হয়েছে নতুন উপলব্ধি, ‘কৌতিনিয়ো ও নেইমার যখন একসঙ্গে ভালো খেলেন তখন ব্রাজিল অন্য রকম। অন্যদের সঙ্গে ব্যবধানটাও অনেক বড় হয়ে যায়।’ এই ব্রাজিলের বিপক্ষে ৯০ মিনিট লড়াই চালিয়ে গেছে কোস্টারিকা, দুর্দান্ত সব সেভ করেছেন কেইলর নাভাস। ৯১ মিনিটে কৌতিনিয়ো সেই প্রতিরোধ ভেঙে বল জালে পাঠিয়ে দলকে টেনে তোলেন হতাশা থেকে। গ্যালারিতে ফিরিয়ে আনেন হলুদ-সবুজের ঢেউ। শেষ মিনিটে নেইমার ব্যবধান বড় করেন, কিন্তু কোস্টারিকার আট-নয়জনের রক্ষণদেয়াল ভেদ করে কৌতিনিয়োর বল জালে পাঠানোটাই বড় ঘটনা। কারণ গোলের প্রত্যাশা যে বারবার কোস্টারিকার চৌকাঠে গিয়ে মাথা কুটছিল। তাই ম্যাচসেরাও ২৬ বছর বয়সী মিডফিল্ডার। তবে তাঁর কণ্ঠে নিজের কৃতিত্বের বাড়াবাড়ি নেই একটুও, ‘পুরস্কার (ম্যাচসেরার) পেয়ে ভালো লাগছে। তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমাদের জয়। শেষ পর্যন্ত লড়েছি আমরা, জয়টা আমাদের প্রাপ্য।’ এর আগে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে শুরুর ম্যাচেও তিনি দুর্দান্ত এক শটে এগিয়ে নিয়েছেন দলকে। সেই ম্যাচ শেষ পর্যন্ত ড্র হলেও ম্যাচসেরার পুরস্কার উঠেছিল সাবেক লিভারপুল তারকার হাতে।

তাঁর তারকা হয়ে ওঠা লিভারপুলেই। ১৬ বছর বয়সে ইন্টার মিলানে গেলেও ইউরোপে নিজের জায়গা করতে একটু সময় লেগেছে। কারণ তাঁর শারীরিক গঠন ঠিক শীর্ষপর্যায়ে লড়াইয়ের মতো ছিল না। ২০১৩ সালে লিভারপুলে নাম লেখানোর পরই নিজেকে আন্তর্জাতিক মানের করে তৈরি করা শুরু এবং দুপায়ে ফুটতে শুরু ফুটবলের ছন্দ। শরীরকে উপযোগী করতে একটু দেরি হলো বলেই কিনা বিশ্বকাপ অভিষেক হয়েছে চার বছর বাদে। ২০১০ সালে সেলেসাও জার্সি গায়ে উঠলেও তাঁর নিজ দেশের বিশ্বকাপ খেলা হয়নি। তখনই তাঁর পিছিয়ে পড়া। নইলে ২৬ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার নেইমারের সমসাময়িকই। ছোটবেলায় ব্রাজিলের ঘরোয়া ফুটবলেও ছিলেন তাঁরা প্রবল প্রতিপক্ষ। ২০০৮ সালে দুজনে মুখোমুখি হয়েছিলেন ব্রাজিল অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবলের ফাইনালে। কৌতিনিয়োর ভাস্কো বনাম নেইমারের সান্তোস। জিতেছিল ভাস্কো এবং ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ হয়েছিলেন সেই ছোট্ট কৌতিনিয়ো। সেই সময়ের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী এক দশক পর হয়েছেন বিশ্বকাপ সতীর্থ। সেলেসাওদের হেক্সার স্বপ্নসারথি। তাই ছোটবেলার ফাইনালে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর সেই ছবিটি এখন ব্রাজিলের ফুটবল বাজারে বেশ হিট করে গেছে। বিশ্বকাপ শুরু হতেই এই ছবির চাহিদা তৈরি হয়েছে। 

আগেরবার ব্রাজিলের ছিল শুধুই নেইমার। এবার সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন শিল্পী কৌতিনিয়ো। কোনো হুল্লোড় ছাড়াই শিল্পী নিঃশব্দে ছবি এঁকে যাচ্ছেন সবুজ ক্যানভাসে। রাঙিয়ে যাচ্ছেন ব্রাজিল। তাতে স্বপ্নরঙিন সমর্থকদের মনও।

 

 



মন্তব্য