kalerkantho


হ্যাজার্ডও ফিরলেন শূন্য হাতে

শাহজাহান কবির   

১২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



হ্যাজার্ডও ফিরলেন শূন্য হাতে

সেমিফাইনাল শেষে ফ্রান্সের জয়ের নায়ক উমতিতি ও এডেন হ্যাজার্ডের শুভেচ্ছা বিনিময়। ছবি : এএফপি

এবারের বিশ্বকাপটা এমন অঘটনপ্রবণ এর একটা কারণ বোধ হয় দলগুলোতে তারকার ছড়াছড়ি। মেসি, নেইমার, রোনালদোর মতো তারকারা বিদায় নিলেও শেষ চারের আকর্ষণ কমছিল না। আন্তোয়ান গ্রিয়েজমান, এডেন হ্যাজার্ড, লুকা মডরিচরা ছিলেন যে। শেষ এই তালিকা থেকে পরশু হ্যাজার্ডও বিদায় নিলেন। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটাও হয়তো খেলবেন। কিন্তু সেটা অনেকটা আনুষ্ঠানিকতাই। সেমিফাইনাল পর্যন্তই তো তিনি রাঙিয়ে গেছেন এবারের আসরটা।

ক্যারিয়ারের শুরুতেই মেসির সঙ্গে তুলনা হয়েছে এমন বেশির ভাগ খেলোয়াড়কেই এখন আতশ কাচ দিয়ে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু হ্যাজার্ড নিজের স্বাতন্ত্র্য দাঁড় করিয়েছেন। তাতেই আবার বারবার ফিরিয়ে এনেছেন সেই তুলনা। ইতিহাসের নন্দিত সব ফুটবলারের মতো তিনিও ড্রিবল-মাস্টার। এই বিশ্বকাপেই ব্রাজিলের বিপক্ষে ১০টি সফল ড্রিবলে রেকর্ডের খাতায় নাম লিখিয়েছেন। কারণ ১০ বারের চেষ্টায় প্রত্যেকবারই যে তিনি সফল। ১৯৬৬ থেকে ফুটবলের এই তারকাখচিত আসরেই এত বেশিবার ড্রিবলে শতভাগ সাফল্য যে দেখা যায়নি এর আগে। যেকোনো দলের বিপক্ষেই এই পরিসংখ্যান ঈর্ষণীয়। সেখানে হ্যাজার্ডকে অনন্য করেছে প্রতিপক্ষ দলের নামটা ব্রাজিল বলেই। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষেও তো ১১টি সফল ড্রিবল তাঁর। বেলজিয়ামের ডিরেক্ট ফুটবলকে শিল্পী-কুশলতা দিয়ে মোহনীয় করেছেন তিনি। শুধু কি কারুকাজ, ডিফেন্সচেরা পাস, আচমকা শট, মাপা ক্রস—সব কিছু দিয়ে বেলজিয়ামকে এ আসরে টেনেছেন তিনি যোগ্য নেতার মতোই।

আগের দুই ম্যাচে নিজের সামর্থ্যের সেরাটা দেখানো রোমেলু লুকাকু পরশু সেন্ট পিটার্সবার্গে ছিলেন নিষ্প্রভ, ব্রাজিলের বিপক্ষে ভয়ংকর হয়ে ওঠা কেভিন ডি ব্রুইনও যেন নিজের ধার হারিয়েছিলেন কিছুটা। কিন্তু বাঁ প্রান্ত ধরে হ্যাজার্ড পুরো ম্যাচ কাঁপিয়েছেন ফ্রেঞ্চ ডিফেন্সকে। প্রথমার্ধেই তাঁর শট বেলজিয়ামের দুর্ভাগ্যের ছবি হয়ে রাফায়েল ভারানের মাথা ছুঁয়ে না গেলে গল্পটা অন্য রকমও হতে পারত। জাপানের পর ব্রাজিলের বিপক্ষে অমন পারফরম্যান্সে টুর্নামেন্ট শুরুর ফেভারিট ফ্রান্সের বিপক্ষেও পরশু বেলজিয়ামকেই এগিয়ে রেখেছিলেন অনেকে। শেষ পর্যন্ত তারা হেরে গেছে ফ্রান্সের দলীয় পারফরম্যান্সের কাছে। ১ গোলে লিড নেওয়ার পর যেমন একাট্টা হয়ে প্রতিপক্ষকে রুখে দিয়েছে ফরাসিরা, তাতে প্রয়োজন ছিল কোনো জাদুকরী মুহূর্তের, যেমনটা দেখা গেছে জাপানের বিপক্ষে, ব্রাজিল ম্যাচেও। কিন্তু দিনটাই এদিন হ্যাজার্ডদের ছিল না। সামুয়েল উমতিতির হেডের এক গোলই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিয়েছে। ম্যাচ শেষে বেলজিয়ান অধিনায়কও তাই বাস্তবতাটা মেনে নিয়েছেন, ‘তারা শক্ত ডিফেন্স করেছে। আমাদের ব্যর্থতা সেটা আমরা ভাঙতে পারিনি। তবে পুরো টুর্নামেন্টে বেলজিয়াম সবাইকে মুগ্ধ করেছে। শেষ পর্যন্ত এমন একটা দলের কাছে হেরে বিদায় নিলাম যারা সত্যিই আমাদের চেয়ে ছিল দৃঢ়।’ তবে শুধু এই দৃঢ়তায় ভালোলাগা নেই হ্যাজার্ডে। সুন্দর ফুটবল ফোটে তাঁর পায়েই, তা দিয়েই আক্রমণের ঢেউ তোলেন প্রতিপক্ষের বক্সে। টুর্নামেন্টে বেলজিয়ামকেও সবাই সেভাবেই মনে রাখবে। ফ্রান্সের রক্ষণাত্মক কার্যকরী ফুটবলের কাছে হার মানলেও তার প্রশংসা তিনি করতে পারছেন না, ‘এমন খেলে বেলজিয়ামের হয়ে হারতেও আমরা রাজি, ফ্রান্সের ওই জয় আমাদের টানে না।’

হ্যাজার্ড এখানেই আলাদা। তাঁর পায়ে বল যাওয়া মানেই সৃষ্টিশীলতা, রোমাঞ্চ আর নিখাদ আনন্দের উপলক্ষ। সেই ফুটবলে মেসি ধন্য করতে পারেননি এ আসর। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে মেসিসুলভ একটি গোলই তিনি রাশিয়ার এই আসরকে দিয়ে গেছেন, বাকিটা হতাশার। মহাতারকাদের পতনের মিছিলেন তিনিই গিয়েছেন সবার আগে। তাঁর পথ ধরে ক্রিস্তিয়ানো, পরের দিনই। উরুগুয়ের আল্ট্রা ডিফেন্সিভ ফুটবলের কাছে হার মেনে নিয়ে ফিরে গেছেন সময়ের সেরা এই স্কোরার। এরপর নেইমার। বেলজিয়ামের কাছে অঘটনের শিকার তাঁর ব্রাজিল। অন্তত ওই ম্যাচের আগ পর্যন্ত সেলেসাওদেরই মনে হচ্ছিল টুর্নামেন্টের সবচেয়ে পরিপূর্ণ দল। কিন্তু হ্যাজার্ডের বেলজিয়ামের কাছে নতজানু তারা। ম্যাচ শেষে কান্নায় ভেঙে পড়া নেইমারকে থিয়েরি অঁরি ও হ্যাজার্ডের সান্ত্বনা দেওয়ার ছবিটা এই টুর্নামেন্টেরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছবি হয়ে থাকতে পারত যদি শেষটাও হতো বেলজিয়ামের।



মন্তব্য